আরেকটা ‘নভেম্বর’র আগেই অধরা শতক পেলেন কোহলি

আগামী নভেম্বরে ৩৪ বছর হবে তার। তারও তিন বছর আগে, নভেম্বর ২০১৯। ইডেন গার্ডেনে এবাদত হোসেন যেন ভিরাট কোহলির ক্যারিয়ারের ‘নভেম্বর রেইন’ ঝরিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৩৬ রান করে সেদিন আউট হয়েছিলেন তিনি। সেই তার ক্রিকেটে শেষ শতকের দেখা। তারপর থেকেই অধরা তিন অংকের রান। না আন্তর্জাতিক, না ফ্র্যাঞ্চাইজিতে। রঙিন কিংবা সাদা পোশাক, কোথাও আর ভিরাট কোহলির সেঞ্চুরির দেখা নেই। এই অফ-ফর্ম না ফেরার উল্লেখ করে কেউ কেউ তার ক্যারিয়ারের শেষটাই দেখে ফেলেছিলেন।

তবে আরেকটা নভেম্বরের আগেই কোহলি পেয়ে গেলেন অধরা সেই শতকের দেখা। চ্যাম্পিয়নরা যে এক জায়গায় থেমে থাকে না, ভারতের সাবেক অধিনায়ক যেন সেটাই প্রমাণ করলেন। চেনারূপে ফিরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে বিধ্বংসী এক ইনিংস খেলে দেখা পেলেন টি-টোয়েন্টির প্রথম শতকের। ৬১ বলে ১২২ রানের ইনিংস খেললেন। ইনিংসটি তিনি ১২টি চার ও ৬টি ছক্কায় সাজিয়েছিলেন। স্ট্রাইক রেট ছিল ২০০। এর আগে ২০১৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৯৪ রানের অপরাজিত একটি ইনিংস খেলেছিলেন। এই সংস্করণে এতদিন এটাই ছিল তার সর্বোচ্চ।

ক্যারিয়ারের প্রথম টি-টোয়েন্টি শতক দিয়েই ভিরাট ঢুকে গেছেন তিন ফরম্যাটের সেঞ্চুরিয়ানদের ক্লাবে। তিনি এই ক্লাবের ২০ নম্বর সদস্য। যেখানে আছেন স্বদেশী আরও তিনজন। সুরেশ রায়না, রোহিত শর্মা ও লোকেশ রাহুল।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোহলি প্রথম শতকের দেখা পেয়েছিলেন ২০০৯ সালে। একদিনের ম্যাচে শ্রীলংকার বিপক্ষে সেদিন ১০৭ রান করেছিলেন কোহলি। তারও তিন বছর পর ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাদা পোশাকে প্রথম সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন তিনি। দশ বছর পর ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত এই সংস্করণে পেলেন প্রথম শতরান।

দীর্ঘ ১০২০ দিন পর শতরান পেয়ে দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে ভিরাট কোহলির যেন শাপমুক্তি হলো। তার তিন অংকের রান দেখা নিয়ে কত অপেক্ষা, কত দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ছিল। সেই খরা অবশেষে কাটল। আড়াই বছর আগে বাংলাদেশের বিপক্ষেই পেয়েছিলেন ৭০তম শতকের দেখা। তার আগে থেকেই ভাবা হতো, শচিন টেন্ডুলকারকে স্পর্শ করতে বেশি সময় লাগবে না তার। কিন্তু ভক্ত ও বিশ্লেষকদের সে ভাবনায় ছেদ পড়ে সে দিনের পর থেকেই। ভিরাট ভক্তদের অপেক্ষার পাল্লা ও ভারি হতে থাকে।

তবে ভক্তদের অপেক্ষার অবসান ঘটালেন এশিয়া কাপে নিজেদের শেষ ম্যাচে। টুর্নামেন্টের ফাইনালে খেলার আশা শেষ হয়েছে আগেই। এই ম্যাচে তাই হারানোর কিছুই ছিল না। নিয়মিত অধিনায়ক রোহিত শর্মাকে বিশ্রাম দেয় ভারত। তিন থেকে প্রমোশন পেয়ে উদ্বোধনী ব্যাটার হিসেবে নামেন কোহলি। আর নেমেই করেন বাজিমাত! টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দারুণ ছন্দে ছিলেন। প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৩৫ রান করেছিলেন। হংকংয়ের বিপক্ষে ৫৯ রান করে অপরাজিত থাকেন। দ্বিতীয় দেখায় পাকিস্তানের বিপক্ষে তিনি করেন ৬০ রান। আর শেষ ম্যাচে সেঞ্চুরিতে ঘুচেছে গত আড়াই বছরের খরা।

তবে এমন কীর্তি গড়ার দিনেও নিজের অভিমানটা লুকিয়ে রাখতে পারলেন না কোহলি। যে অভিমানের শুরুটা করেছিলেন পাকিস্তান ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে। সেখানে তিনি জানিয়েছিলেন, টেস্ট অধিনায়কত্ব ছাড়ার পর মহেন্দ্র সিংহ ধোনি ছাড়া কেউ তাঁকে বার্তা পাঠাননি। অভিমানটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ৭১তম শতরানের দিনেও যখন কোনো কোচ বা সতীর্থের নাম শোনা গেল না তাঁর মুখে। বার বার ঘুরেফিরে সেখানে তিনি স্ত্রী আনুষ্কা শর্মা এবং মেয়ে ভামিকার নাম নিয়েছেন।

সঞ্চালকের প্রশ্নে প্রথমেই কোহলি বলেন, ‘আমি আপ্লুত। খুব ভাল লাগছে। গত আড়াই বছর ধরে অনেক কিছু শিখেছি। নভেম্বরে আমার ৩৪ বছর হবে। এখন আগের মতো ও ভাবে উচ্ছ্বাস করতে পারি না। শতরানের পরে আমি একটু অবাকও। কারণ এই ফরম্যাট থেকে যে আমি শতরান পেতে পারি, সেটা ভাবনার বাইরে ছিল। ঈশ্বরের আশীর্বাদেই এটা সম্ভব হয়েছে। কঠোর পরিশ্রম করেছি। এই মুহূর্তটা শুধু আমার একার নয়, গোটা দলের কাছেই বিশেষ আবেগের।’

শতরানের পর গলায় ঝুলে থাকা লকেটটিতে চুমু খান কোহলি। এর কারণ সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে জানান। তিন অংক ছোঁয়ার পর মাথায় কি চলছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক কিছু চলছিল। দলে ফেরার সময় প্রত্যেকে স্বাগত জানিয়েছিল। আমি যেভাবে খেলতে চাই, সেভাবেই খেলতে বলেছিল। বাইরে থেকে অনেকে অনেক কথাই বলছিল। আমরা পাত্তা দেইনি। শতরানের পর গলায় ঝুলিয়ে রাখা লকেটে চুমু খেলাম। কারণ, আমার ফিরে আসা এবং সব সময় পাশে দাঁড়ানোর জন্য সবচেয়ে বেশি অবদান এক জন মানুষেরই রয়েছে। সে আমার স্ত্রী আনুষ্কা শর্মা। এই শতরান সবার আগে ওকে এবং আমাদের মেয়ে ভামিকাকে উৎসর্গ করছি।’