হেপাটাইটিসের ভয়াবহতা

হেপাটাইটিস হলো যকৃতের প্রদাহ। যকৃতের মাধ্যমে শরীরের বিপাকক্রিয়া সম্পন্ন হয়। শর্করা, ভিটামিন, খনিজ লবণ জমা থাকে যকৃতে। শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় নানা ধরনের আমিষ সংশ্লেষিত হয় এখান থেকে। রক্ত জমাট বাঁধার উপাদান, ইউরিয়া, বিলিরুবিন, পিত্তরস, বিভিন্ন প্রাণ রসের বাহক আমিষ, শারীর-বৃত্তীয় কাজের জন্য অসংখ্য রাসায়নিক উপাদান সংশ্লেষিত হয় এই কারখানা থেকে। সুতরাং যকৃৎ আক্রান্ত হলে শরীরে ঘটে মহাবিপর্যয়।

কারণ

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, বিভিন্ন ওষুধ, রাসায়নিক পদার্থ, অ্যালকোহল মূলত হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ। এ ছাড়া বিপাকীয় বিভিন্ন ব্যাধি, অতিরিক্ত মেদ, গর্ভাবস্থা হেপাটাইটিসের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক ধরনের ভাইরাস হেপাটাইটিসের পেছনে কার্যকর হলেও পাঁচটি ভাইরাস সিংহভাগ হেপাটাইটিসের পেছনে কার্যকর। এই পাঁচটি ভাইরাস হলো হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই।

লক্ষণ ও উপসর্গ

এ রোগে আক্রান্তদের ক্ষুধামান্দ্য, বমি, পেটব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অস্থিসন্ধিতে ব্যথা শুরু হয়। রুচি উঠে যায়, খাবারে বিষাদ ঠেকে। যারা সিগারেট ফুঁকে, তারা ধূমপানে বিস্বাদ ভাব অনুভব করে। চোখে, মুখে, শরীরে হলুদ ভাব ফুটে ওঠে। পেশাব হয় হলুদ বর্ণের। পায়খানা হয় মেটে বর্ণের। এসব ভাইরাস আক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ। প্রাথমিক লক্ষণে ভাইরাসের ভয়ানক আক্রমণে সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যেতে পারে যকৃৎ। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। রোগী অচেতন হয়, এমনকি মৃত্যুবরণ করে। হেপাটাইটিস এ ও ই ভাইরাস প্রাথমিক এই আক্রমণ দশার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

হেপাটাইটিসের ভয়াবহতা

ছয় মাসের বেশি সময় ভাইরাসে আক্রমণ বহাল থাকলে এ অবস্থাকে বলে ক্রনিক বা নিরন্তর হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিস বি, সি ও ডি মূলত দীর্ঘকালীন আক্রমণ দশা বজায় রাখে, তাই ভাইরাসগুলো ভয়ংকর। হেপাটাইটিস-ডি অবশ্য অপূর্ণাঙ্গ ভাইরাস। এককভাবে আক্রমণ করতে পারে না। বি ভাইরাসের সঙ্গে মিলে আক্রমণ করে। ক্রনিক হেপাটাইটিস একসময় রূপান্তরিত হয় সিরোসিসে। যকৃতের কাঠামো এবড়োখেবড়ো হয়ে যায়। দেহ ফুলে ওঠে। পেটে পানি জমতে থাকে। পেটের শিরা ভেসে ওঠে। চামড়ার বর্ণ পরিবর্তন হয়। কখনো কখনো রোগীর শুরু হয় রক্তবমি। কিডনি, ফুসফুস হয়ে পড়ে বিকল। দীর্ঘকালীন ভাইরাস আক্রমণে যকৃতে ক্যানসার সৃষ্টি হয়। যকৃৎ ক্যানসার সমস্ত ক্যানসারের মধ্যে তৃতীয় প্রধান ক্যানসার। যকৃৎ ক্যানসারের অন্যতম প্রধান কারণ নিরন্তর হেপাটাইটিস।

যেভাবে ছড়ায়

হেপাটাইটিস এ এবং ই ছড়ায় মূলত খাদ্য ও পানীয়ের মাধ্যমে। হেপাটাইটিস বি এবং সি ছড়ায় মূলত রক্ত, লালা, বীর্য, যোনিরস ও গর্ভফুলের মাধ্যমে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত ইনজেকশনের সুচ, রেজার, ব্লেড, ক্ষুর, এমনকি টুথব্রাশ হতে পারে জীবাণু ছাড়ানোর মাধ্যম। আক্রান্ত মায়ের গর্ভজাত সন্তান সহজেই ভাইরাস আক্রান্ত হতে পারে। অসংযত যৌনাচার, নেশার সামগ্রী নেওয়ার জন্য একই সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। রক্ত পরিসঞ্চালন কেন্দ্র, ডায়ালাইসিস সেন্টার, ডায়াগনস্টিক ল্যাব, যৌনপল্লী এই ভাইরাসের প্রধান নিবাস। রক্ত পরিসঞ্চালনের আগে রক্তে ভাইরাসের উপস্থিতি নির্ণয় করা উচিত।

প্রতিরোধে টিকা

কিছু কিছু হেপাটাইটিস ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা রয়েছে। বাংলাদেশেও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। যারা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তি তারা অবশ্যই টিকা নিয়ে ভয়াবহ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করবেন।