বড় প্রত্যাশা আ.লীগের

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য ইস্যু, তিস্তাচুক্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা ও চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে তার এ সফরের দিকে যেমন বড় চোখে তাকিয়ে আছে দেশের প্রায় সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ, তেমনি আওয়ামী লীগও তাকিয়ে আছে রাজনৈতিকভাবে কতটা লাভবান হওয়া যাবে সে প্রত্যাশা নিয়ে।

আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সমালোচনার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দল ও জোটগুলো। তাই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর যেমন সুফল বয়ে আনতে পারে তেমনি সরকারকে বেকায়দায় ও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখেও ফেলতে পারে। ফলে রাজনৈতিক দিক থেকে এই সফর আওয়ামী লীগের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রত্যাশার চাপের কথা স্বীকার করে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দেশের মানুষের প্রত্যাশা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ভারত একটি শক্তিশালী দেশ এবং আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র। দেশটির সঙ্গে বহু দিক থেকে বাংলাদেশের মানুষ জড়িয়ে আছে। তিস্তার পানির হিস্যাসহ বেশ কিছু অমীমাংসিত ব্যাপার রয়েছে। ফলে দেশের মানুষ সেসবের সমাধান আশা করে।

দলটির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের মূলে আরও রয়েছে পশ্চিমা চাপ কীভাবে মোকাবিলা করা যায় সে সম্পর্কে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে পরামর্শ করা। বিশেষ করে জ্বালানি সহযোগিতার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। কারণ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে অস্থির বৈশ্বিক বাজার থেকে জ্বালানি সংগ্রহের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সংকটে পড়েছে। ভারতের সহযোগিতা পেলে এ সংকট মোকাবিলা করা সহজ হবে। এছাড়া উপ-অঞ্চলিক সহযোগিতা আরও সুসংহত করার ক্ষেত্রে দুই দেশের করণীয় দুই শীর্ষ নেতার আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।

সরকারি দলের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারতের সহযোগিতা পেলে এই মুহূর্তে সফরকে সফল হিসেবেই দেখবেন তারা।

কীভাবে ভারত সহযোগিতা করতে পারে সে সম্পর্কে দলের গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র জানায়, ভারত থেকে জ্বালানি তেল পাওয়ার জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। সেই চুক্তি স্বাক্ষর হলেই শেখ হাসিনার ভারত সফর সফল হবে বলে মনে করছেন তারা। 

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি সূত্র জানায়, এ সফর কিছু এজেন্ডাভিত্তিক হলেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে কিছুটা হলেও নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী দেশ ভারতের। সামনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভারতের এ মনোভাব আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে মনে করেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা।

ওই সূত্র আরও জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সফর ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে ইতিবাচক ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

এর কারণ ব্যাখ্যা করে ওই সূত্রটি জানায়, আওয়ামী লীগের ওপর কিছুটা বিরক্ত ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। সেই বিরক্তি থেকে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলেও একটু দুর্বল অবস্থায় থাকুক সেটা চায় বিজেপি সরকার। সেই দৃষ্টিভঙ্গি দূর করার জন্য সফরে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন সরকারপ্রধান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু তিস্তার পানির হিস্যা নিয়ে কতদূর অগ্রগতি আসবে। এ ইস্যুটি নিয়ে দেশের সর্বস্তরে আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের আটজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, তিস্তার অগ্রগতি হলেই সফর সফল হবে, অন্যথায় দেশবাসীর প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিবেশী দেশ ভারত সফরে দেশের মানুষের প্রত্যাশা থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে আমাদের যে চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিসহ উভয় দেশের বিদ্যমান যে সব সমস্যা রয়েছে সেগুলোর সমাধান আশা করছি।’

দলটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক, সেটার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আলাদা। তাই এই সফর নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা বেশি।’ তিস্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিস্তার বাইরেও আমাদের প্রায় সব নদীই ভারতের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে আমরা সবাই শুধু তিস্তা নিয়েই কথা বলি। তিস্তা তো সেলিব্রেটির মর্যাদা পেয়েছে। অন্য নদীগুলোও কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ না। আমি মনে করি, এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আলোচনা হবে।’ তিস্তাসহ সব নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত বলে মনে করেন শাম্মী আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আশা করি হবে।’

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের মতোই প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে দেশের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে। মানুষ অপেক্ষায় আছে, তিস্তার হিস্যা নিয়ে কী হবে দুদেশের সরকারপ্রধানের বৈঠকে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের এগিয়ে যাওয়ার যেমন সুযোগ তৈরি করবে তিস্তা নিয়ে মীমাংসা না হলে সফর শেষে সমালোচনার মুখেও পড়তে হবে দল ও সরকারকে।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে প্রত্যাশার কথা জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন দেশ রূপান্তরকে বলেন, উভয় দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের উত্তরোত্তর উন্নয়ন ঘটবে। পাশাপাশি দুদেশের নাগরিকদের অর্থনৈতিক মুক্তির অগ্রযাত্রা অধিকতর গতিশীল ও টেকসই করার নতুন মাইলফলক স্থাপিত হবে বলে তিনি মনে করেন।