আমাজন বন রক্ষায় জীবন দিয়েছিলেন যিনি

প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার আপসহীন নেতা চিকো মেন্দেজ। আশির দশকে তার নেতৃত্বে আমাজনের আদিবাসীদের নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলন যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে দুশ্চিন্তায় ফেলে। পাশাপাশি মেন্দেজের টানা কর্মসূচি পশু খামারের মালিকদের ক্ষুব্ধ করে। শেষ পর্যন্ত তাদেরই হাতে প্রাণ হারাতে হয় ভূমিপুত্র মেন্দেজকে। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া       

পরিবেশ আন্দোলনের পথিকৃৎ

ফ্রান্সিসকো আলভিস মেন্দেজ ফিলহো ছিলেন একজন শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা, জলবায়ুকর্মী ও পরিবেশরক্ষক। চিকো মেন্দেজ নামেই তিনি বেশি পরিচিত। ব্রাজিলের আমাজন বন ও আদিবাসীদের রক্ষায় জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন মেন্দেজ। স্বাভাবিকভাবেই তার কর্মকাণ্ড নাখোশ করে ভূস্বামীদের। তারাই ১৯৮৮ সালের ২২ ডিসেম্বর চিকো মেন্দেজকে গুলি করে হত্যা করে। মৃত্যুর আগে বেশ কয়েকবার প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছিলেন মেন্দেজ। হুমকির কথা তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েও ছিলেন। মেন্দেজের নিরাপত্তার কথা ‘বিবেচনায় নিয়ে’ তার ছোট্ট কাঠের বাড়িতে ভূস্বামীনিবেদিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুজন পুলিশ সদস্য মোতায়েনও করেছিল। ২২ ডিসেম্বর মেন্দেজ বাড়ির পেছনের উঠানে গোসল করার সময় একটি গুলি তার দেহে বিঁধে। ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার মেন্দেজকে রক্ষার কথা থাকলেও তারা সে সময় তার রান্নাঘরের টেবিলে ডোমিনো খেলাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। তার হত্যাকারী পশু খামারের মালিক ডারসি আলভিস পরে বলেছিলেন, ‘পয়েন্ট ২২ রাইফেলের একটি গুলিই মেন্দেজকে হত্যার জন্য যথেষ্ট ছিল। সে মুহূর্তে মনে হচ্ছিল যেন কোনো বাঘকে গুলি করেছি।’

মেন্দেজের ছেলেবেলা

১৯৪৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর ব্রাজিলের আক্রি অঙ্গরাজ্যের জাপুরি পৌরসভায় জন্মগ্রহণ করেন চিকো মেন্দেজ। জন্মের পর তার বাবা ফ্রান্সিসকো আলভিস মেন্দেজ ও মা মারিয়া রিতা মেন্দেজ আক্রি ছেড়ে আমাজন অঙ্গরাজ্যে চলে যান। সেখানে ফ্রান্সিসকো রাবার ট্যাপার (রাবার গাছ থেকে আঠা সংগ্রহকারী) হিসেবে কাজ করতেন। ১১ বছর বয়সে বাবার সঙ্গে আমাজন বনে ঘুরে ঘুরে রাবার গাছ থেকে আঠা সংগ্রহ করা শুরু করেন মেন্দেজ। ছেলেবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিলেন চিকো মেন্দেজ। কারণ আমাজনের গহিন বনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল না। ভূস্বামীরা চাইতেন না, শ্রমিকরা পড়তে ও অঙ্ক কষতে পারুক; নইলে তো হিসাবের গরমিল শ্রমিকরা ধরে ফেলবে। এজন্য আমাজন বনে স্কুল স্থাপন সে সময় নিষিদ্ধ ছিল। একদিন রাবারের লেনদেন সংক্রান্ত রসিদ দেখে খটকা লাগায় আমাজনের নতুন এক বাসিন্দার দ্বারস্থ হন ১৮ বছর বয়সী মেন্দেজ। এই বাসিন্দার নাম ফারনান্দো ইউক্লিডস টেভোরা। তার সহায়তায় ১৯ বছর বয়সে পড়ালেখা শুরু করেন মেন্দেজ। টেভোরা ছিলেন একজন কমিউনিস্ট বিপ্লবী। ১৯৩৫ সালে ব্রাজিলের ফোর্তালেজা শহরে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণঅভ্যুত্থানে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৫২ সালে বলিভিয়ায় বিপ্লবের পর টেভোরা আমাজনে গিয়ে রাবার ট্যাপারের কাজ নেন। তিনি কেবল মেন্দেজের শিক্ষক নন, রাজনৈতিক গুরুও ছিলেন। পত্রপত্রিকায় টেভোরার ব্রাজিল নিয়ে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক লেখালেখি নিয়মিত পড়তেন মেন্দেজ। সেসব লেখা পড়ে রাষ্ট্রের শোষণকাঠামো সম্পর্কে সম্যক ধারণা হয় মেন্দেজের। টেভোরার কাছ থেকে আহরিত জ্ঞান নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি। আদিবাসী সম্প্রদায়কেও শিক্ষিত করার ব্রত নেন মেন্দেজ। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলে সামরিক অভ্যুত্থান হয়। ওই ঘটনার পর আর কখনো টেভোরাকে দেখেননি মেন্দেজ। মেন্দেজের জলবায়ুকর্মী হওয়ার পেছনে তার রাজনৈতিক শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বন উজাড় ও রাবার ট্যাপারদের শোষণের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। আমাজন বন রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার লড়াই ধীরে ধীরে মেন্দেজকে আপসহীন নেতায় পরিণত করে।                       

