সব হারিয়ে কোহলির সেঞ্চুরি পেল ভারত

বিশাল এক ছক্কা মেরে তিন অঙ্কে পা রাখলেন। ড্রেসিংরুমের দিক ফিরে দুই হাত একটু ছড়িয়ে বিরাট কোহলির অভিব্যক্তি  কী হলো এটা! এরপর শুধু হাসছেন। গত ১০১৯ দিন ধরে এই হাসি যে তার মুখে ছিল না। আকাশ পানে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিলেন, বিয়ের আংটিতে চুমু খেলেন, পুরো স্টেডিয়ামে থাকা দর্শকদের অভিবাদনের জবাবও দিলেন। এসব কিছুটা সময় নিয়েই করলেন কোহলি। তার সেঞ্চুরিটাও যে এসেছে অনেকটা সময় পর... ২০১৯ নভেম্বরে বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্টে শেষ শতক করেছিলেন। এরপর তার নিশ্চুপ ব্যাট হাসল এতদিনে এসে।

এশিয়া কাপে সব হারিয়ে কোহলির সেঞ্চুরিটাই পেল ভারত। ১২ চার ও ৬ ছক্কায় ৬১ বলে করেছেন অপরাজিত ১২২। হয়েছেন তিন ফরম্যাটে সেঞ্চুরি করা ২০তম ব্যাটার। তার ব্যাটে টুর্নামেন্টের সেরা রান ২ উইকেটে ২১২ রানের পুঁজিও গড়ল তারা। পরে ভুবনেশ্বর কুমারের ৫ উইকেটে আফগানিস্তানকে ৮ উইকেটে ১১১ রানে বেঁধে ফেলে ভারত। ১০১ রানের জয়টি টি-টোয়েন্টিতে তাদের দ্বিতীয় সেরা। আর এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো এক টি-টোয়েন্টিতে সেঞ্চুরি ও ৫ উইকেটের দেখা মিলল।

ওই যে ‘কী হলো...’ ভঙ্গিটা দেখালেন না...তার কারণ কোহলি নিজ মুখেই জানান ইনিংস শেষে, ‘আমি সেঞ্চুরির আশায় ছিলাম কিন্তু সেটা টি-টোয়েন্টিতেই যে আসবে তা আমি নিজেই ভাবিনি।’ কোহলির জন্য এই সেঞ্চুরি তাই বিশেষ। নিজেকে ফিরে পেতে, সমালোচকদের জবাব দিতে সব দিক থেকেই। কঠিন সময়গুলো ভুলতেও কাজে দেবে এই সেঞ্চুরি। পাশাপাশি নিজেকে নতুন করে ফিরেও পাবেন কোহলি। তাই বিশেষ এই সেঞ্চুরি উৎসর্গ করলেন বিশেষ জনদেরই, ‘আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি একমাত্র একজন মানুষের জন্য। আমার ক্যারিয়ারের পুরোটা সময় সে আমার জন্য সবকিছু ঠিক রেখেছে। আমি তাই আনুশকাকেই এই শতক সেঞ্চুরি উৎসর্গ করতে চাই এবং আমাদের মেয়ে ভামিকাকেও।’

এশিয়া কাপের দলে যোগ দেওয়ার আগে ৬ সপ্তাহ ক্রিকেটের বাইরে ছিলেন কোহলি। এই বিশ্রাম তাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে বলে জানালেন। তাই আগের মতো সেঞ্চুরির উদযাপনে ছিল না বাতাসে ঘুষি। এখন অনেক পরিণত হয়েই ফিরেছেন কোহলি, ‘এই বিশ্রাম আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এই সময়ে আনুশকা আমাকে শক্ত রেখেছে। ক্রিকেটে ফেরার পর আমি সেঞ্চুরির জন্য মরিয়া ছিলাম না। মানুষ অনেক কিছুই বলেছিল সেঞ্চুরি না পাওয়ায় কিন্তু আমি ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছি বিশ্রামের আগে আমাকে যা দিয়েছেন তার জন্য। ওই চিন্তাই এখন আমাকে শান্ত করে দিয়েছে। বিশ্রামে আমি বুঝেছি কতটা প্রয়োজন ছিল ওই বিরতিটা, কতটা ক্লান্ত ছিলাম। দলে ফিরে মনে হচ্ছে আমি নিজেকে ফিরে পেয়েছি, এখন সেই পুরনো পারফরম ফিরিয়ে আনার পালা।’

