বোরো চাষে ডিজেলে ভর্তুকির চিন্তা

বোরো মৌসুমে ডিজেলে কৃষকদের ভর্তুকি দেওয়ার বিষয়টি সরকার গভীরভাবে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আবদুর রাজ্জাক। তিনি বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ না হলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম না কমলে ডিজেলেও আমাদের কিছু একটা করতে হবে, যাতে কৃষকের উৎপাদন খরচ কমে।

মন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ডিজেলের দাম অনেক বেশি। এতে বোরো মৌসুমে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আমরা সারে যেমন ভর্তুকি দেই, তেমনি বোরো চাষে প্রয়োজনে ডিজেলে ভর্তুকি দেওয়া হবে। সরকার গভীরভাবে এ বিষয়টি বিবেচনা করছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর মহাখালীতে ব্র্যাক সেন্টার সম্মেলন কক্ষে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ‘খাদ্য নিরাপত্তায় ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক গবেষণা প্রকল্পের ওপর কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশনের সহযোগিতায় ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এ কর্মশালার আয়োজন করে।

মন্ত্রী বলেন, অনাবৃষ্টির জন্য আমন রোপণ ব্যাহত হচ্ছে। এখন বৃষ্টির মৌসুম, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বৃষ্টি হওয়ার কথা, কিন্তু হচ্ছে না; এটাই আমাদের জন্য কনসার্ন। প্রত্যেক দিনই আমরা ভাবছি বৃষ্টি হবে, কিন্তু হচ্ছে না। বৃষ্টি না হলে হয়তো আমনের উৎপাদন কম হবে। অন্যদিকে আমনের টাকা দিয়ে কৃষকরা অনেক সময় বোরোতে বিনিয়োগ করে। সার, ডিজেল কিনে ও সেচ খরচসহ অন্যান্য খরচ মেটায়। কাজেই বৃষ্টি না হওয়ার জন্য আমন উৎপাদন ব্যাহত হলে কৃষকের ওপর এর প্রভাব পড়বে।

খাদ্য নিরাপত্তায় ‘টেকসই সেচ ব্যবস্থাপনা’ গড়ে তুলতে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, আমরা ভূগর্ভস্থ ও ভূউপরিস্থ পানির টেকসই ব্যবস্থাপনায় কাজ করে যাচ্ছি। একদিকে সেচকাজে ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে কাজ চলছে, অন্যদিকে বারিড পাইপ (ভূগর্ভস্থ পাইপ) ব্যবহার করে সেচ দক্ষতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার নাদরিয়া সিম্পসন। গবেষণার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন সিএসআইআরও বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ মাইনুদ্দিন। সভাপতিত্ব করেন আইডব্লিউএমের নির্বাহী পরিচালক আবু সালেহ খান।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সেচের জন্য ব্যবহারযোগ্য পানির (বিশেষত ভূগর্ভস্থ পানি) টেকসই স্তর নির্ধারণ এবং পানির ব্যবহারের পরিবর্তনের ওপর নারী ও গ্রামীণ জীবনযাত্রার প্রভাবের মূল্যায়নের জন্য গবেষণাটি করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের আর্থিক সহযোগিতায় অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সিএসআইআরওর সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণাটি সম্পন্ন করেছে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং, বাংলাদেশ

কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বারিন্দ মাল্টিপারপাস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি এবং ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন।

গবেষণা প্রতিবেদনে জানান হয়, বোরো ধান উৎপাদনে পানির ব্যবহার নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। এক কেজি বোরো ধান উৎপাদনে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন পড়ে, যা একটি ভুল ধারণা। গবেষণায় দেখা গেছে ২০১৫-১৬ সালে এক কেজি বোরো ধান উৎপাদনে ৬৬১ লিটার পানি লেগেছে আর ২০১৬-১৭ সালে লেগেছে ৫৮৪ লিটার।

আরও দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতা বোরো ধান উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বেশি দুষ্পাপ্র্য এলাকায় তুলনামূলকভাবে সেচ খরচ বেশি হয়, অন্যদিকে উৎপাদন কম হয় এবং কৃষকের লাভ কম হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো চাষ করার ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সর্বত্র নিচে নেমে যায়নি। শুধু নওগাঁ, নবাবগঞ্জ ও রাজশাহী এই তিনটি জেলায় পানির স্তর নিচে নেমেছে। এছাড়া মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারই পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার একমাত্র কারণ নয়। উজানে নদীর নিয়ন্ত্রণ, শস্য বিন্যাসের পরিবর্তন, জলাভূমি হ্রাস পাওয়া, শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তনসহ নানা কারণে পানির স্তর নিচে নামছে।

গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে গত এক দশকে বোরো ধানের সম্প্রসারণ কমে এসেছে বা কোথাও সম্প্রসারণ বন্ধ হয়ে গেছে। বোরো ধানের স্থানে এসেছে আউশ ধান। বিশেষত বরেন্দ্র এলাকায় বিগত ১০ বছরে বোরো ধান সম্প্রসারণের কোনো নতুন এলাকা পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় আরও বলা হয়, আবহাওয়ার পরিবর্তন পানির ভারসাম্য ও ভূগর্ভস্থ পানির সহজলভ্যতার ওপর প্রভাব ফেলেছে। তবে দেখা গিয়েছে সেচের পানি ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রায় উন্নতি আনতে সাহায্য করেছে।