অমর্ত্য সেন পাঠ কেন জরুরি

বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বসমাজে বাঙালির সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মুখপাত্র অধ্যাপক অমর্ত্য সেন। বিশ^মঞ্চে বাংলাদেশের উন্নয়নের বিশেষ মাত্রাটিকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন অধ্যাপক সেন। এটি আমার কথা নয়। ড. সাজেদা আমিন এই তথ্যটি আমাদের দিলেন গত ২৭ আগস্ট সন্ধ্যায় ‘বাঙলার পাঠশালা আয়োজিত অমর্ত্য সেন পাঠচক্রে’র দ্বিতীয় আলোচনায়। ড. আমিন যুক্তরাষ্ট্রের পপুলেশন কাউন্সিলের একজন জ্যেষ্ঠ গবেষক। তিনি বললেন, অধ্যাপক অমর্ত্য সেন উন্নয়নে বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বিশ্বফোরামগুলোতে আলোচনা করতে গিয়ে অন্য সবার মতো আর্থিক উন্নতির চেনা রাস্তার পরিবর্তে দেশটির সামাজিক উন্নয়নের দিকটিতে সর্বপ্রথম প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি তুলে ধরেছেন যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র এনজিওগুলোর সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করেছে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে এনজিওগুলো এভাবে কাজ করতে পারেনি। (অমর্ত্য সেন, ১০ মার্চ ২০২০)। বাংলাদেশ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে, জন্মের সময় বেঁচে থাকার গড় প্রত্যাশা (প্রচলিত শব্দচয়নে গড় আয়ু) বাড়িয়েছে, মাতৃমৃত্যুহার উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমিয়েছে। গড় আয়ুর ক্ষেত্রে বিগত মাত্র এক যুগের মধ্যে ১৪ বছর যোগ করেছে, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের গড় আয়ুকেও অতিক্রম করে গেছে।

বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের জন্য অধ্যাপক অমর্ত্য সেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই কাজ করলেও আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞতা তো দূরে থাক, এসবের খবর পর্যন্ত রাখি না। বাবা ড. আশুতোষ সেনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা সূত্রে ঢাকার ওয়ারীতে কেটেছে অমর্ত্য সেনের ছেলেবেলা। এই স্মৃতি অধ্যাপক সেনের সত্তায় কত ঘনিষ্ঠভাবে মিশে আছে তার প্রমাণ পাওয়া যায় গত বছর পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড: আ মেমোয়ার’ গ্রন্থে। এ বছর সেটির বাংলা অনুবাদ বেরিয়েছে যার নাম ‘জগৎ কুটির’। পুরনো ঢাকার ওয়ারীতে তাদের বাড়ির নামটিই ছিল ‘জগৎ কুটির’। অমর্ত্য সেনকে এত কাছে পেয়েও তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছি কেন? প্রদীপের আলো চারিদিক আলোকিত করলেও নিজের কোলটি যেমন আঁধারে ডুবে থাকে, ঠিক তেমনি আমরাও কি তার বিষয়ে আঁধারে ডুবে রয়েছি আমাদেরই সচেতনতার অভাবে?

কিছুদিন আগে এক বক্তৃতায় চরমোনাইয়ের পীর প্রশ্ন তুলেছেন, “...যে জাতি মাত্র ৯ মাসে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, সে জাতিকে কেন ৫০ বছর ধরে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের দেশের সীমানায় আটকে থাকতে হলো?” (প্রথম আলো, ২৩ মার্চ, ২০২১)। দারিদ্র্য ও আয়ের বিষয়টি অর্থশাস্ত্রের আলোচনার বিষয়। আর অর্থশাস্ত্র বা ইকোনমিক্স হলো সোশ্যাল সায়েন্স বা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি শাখা। পীর সাহেব তো বিজ্ঞানশিক্ষা চান না, তাহলে তিনি দারিদ্র্য কমাতে সময়ের হিসাব কষছেন কেন? তাও আবার বিজ্ঞানের দ্বারস্থ হয়ে?

বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ যুক্তরাজ্যের আলস্টার বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান ওসমানী ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা নিবন্ধে বাংলাদেশের দারিদ্র্য ক্রমহ্রাসমান ধারা বজায় রাখতে কেন সক্ষম হয়েছে তার প্রধান দুটি কারণ উল্লেখ করেছেন। আমরা সকলেই জানি যে, আয় বাড়লে দারিদ্র্য কমে। কিন্তু বাংলাদেশে শ্রমজীবীদের আয় কীভাবে বেড়েছে তার প্রধান দুটি উৎসের কথা তিনি বলেছেন।

প্রথমত, বাংলাদেশের বড় ধরনের কাঠামোগত রূপান্তর ঘটেছে, যেখানে বড় প্রকল্পগুলোতে অধিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে লোকের আয় বেড়েছে। তবে এ প্রকল্পগুলো শহরকেন্দ্রিক। দ্বিতীয়ত, দেশে ব্যাপক হারে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বিস্তার হয়েছে গ্রাম ও শহর নির্বিশেষে। জনশুমারি ও গৃহগণনা অনুসারে স্বাক্ষরতার হার আগের ৫১.৭৭ শতাংশ থেকে বেড়ে বর্তমানে ৭৪.৬৬ শতাংশ হয়েছে। শিক্ষার গুণগত ঘাটতি সত্ত্বেও দেশের মানুষের উল্লেখযোগ্য অংশ আয় বৃদ্ধি করে দারিদ্র্য সীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে। শুধু তাই নয়, তিনি আরও দেখান যে, নিরক্ষর জনগোষ্ঠীতে দারিদ্র্যের হার বেশি। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেছেন এমন জনগোষ্ঠীর ভেতর দারিদ্র্যের হার ২৬.৩ শতাংশ, যেখানে নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর ভেতর দারিদ্র্যের হার ৩১ শতাংশ। এভাবে মাধ্যমিক স্তর (এসএসসি ও সমমান), উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি ও সমমান) এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ও এর উপরের ডিগ্রিধারীদের মধ্যে দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ১৬ শতাংশ, ৮.১ শতাংশ ও ৫.২ শতাংশ। এই তথ্য বলছে যে, মানুষ যতই ধাপে ধাপে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার উচ্চতর স্তরগুলোতে যাচ্ছে, ততই তার দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা কমে যাচ্ছে। তার মানে আবার এই নয় যে, শিক্ষার একমাত্র উপযোগ হলো আয় বৃদ্ধি। মানুষের যাপিত জীবনের গুণগত মান বৃদ্ধিতে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। জীবনমানের চেয়েও মানুষের করণ (এজেন্সি) সত্তার বিকাশ ও করণ-সক্ষমতার (এজেন্সি ফ্রিডম) পরিধি বিস্তারে প্রধান ভূমিকা রাখে শিক্ষা।

ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের চিন্তা দ্বৈত ও পরস্পর সাংঘর্ষিক (কন্ট্রাডিক্টরি)। বিষয়টি স্পষ্ট বোঝা যায় কিছুকাল আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশে আসার প্রতিক্রিয়ায় চরমোনাইয়ের পীর বলেন, “...মেহমানকে আপ্যায়ন করা ইসলামের রীতি। সে হিসেবে বাংলাদেশে আমন্ত্রিত সব বিদেশি মেহমানকে ইসলামী আন্দোলন স্বাগত জানায়। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিষয়টি আলাদা। তার সহিংস অতীত ও ক্ষমতা গ্রহণের পর ভারতজুড়ে তিনি যে ধর্মীয় সহিংসতা [মুসলমানদের বিরুদ্ধে] উসকে দিয়েছেন, তাতে বাংলাদেশে তাকে স্বাগত জানানোর পরিবেশ নেই। তার মতো উগ্র সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাইলফলকে উপস্থিত থাকা স্বাধীনতার মূল চেতনার সঙ্গে সংঘর্ষিক।” বটে, সত্য কথা। তবে তারা যে আয়নায় মোদির চেহারা দেখছেন, সেই আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখতে পেলে ভালো হতো। বাংলাদেশে ধর্মীয় গোঁড়াপন্থিদের সমস্যা হলো তারা এই দেশ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ঝেটিয়ে বিদায় করতে চান, কিন্তু অন্যদিকে তারাই আবার ভারতে যেন ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা সমাজে পুরোপুরি বজায় থাকে তার জন্য আহাজারি করেন।

