করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়ানক সব লক্ষণসহ একই সঙ্গে বহুমুখী সংকটের এক অভূতপূর্ব কালপর্বে প্রবেশ করেছে বিশ্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বিশ্বব্যবস্থা হয়তো নিখুঁত ছিল না, তথাপি, তা অন্তত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য মোটামুটি স্থিতিশীল একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে তা ভেঙে পড়ছে। রাশিয়া কোনো যুক্তিসংগত কারণ ছাড়াই প্রতিবেশী দেশ ইউক্রেনে আক্রমণ করেছে। ছয় মাস ধরে রুশ সেনারা এমনভাবে বিজয়ের এক রক্তাক্ত অভিযান চালাচ্ছে, যা ২০২০-এর দশকের জন্য মানানসই নয়। রাশিয়ার এই আচরণ অনেকটা ১৯৪০-এর দশকের উগ্র জাতীয়তাবাদী তথা ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রগুলোর মতোই, যা আমরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানির মধ্যে দেখতে পাই। পূর্ব ইউরোপ, তাইওয়ান প্রণালি এবং মধ্যপ্রাচ্যে নজিরবিহীনভাবে এমন এক ত্রিমুখী বিপজ্জনক সংকটের ঝাঁপি খুলছে, যা স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা এবং এর অহিংসার নীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের মূলনীতিগুলোকে অকার্যকর করে ফেলছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমারা স্নায়ুযুদ্ধে তাদের বিজয়ের সুযোগ নিয়ে বিশ্বের সামনে তাদের রাষ্ট্র ও আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকেই একমাত্র টেকসই মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে। কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যেসব স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে, তাদের প্রতি এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর প্রতি পশ্চিমের বার্তা ছিল একটাই, ‘আমাদের অনুসরণ করো। পুঁজিতন্ত্র, মুক্তবাজার অর্থনীতি এবং গণতন্ত্রই তোমাদের আধুনিকতা, সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা এনে দেবে’। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা এবং পূর্ব এশিয়া ছাড়া আর কোথাও এই মডেল প্রতিশ্রুতি মতো কাজ করেনি। এমনকি সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সাফল্য পায় চীন এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশ, যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়াই শুধু মুক্তবাজার অর্থনীতির কিছু নীতি গ্রহণ করে। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক মডেলের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে শুরু করেন। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই স্টিগলিৎজ সম্প্রতি ‘ঐড়ি ঃযব টঝ ঈড়ঁষফ খড়ংব ঃযব ঘবি ঈড়ষফ ডধৎ’ শিরোনামে তার এক লেখায় বলেন, ‘স্নায়ুযুদ্ধের পর দুই দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশ্বে স্পষ্টতই এক নম্বরে ছিল। কিন্তু তারপর মধ্যপ্রাচ্যে চালানো বিপর্যয়করভাবে বিপথগামী যুদ্ধ, ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয়, ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, করোনা মহামারী এবং অন্যান্য সংকট যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মডেলের শ্রেষ্ঠত্বের ওপর ঘোর সন্দেহ জাগিয়ে তুলেছে। এ ছাড়া, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো লোকের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া, ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্পপন্থিদের চড়াও হয়ে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করা, স্কুলে বা শপিং মলে ঢুকে বন্দুকধারীর নির্বিচার গুলি করে মানুষ মারার অসংখ্য ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়েছে, আমেরিকার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন গভীরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’
এখন প্রশ্ন হলো নতুন এই মহাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা পশ্চিমা গণতন্ত্র (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ) এবং প্রাচ্যের কর্র্তৃত্ববাদের (চীন ও রাশিয়া) মধ্যে একটি বৃহত্তর পদ্ধতিগত সংঘাতে রূপ নেবে কি না তথা দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেছে? আসলে চীন ও রাশিয়া উভয়ের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এক স্নায়ুযুদ্ধ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। রাশিয়ার ইউক্রেনে হামলার অনেক আগেই এই স্নায়ু যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। তবে এই স্নায়ুযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম। জোসেফ ই স্টিগলিৎজ বলেন, ‘এই দ্বন্দ্বকে মার্কিন নেতারা গণতন্ত্র এবং কর্র্তৃত্ববাদের সংঘাত হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, তারা একদিকে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনছেন, অন্যদিকে, একই অভিযোগে অভিযুক্ত সৌদি আরবের মতো দেশের বিষয়ে চুপ থাকছেন এবং তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখছেন। এ ধরনের ভণ্ডামি ইঙ্গিত দেয়, যুক্তরাষ্ট্র আসলে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় নয়; বরং বিশ্বব্যাপী তার আধিপত্য বিস্তারের উদ্দেশ্যেই মানবাধিকার ইস্যুতে পক্ষপাতমূলকভাবে সোচ্চার হয়।’ এ ছাড়া, এখনকার বিশ্ব পরিস্থিতি প্রথম স্নায়ুযুদ্ধ শুরুর সময় তথা ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন এবং জটিল। ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যে সহিংস সংঘাতের নতুন-পুরাতন ঝুঁকির সঙ্গে জলবায়ু সংকটকেও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। এ বছর চীন এবং ইউরোপ জুড়ে অভূতপূর্ব তাপপ্রবাহ দেখিয়ে দিয়েছে, জলবায়ু সংকট নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলবে। মানবজাতির পক্ষে আর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিনিয়োগকে উপেক্ষা করা বা স্থগিত রাখা সম্ভব নয়। এজন্য বিশ্বের সব শিল্পোন্নত দেশ এবং তাদের অনুসরণে কথিত উন্নয়নের পথে হাঁটা দেশগুলোরও বিদ্যমান আর্থসামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণ নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে এবং এমনকি আমূল বদলে ফেলার প্রয়োজনও হতে পারে। কারণ এই বিশ্ব জলবায়ু সংকট তৈরি হয়েছে মূলত প্রাণ ও প্রকৃতিকে সর্বোচ্চ শোষণ করে সর্বোচ্চ উৎপাদন এবং পুঁজির সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করার এই আর্থসামাজিক ব্যবস্থা থেকেই। যাকে আমরা বলি পুঁজিতন্ত্র।
প্রথম স্নায়ুযুদ্ধে জয়-পরাজয় শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েই নির্ধারিত হয়েছিল। কিন্তু এই স্নায়ুযুদ্ধে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে আরও ন্যায়সংগত এবং বৈষম্যহীন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার এবং জলবায়ু সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার মাধ্যমে। জয়ের জন্য, পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোকে এমন কিছু দিতে হবে যা সত্যিকার অর্থেই সব মানুষের উপকারে আসে। মূল সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে বিশেষ করে আর্থসামাজিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে। ১৫০ বছর ধরে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও একটি ন্যায়সংগত এবং সুখী বিশ্ব গঠনে মানবজাতি সামষ্টিকভাবে তার প্রযুক্তিগত উন্নতিকে কাজে লাগাতে পারেনি। সার্বিকভাবে বিশ্বের অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও মানবজাতি এখনো সবার মাঝে এর সুফল সুষমভাবে বণ্টন করে সামষ্টিকভাবে এর স্বাদ নিতে পারেনি। কিন্তু পশ্চিমের নেতৃত্বাধীন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে তা আর দেওয়া সম্ভবও নয়। ফলে এর ভেঙে পড়াও অনিবার্য। জলবায়ু সংকট সম্পর্কে মনে রাখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ সংকট মানবসমাজের ঐতিহাসিক অগ্রগতির চলার পথে আসা কোনো সাধারণ সংকটের মতো নয়; যেখানে বেশির ভাগ সংকট বিদ্যমান সিস্টেমের মধ্যেই ঘটে এবং অবশেষে সিস্টেমের স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে। বরং জলবায়ু সংকট খোদ সিস্টেমেরই সংকট। জলবায়ু সংকট বিদ্যমান সিস্টেমের কারণেই সৃষ্ট এক মহাসংকট। ফলে বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার আর্থসামাজিক কাঠামো অক্ষত রেখে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সুতরাং, এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার আগমন অনিবার্য হয়ে পড়েছে এবং এটাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, আগের স্থিতাবস্থায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। পরিবেশ ধ্বংস এবং জলবায়ু সংকট বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার টিকে থাকার শর্তগুলোও সব উপড়ে ফেলছে।
রাশিয়ার আগ্রাসন অবশ্যই একটা বড় হুমকি। তবে শিগগিরই হয়তো এর একটা সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, শুকনো নদীর তলদেশ, শুষ্ক ভূদৃশ্য, বিধ্বংসী দাবানল, সর্বগ্রাসী বন্যা, নজিরবিহীন খরা এবং ফসলের ফলন কমে যাওয়া ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দেয়। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করছিলেন, এ সমস্যাগুলো আসছে; কিন্তু তার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিশ্বের নেতৃস্থানীয় উন্নত দেশগুলো জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় এখনো প্রায় কিছুই করেনি। কারণ, এজন্য সত্যিকার অর্থেই কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে গেলে বিদ্যমান রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থায় বড় পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। শুধু শিল্পোন্নত দেশগুলোই নয় বরং বাংলাদেশসহ তাদের অনুসরণে কথিত উন্নয়নের মহাসড়কে উঠতে মরিয়া বিশ্বের বেশির ভাগ রাষ্ট্রই এ ধরনের প্রকল্প হাতে নিতে এখনো রাজি নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো জলবায়ু সংকটের পরিণতি যখন আরও বেদনাদায়কভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠবে, তখনো কি আমাদের হাতে সবকিছু ঠিকঠাক করার জন্য যথেষ্ট সময় থাকবে? নাকি বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন এরই মধ্যে চরম সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে, যেখান থেকে আর ফিরে আসা সম্ভব নয় এবং যা শুধু পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন এক তাপ যুগেরই সূচনা করবে না বরং মানুষসহ প্রায় প্রতিটি প্রাণীর জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে এবং পৃথিবী জুড়ে এক নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করবে?
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক
jr.tareq@gmail.com