শোষণের শিকার

আমাজন বনে অনেকে সে সময় রাবার গাছ থেকে আঠা সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এই রাবার ট্যাপার বা আঠা সংগ্রহকারীরা বেশির ভাগ সময় শোষণের শিকার হতেন। হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়েও রাবার সংগ্রহকারীদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া হতো না। পরিবর্তে ভূস্বামীরা তাদের কেবল জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিতেন। কখনো কখনো রাবার সংগ্রহকারীদের মজুরি দেওয়া হলেও তা ছিল শ্রমিকের সর্বনিম্ন মজুরির চেয়ে অনেক কম। শোষিত শ্রেণি মজুরি বাড়ানো ও কর্মঘণ্টা কমানোর দাবি জানালেও তাতে কর্ণপাত করতেন না ভূস্বামীরা।           

রাবার শিল্পের ইতিহাস

ব্রাজিলের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে রাবার শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় ব্রাজিলের আমাজন অঙ্গরাজ্য ছিল রাবার শিল্পের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র। অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই শিল্প উপনিবেশ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। রাবার শিল্পের দরুন ফুলেফেঁপে ওঠে বেলেম, মানাস, পোর্তো ভেলহোসহ ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলীয় কয়েকটি শহর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রাজিলের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে হাজার হাজার মানুষ দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্য আমাজনে স্থানান্তরিত হয়। ওই সময় জার্মানি, জাপানকে ঠেকাতে মিত্রবাহিনীর বিপুল অস্ত্রের দরকার পড়ে। এজন্য আমাজন বনে রাবার উৎপাদন অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয় যাতে রাবার বিক্রির অর্থে অস্ত্রের জোগান দেওয়া সম্ভব হয়। এ নিয়ে সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল সরকারের একটি চুক্তিও হয়। চুক্তি অনুযায়ী তালিকাভুক্তির কর্মসূচি হাতে নেয় ব্রাজিল সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় হাজারো শ্রমিককে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে আমাজন, আক্রি ও পারা অঙ্গরাজ্যে পাঠানো হয়। তাদের কাজ ছিল রাবার গাছ থেকে আঠা সংগ্রহ। প্রত্যেক রাবার ট্যাপারকে যুক্তরাষ্ট্র ১০০ ডলার করে মজুরি দেবে বলে ব্রাজিল সরকার ওই শ্রমিকদের আশ্বাসও দেয়। সে সময় ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক মানুষ খরা ও দারিদ্র্যে ভুগছিল। এ কারণে ওই অঞ্চল থেকেই সবচেয়ে বেশি মানুষ উত্তরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হয়। এই স্থানান্তরিতদের মধ্যে চিকো মেন্দেজের বাবা ফ্রান্সিসকো আলভিস মেন্দেজ ও মা মারিয়া রিতা মেন্দেজও ছিলেন। ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলে স্থানান্তরিতদের সে সময় রাবার আর্মি ডাকা হতো। এই রাবার আর্মির অনেকে রোগে ভুগে ও বন্যপ্রাণীর আক্রমণে প্রাণ হারায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ব্রাজিল সরকার স্থানান্তরিতদের ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি বাড়ি ফেরানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ব্রাজিল সরকার যথারীতি প্রতিশ্রুতি রাখতে ভুলে যাওয়ায় মেন্দেজের বাবার মতো আরও অনেকের আর বাড়ি ফেরা হয়নি।

মেন্দেজদের ঘুরে দাঁড়ানো

কমিউনিস্ট টেভোরার কাছ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান ও বিরাজমান শোষক-শোষিতের সম্পর্ক ব্যাপকভাবে নাড়া দেয় চিকো মেন্দেজকে। সমাজের জন্য, আদিবাসীদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন তিনি। এরই লক্ষ্যে আমাজনের শ্রমিকদের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও নিজেদের অধিকার আদায়ে সচেতন করে তোলেন মেন্দেজ। একপর্যায়ে তারা গ্রামীণ শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করেন। এ ছাড়া ১৯৭৫ সালে রাবার ট্যাপার্স ইউনিয়ন গঠন করা হয়, যার প্রেসিডেন্ট ছিলেন আমাজন বন রক্ষার আরেক সৈনিক উইলসন পিনহেইরো ও সেক্রেটারি ছিলেন চিকো মেন্দেজ। এই দুই সংগঠন আমাজনের গাছ কাটা ও বন পুড়িয়ে ফেলার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করতে থাকে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিপ্লবী ইউনিয়ন নেতা ও অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে আমাজন অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মেন্দেজ।  

মেন্দেজদের ইউনিয়নের প্রতিপক্ষ ছিল গবাদি পশু খামারের মালিকরা। সত্তরের দশকে ব্রাজিলের সামরিক শাসন ও বিভিন্ন ব্যাংকের আনুকূল্যে এই মালিকরা আমাজনে থাকতে শুরু করে। পশু খামারের মালিক বা ভূস্বামীরা মিলে গ্রামীণ গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন নামে একটি সংগঠনও গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল শ্রমিক ইউনিয়ন নেতা ও বন রক্ষার আন্দোলনকারীদের ভূমি সংস্কার কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করা। পশু খামারের মালিকরা ব্রাজিল সরকার ও ব্যাংকের অর্থায়নে আমাজনের বিস্তীর্ণ এলাকার গাছ কেটে সেখানে গবাদি পশুর খামার গড়ে তোলেন। খুব দ্রুতই তাদের সঙ্গে বনের স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরোধ শুরু হয়। আমাজন অঞ্চলের দূরবর্তী এলাকায় যেখানে আইন বলতে কিছু নেই, সেখানে ভূমি সংস্কারের পক্ষের শ্রমিকদের লাশ পাওয়া নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।

মেন্দেজ, পিনহেইরোসহ আন্দোলনকারী আদিবাসীরা সে সময় ব্রাজিল সরকারের কাছে যে ভূমি সংস্কারসহ বিভিন্ন দাবিপূরণের আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেসব অত্যন্ত যুগোপযোগী ছিল বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বন ধ্বংস না করে বন ব্যবহার করা ছিল এসব দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য। আর এই বন ব্যবহার করতে হবে ভূমি সংরক্ষণের মাধ্যমে। সংরক্ষিত ভূমি পরিচালনার দায়িত্বে থাকবে স্থানীয় সম্প্রদায়। বনে যা কিছু উৎপাদন সম্ভব, স্থানীয় সম্প্রদায়কে সেসব উৎপাদনের অধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া গবাদি পশুর খামার মালিক বা ভূস্বামীদের যাতে অর্থায়ন করা না হয়, সে আহ্বানও জানানো হয় শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকে।

১৯৮৫ সালে ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রাবার ট্যাপার্সের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাবার ট্যাপাররা সে সময় রাজধানী শহরটিতে জড়ো হয়েছিল। বৈঠকে সড়ক উন্নয়ন, গবাদি পশুর খামার ও বন উজাড়ের কারণে আমাজন বনের অস্তিত্বের পাশাপাশি আদিবাসীদের জীবিকা যে হুমকির মুখে পড়েছে, তা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠকটি আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী আন্দোলনের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়। যুগ যুগ ধরে চলা ব্রাজিলের রাবার ট্যাপার্সদের শোষণ-বঞ্চনা সম্পর্কে বিশ্বের মানুষ আরও বিশদভাবে জানতে পারে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ঐক্য গড়ে ওঠে ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রাবার ট্যাপার্সের।