সত্যিই পুরনো কোহলি ফিরে এসেছেন। ৪০ বলে ৫৯ করে আগের মতো ছুটিয়েছেন রানের ট্রেন। তাই পরের ২১ বলে করলেন ৭২। শেষ ৫ ওভারে এমন সব শটস খেলছিলেন যা তরুণ কোহলির ব্যাটেই দেখা মিলত। ছন্দে থাকা সেই সব চোখ জুড়ানো কাভার ড্রাইভ বা জায়গায় দাঁড়িয়ে কোমরসমান বলে স্লগ করে ছক্কা। সব ফিরিয়ে এনেছেন কোহলি। তাই ক্যারিয়ারের ৭১তম সেঞ্চুরিটা করে সর্বোচ্চ শতকের তালিকায় পাশে বসলেন রিকি পন্টিংয়ের। এই সেঞ্চুরির জন্য অবশ্য ইব্রাহিম জাদরানকে ধন্যবাদ দিতেই পারেন কোহলি। ২৮ রানে থাকার সময় ইব্রাহিম মিডউইকেটে ক্যাচটি না ছাড়লে এই ইনিংসটি তো আসত না। নিশ্চিতভাবেই ছাড়িয়ে যাবেন সাবেক অস্ট্রেলিয়ানকে আর ছুটবেন শতকের শতক করা শচিন টেন্ডুলকারের দিকে। কোহলি ছাড়াও লোকেশ রাহুলের ৪১ বলে ৬২ রানে ১১৯ রানের উদ্বোধনী জুটি ছিল ভারতের। কোহলির সেঞ্চুরির দিনে পুরোপুরি ভেঙে পড়ে আফগানিস্তান। আগের দিনের মতো লড়াই উপহার দিতে পারেনি তারা। ব্যাটিংয়ে এক ইব্রাহিম জাদরান ছাড়া সব ব্যাটারের রান সিঙ্গেল ডিজিটে। ৫৯ বলে ৬৪ রানে অপরাজিত ছিলেন জাদরান। শেষদিকে রশিদ ১৫ ও মুজিব ১৮ রান করেন। ভুবনেশ্বর ৪ ওভারে মাত্র ৪ রানে ৫ উইকেট নেন। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে এত কম রানে ৫ উইকেট নেওয়ার এটা দ্বিতীয় সেরা নজির।   

ফাইনালের পূর্বমঞ্চায়ন : দুই দলই জেনে গেছে এশিয়া কাপ ফাইনালে তারাই প্রতিদ্বন্দ্বী। ফাইনালের আগে তাই একবার মুখোমুখি হওয়াটা এড়াতেই চাইত পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা। অগত্যা সূচির নিয়ম মতো মাঠে নামতেই হচ্ছে। অগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ বলে অনেক কিছুই করতে পারে দুই দল। নিজেদের সেরাটা ধরে রেখে বেঞ্চের ক্রিকেটারদের দেখে নেওয়া, বিপক্ষকে ফাইনালের পরিকল্পনা বুঝতে না দেওয়া, কিংবা এই ম্যাচে একরকম খেলে ফাইনালে অন্য পরিকল্পনায় নামার চেষ্টা করতেই পারে পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা। তবে যাই হোক ফাইনালের পূর্বমঞ্চায়নে শেষ চিন্তাটা অবশ্যই থাকবে জয়।

শ্রীলঙ্কার সঙ্গে হারের পর রোহিত শর্মা বলেছিলেন এমন টুর্নামেন্টে আলাদা প্রতিপক্ষ আসে। তাই বুঝে ওঠা যায় না এক ম্যাচে বিপক্ষের পরিকল্পনা কী। সেই মতো নিজেদের ছকটা করা যায় না। কিন্তু পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা এখন এই অবস্থানে। আজ ম্যাচের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে কাজ করবে ফাইনালের আগে। আবার এই ম্যাচে কে কেমন করেছে তার বিচার-বিশ্লেষণও হবে ফাইনালে নামার আগে। পরপর দুই ম্যাচ তাই দুই দলের জন্য অন্য রকম সমস্যা তৈরি করেছে।

তবে জয়ের আত্মবিশ্বাসে পিছিয়ে নেই কেউ। দুই দলই নিজেদের সেরা ম্যাচ খেলে এসেছে সুপার ফোরে। শেষ ওভারের জয়ে জেতার মানসিকতায় জোর ধাক্কা লেগেছে। শ্রীলঙ্কা সেরা লড়াই দিয়ে বিপদে ফেলেছে ভারতকে। আর পাকিস্তান নাসিম শাহ’র অতিমানবীয় ব্যাটিংয়ে রোমাঞ্চকর জয় তুলেছে। তাতে আফগানিস্তান ও ভারত দুই দলেরই এশিয়া কাপ শেষ হয়। আজকের ম্যাচে জয় দিয়ে ফাইনালে সেরা ধারাবাহিকতা নিয়ে যেতে চাইবে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা।