দুনিয়ার মোহময় সম্পদ

কত সুন্দর এই ধরণী। গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, সাগর-নদী, ফল-ফুল, পশু-পাখিসহ কত রূপের সৃষ্টি তাতে। যতই দেখি, চোখ সরে না, মন ভরে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘দুনিয়াকে আমি বিস্তৃত করেছি এবং তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি ও সর্বপ্রকারের সুদৃশ্য উদ্ভিদরাজি তাতে উদ্গত করেছি।’ -সুরা কাফ: ৭

নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘দুনিয়া মধুময়, নয়নাভিরাম দৃশ্যে ভরপুর।’ -সহিহ

মুসলিম: ২৭৪২

দুনিয়ার প্রতি আকর্ষণ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আকর্ষণীয় বস্তুর মধ্যে কিছু আছে মানুষের চাহিদার শীর্ষে। তাই আল্লাহতায়ালা সেগুলোকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘মানবকে মোহগ্রস্ত করেছে নারী, সন্তানাদি, রাশি রাশি সোনা-রুপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদিপশু ও ফসলের মাঠ। এসব দুনিয়ার মোহময় সামগ্রী। আল্লাহর কাছে আছে উত্তম আবাসস্থল।’ -সুরা আলে ইমরান: ১৪

আয়াতে উল্লিখিত বস্তুসমূহের কল্যাণ-অকল্যাণ দুটি দিকই রয়েছে। সংক্ষিপ্তভাবে তা আলোকপাত করা হলো-

নারী : পুরুষের কাছে দুনিয়ার ভোগসামগ্রীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় নারী। কোরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের জোড়া (স্ত্রী) যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও।’ -সুরা আর রুম: ২১

একজন আদর্শ ও সতী নারীর ব্যাপারে নবী কারিম (সা.) বলেন, ‘সে হলো দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ।’ -সহিহ মুসলিম: ১৪৬৭

অপরদিকে অসৎ ও চরিত্রহীন নারীর ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘সে হলো শয়তানের জাল বা রশি।’-মিশকাত : ৫২১২

সন্তান : সন্তানের প্রতি টান নেই এমন প্রাণী পৃথিবীতে নেই। জীবজগতের প্রতিটি প্রাণী সন্তানকে ভালোবাসে, তার জন্য পাগল থাকে। তাই আয়াতে সন্তানকে দুনিয়ার মোহময় সামগ্রীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সন্তান যদি নেককার হয়, আদর্শবান হয় তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতে তার সুফল ভোগ করা যায়। হাদিসে নেক সন্তান, যে মা-বাবার জন্য দোয়া করে তাকে ‘সদকায়ে জারিয়া’ বলা হয়েছে। -সহিহ

মুসলিম: ১৬৩১

পক্ষান্তরে খারাপ সন্তান মা-বাবার জন্য দুনিয়াতে অভিশাপ এবং পরকালেও তার জন্য অভিভাবক হিসেবে জবাবদিহি করতে হবে। -সহিহ বোখারি: ৭১৩৮

সোনা-রুপা : এ দুই জিনিস পৃথিবীর দামি পদার্থ। এগুলোর প্রতি মানুষের চাহিদা প্রচুর। সঠিক পন্থায় তা অর্জন করে জাকাত দিয়ে পরিশুদ্ধ করে রাখলে দুনিয়ার কল্যাণের পাশাপাশি পরকালের জবাবদিহি ও শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যারা সোনা-রুপা পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তাদের আপনি বেদনাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দিন।’ -সুরা তাওবা: ৩৪

সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে, ‘যারা সোনার-রুপার হক তথা জাকাত সঠিকভাবে আদায় না করবে, তাদের হাশরের মাঠে লোহার পাত গরম করে কপাল, পিঠ ও পার্শ্বদেশে ছেঁকা দেওয়া হবে।’

চিহ্নিত ঘোড়া  : যে ঘোড়াকে কোনো কিছু দ্বারা চিহ্ন দিয়ে চারণভূমিতে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং যুদ্ধের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা হয় সেটাই চিহ্নিত ঘোড়া। এ ঘোড়া যদি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য লালন-পালন করা হয়, তাহলে তো প্রশংসনীয় আর যদি গর্ব-অহঙ্কারের জন্য হয় তাহলে নিন্দনীয়। আজকাল ঘোড়ার যাতায়াত তেমন না থাকলেও আধুনিক যে কোনো যানবাহনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হতে পারে।

গবাদি পশু : গবাদি পশু আল্লাহর বড় নেয়ামত। এগুলোতে মানুষের প্রচুর কল্যাণ রয়েছে। পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর চতুষ্পদ জন্তুগুলো তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাতে আছে উষ্ণতার উপকরণ ও নানাবিধ কল্যাণ এবং তা থেকে তোমরা আহার করো। তাতে আছে তোমাদের জন্য সৌন্দর্য যখন সন্ধ্যায় তা নিয়ে বাড়িতে ফিরে আসো এবং সকালে চারণে নিয়ে যাও। এগুলো তোমাদের বোঝা বহন করে নিয়ে যায় দুষ্কর গন্তব্যে। তোমাদের রব বড় দয়ালু, অনুগ্রহশীল। আর ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা সৃষ্টি করেছেন তোমাদের আরোহণ ও শোভার জন্য।’ -সুরা নাহল: ৫-৮

সুতরাং এগুলোর প্রতি মানুষের আকর্ষণ যুক্তিগ্রাহ্য বিষয়। কিন্তু এসব পেয়ে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করতে হবে। নতুবা তা ক্ষতির কারণ হবে।

ফসল : একজন কৃষকের কাছে ফসল কতটা প্রিয়, তা তার ঘামঝরা পরিশ্রম থেকেই বুঝা যায়। ফসল আল্লাহর দান। এগুলো তিনি মানুষ ও তাদের গৃহপালিত পশুর জন্য সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করি এরপর জমিন বিদীর্ণ করে তাতে শস্য উৎপন্ন করি। আঙুর, শাক-সবজি, যাইতুন, খেজুর, ঘনবৃক্ষ শোভিত বাগ-বাগিচা, ফল ও তৃণগুল্ম তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোর জীবনোপকরণস্বরূপ।’ -সুরা আবাসা: ২৫-৩২

সুতরাং ফসল পেয়েও একজন কৃষককে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে হবে। আল্লাহর রাস্তায় দান-সদকা করতে হবে। তাহলে তা দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণ বয়ে আনবে।

দুনিয়া এসব চিত্তাকর্ষক নেয়ামত পেয়ে মানুষ যাতে পরকাল ভুলে না যায় সেজন্য সাবধান করে দিয়ে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় দুনিয়ার সবকিছুকে আমি তার শোভা হিসেবে সৃষ্টি করেছি যাতে মানুষকে পরীক্ষা করতে পারি, কর্মে তাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ।’

 -সুরা কাহাফ : ৭