ন্যাশনাল কাউন্সিল অব রাবার ট্যাপার্সের বৈঠকের একটি বিষয় যেটি বিশ্বব্যাপী পরিবেশবাদী আন্দোলনের নজর কাড়ে তা হলো এক্সট্রাকটিভ রিসার্ভের ধারণা। এক্সট্রাকটিভ রিসার্ভ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এলাকা যেটি ব্যবহারের অধিকার স্থানীয় সম্প্রদায়ের হাতে থাকবে। এমনকি ওই এলাকায় কোনো প্রাকৃতিক সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেলে তার উত্তোলনের তদারকিতেও থাকবে ওই সম্প্রদায়ের মানুষ। এই এক্সট্রাকটিভ রিসার্ভের দাবি দীর্ঘদিন ধরে চিকো মেন্দেজসহ ইউনিয়ন নেতারা ব্রাজিল সরকারের কাছে করে আসছিলেন। মেন্দেজ মনে করতেন, রাবার গাছ থেকে আঠা সংগ্রহ আদিবাসীদের একমাত্র জীবিকা হতে পারে না। বাদাম, ফল, তেলসহ অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনের মাধ্যমে আরও বড় পরিসরে টেকসই জীবিকার পথ বের করা জরুরি। একই সঙ্গে শিশুদের মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করে সম্প্রদায়ের ভেতরে যোগাযোগ আরও মজবুত করা দরকার।              

১৯৮৭ সালের মার্চে মার্কিন পরিবেশবাদী সংগঠন এনভায়রনমেন্টাল ডিফেন্স ফান্ড ও ন্যাশনাল ওয়াইল্ড লাইফ ফেডারেশন চিকো মেন্দেজকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আমন্ত্রণ জানায়। উদ্দেশ্য, মেন্দেজ যাতে বিশ্বব্যাংক, ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও দেশটির কংগ্রেসকে বোঝান, তারা যেন আমাজনে এক্সট্রাকটিভ রিসার্ভ সৃষ্টি সমর্থন করে। পাশাপাশি পশ্চিম ইউরোপের থেকে আয়তনে বড় আমাজনে যেন গবাদি পশু খামারে অর্থায়ন বন্ধ করা হয়। আমাজন বন উজাড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বন্ধে কাজ করে যাচ্ছিলেন মেন্দেজ। এ ছাড়া আমাজনে গাছ কাটতে আসা বুলডোজার ঠেকাতে নারী-পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে মানব ব্যারিকেড তৈরিসহ অন্যান্য শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন অব্যাহত রাখেন তিনি। বন রক্ষার কর্মসূচিতে তার স্ত্রী ইলজামার মেন্দেজও অংশ নিতেন। মেন্দেজের কর্মসূচির সফলতা ধীরে ধীরে তার অনেক শত্রু তৈরি করে। মেন্দেজ জানতেন, তিনি প্রতিপক্ষের নিশানায় বন্দি। তাই ১৯৮৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর ৪৪তম জন্মদিনে তিনি বলেছিলেন, বড়দিন হয়তো তিনি দেখে যেতে পারবেন না। তাই-ই হয়েছিল। জন্মদিনের ঠিক এক সপ্তাহ পর ডিসেম্বরের ২২ তারিখে প্রাণ হারান মেন্দেজ। তার হত্যাকারী ছিলেন গবাদি পশুর খামারের মালিকের ছেলে ২২ বছর বয়সী ডারসি আলভিস। মেন্দেজের মানব ব্যারিকেড কর্মসূচির কারণে ডারসি ও তার বাবা ডারলি আলভিস তাদের খামারের আয়তন বাড়াতে পারছিলেন না। ১৯৯০ সালে মেন্দেজ হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন ডারসি ও ডারলি। বাবা-ছেলে দুজনই ১৯ বছর জেল খাটার পর মুক্ত হন। অবশ্য মেন্দেজ হত্যায় খামারের মালিক বা ভূস্বামীদের সংগঠন গ্রামীণ গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন ও ব্রাজিলের পুলিশ বাহিনী ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। মেন্দেজ একবার বলেছিলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম আমি রাবার গাছ রক্ষার জন্য লড়াই করছি, পরে দেখলাম না, আমি তো আমাজন বনের স্বার্থে লড়ছি। এখন বুঝতে পারছি, আমি কেবল রাবার গাছ বা আমাজন বনের জন্য নয়, বরং গোটা মানবজাতির জন্য লড়াই করছি।’ এই লড়াই থেকে কখনো সরে যাননি ব্রাজিলের প্রাণ-প্রকৃতি লড়াইয়ের অবিসংবাদী নেতা ও ভূমিপুত্র চিকো মেন্দেজ।