আমার মতে, এটি মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠের সমস্যা। অর্থাৎ বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও ভারতে সনাতন ধর্মাবলম্বী সংখ্যাগরিষ্ঠতা। যেহেতু এই সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিক অবনমন ঘটেছে এবং গৌতম বুদ্ধের ছোট ও দুর্বলের প্রতি শক্তিশালী ও সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিক কর্তব্যদায়ের কথা যেহেতু তারা মনে রাখেনি সেহেতু জঙ্গলের পরিবেশে পেশিশক্তির প্রয়োগে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়, এখানে প্রায় সেরকম অবস্থাই তারা সৃষ্টি করতে চাইছে। তবে একথা সত্য যে, “ধর্মীয় ভাবধারায় ভারতের মতো সংকীর্ণতা বাংলাদেশে নেই।” (অমর্ত্য সেন, দৈনিক সমকাল, ২৯ অক্টোবর ২০১৯)। এজন্যই রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকদের সম্পর্কের জায়গাটি ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে ধর্মনিরপেক্ষতার মতো মৌলিক উপাদানটিকে রাষ্ট্র কিছুতেই এড়াতে পারে না। এক্ষেত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দার্শনিক অবস্থানটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যময়। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “বাংলার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান বাংলাদেশে যারা বসবাস করেন, তারা সকলেই এ দেশের নাগরিক। প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা সমঅধিকার ভোগ করবেন।”

ধর্মীয় গোঁড়ামিমুক্ত আধুনিক শিক্ষার মাধ্যমে দেশের তরুণদের সক্ষমতার বিকাশ এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যাচর্চার গুণগত মানের অবনমিত অবস্থা সম্পর্কে আমরা সকলেই উদ্বিগ্ন। জ্ঞানচর্চার রূপান্তর ক্ষমতা বিপুল। শিক্ষার এই রূপান্তরের দিকটির প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির মাধ্যমে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের সমাজকে আলোকিত করতে সচেষ্ট হন। তার প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন, শ্রীনিকেতন ও বিশ্বভারতী আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চিন্তাবিদ ও দার্শনিকের জন্ম দিয়েছে। নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত অধ্যাপক অমর্ত্য সেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ল্যামন্ট ইউনিভার্সিটি প্রফেসর’ হিসেবে অর্থনীতি ও দর্শন বিভাগে কর্মরত। এই জগদ্বিখ্যাত মানুষটি শান্তিনিকেতন বিদ্যাপীঠেরই ছাত্র। এইরূপে, বাংলাদেশের শিক্ষায় গুণগত রূপান্তরের জন্য অমর্ত্য সেনের লেখালেখির বিপুল ভা-ার আমাদের প্রভূত সাহায্য করবে বলে আমার বিশ্বাস।

বর্তমান বিশ্বের সেরা দার্শনিকদের অন্যতম অমর্ত্য সেনের জ্ঞানগত অবদানের বিশাল পরিধিকে চটজলদি বাগে আনা বেশ কষ্টসাধ্য। বেশ সময় নিয়ে এই পরিশ্রমের কাজটি করতে হবে। সমস্যা হলো আমাদের ছাত্রছাত্রীরা তো বটেই, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকদেরও একটি অংশ শিক্ষার বাণিজ্যিক দিকটি এমনই গলাধঃকরণ করে কাবু হয়ে পড়েন যে, বাংলাদেশকে নতুন জ্ঞানের [অমর্ত্য সেনের চিন্তা] আলোকে দেখার বিষয়টি তারা ভাবতেই পারেন না। বিগত শতকের ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত চার দশক ধরে কল্যাণ-অর্থনীতি ও সামাজিক চয়ন তত্ত্বে তিনি যে বিপুল অবদান রেখেছেন, আমাদের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থনীতির সিলেবাসে তার বিন্দুমাত্র উপস্থিতি নেই। নোবেল কমিটি ১৯৯৮ সালে এই পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে অধ্যাপক সেনের এই দুই ক্ষেত্রে তার প্রভূত অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেছে। শুধু তাই নয়, অর্থনীতির সঙ্গে দর্শনের বিচ্ছেদ ঘটেছিল প্রায় শতবর্ষের বেশি সময় ধরে। অধ্যাপক সেন অর্থশাস্ত্র ও দর্শনের সেতুবন্ধ রচনা করেন নতুন সময়ের প্রেক্ষাপটে। অর্থশাস্ত্রীরা এর জনক অ্যাডাম স্মিথকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন ও বেশকিছু বাজে প্রচারণার খপ্পরে পড়ে গিয়েছিলেন স্মিথ। অমর্ত্য সেন অ্যাডাম স্মিথকে নিয়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করলেন ও আমাদের মনে করিয়ে দিলেন যে, এখনো স্মিথের চিন্তনকণাগুলো বিপুলভাবে প্রাসঙ্গিক। অধ্যাপক সেন দেখান যে, স্মিথের বইগুলোতে মণিমুক্তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। দাঁত থাকতে দাঁতের কদরে ব্যর্থতা নিয়ে আমরা কবে অমর্ত্য সেনের কাজের মূল্য দিতে শিখব?

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সভাপতি বাঙলার পাঠশালা ফাউন্ডেশন

ronieleo@gmail.com