সার সংকট মোকাবিলা ও জৈব সার

ফসল উৎপাদনে সার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সারের সুষম ব্যবহারের ওপর নির্ভর করে ফসলের বৃদ্ধি, বিকাশ, দানাগঠন, ফুল ও ফল উৎপাদন, ফলের আকার আকৃতি, দানার পরিপুষ্টতা ও ফলন। এমনি অনেক অনিষ্টকারী পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ রোধ করা যায় সময় মতো সুষম সার ব্যবহারের মাধ্যমে। সারের সংকট হলে দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। তখন নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্টের সীমা থাকে না। কারণ এ দেশের মানুষ তাদের আয়ের শতকরা ৬০ ভাগ অর্থ ব্যয় করেন খাদ্য ক্রয়ের পেছনে।

ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি, উচ্চ ফলনশীল জাতের চাষ ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে সারা পৃথিবীতে বাড়ছে রাসায়নিক সারের ব্যবহার। ষাটের দশকে ইরি ধান চাষের মাধ্যমে দেশে প্রথম শুরু হয় রাসায়নিক সারের প্রয়োগ। এর আগে কৃষক পচা গোবর, আবর্জনাপচা, কম্পোস্ট, ছাই, খইল, হাড়ের গুঁড়া, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ইত্যাদি সার হিসেবে ব্যবহার করতেন। সে সময় ফসলের ফলনও ছিল কম। ফলে সারা বছরই খাদ্য সংকট লেগে থাকত। শুধু দানাশস্য নয়, শাকসবজি ও ফলমূলেরও এত উৎপাদনও ছিল না দেশে।  বিপুল পরিমাণ সারের প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে।

চাহিদা মতো সার না পেয়ে বেশ কদিন ধরে জামালপুরে বিক্ষোভ করছেন কৃষকরা। সম্প্রতি (৪.৯.২২) সদর উপজেলার শরিফপুর বাজার এলাকায় সারের দাবিতে জামালপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। পরের দিন উপজেলার  নান্দিনা বাজার এলাকায় আবারও মহাসড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। জামালপুরের সদর উপজেলায় সিøপের মাধ্যমে প্রতি তিন জন কৃষককে দেওয়া হয় ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা ইউরিয়া সার। অর্থাৎ প্রত্যেক কৃষককে দেওয়া হয় সাড়ে ১৬ কেজি করে সার।  এই পরিমাণ সার দিতে হয় এক বিঘা জমিতে। যেসব কৃষক এক বিঘার বেশি আবাদ করেছেন, তারা সার পাবেন কোত্থেকে? এ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছে। আবার সার কিনতে এসে অনেককেই খালি হাতে ফিরে যেতে হয়েছে। কৃষকের অভিযোগ, চাহিদার চেয়ে কম সার দেওয়া হচ্ছে তাদের। শুধু জামালপুর কেন শেরপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁওসহ দেশের অনেক জেলায় একই অবস্থা বিরাজ করছে।

এদিকে, বর্তমানে রোপা আমন ধানের কুশি উৎপাদন পর্যায় চলছে। এখনই ক্ষেতে ইউরিয়া সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময়। এ সময় যদি কৃষক চাহিদা অনুযায়ী সার না পান, তাহলে তা ফলনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার ধানীখোলা দক্ষিণ ভাটিপাড়া গ্রামের প্রগতিশীল

কৃষক মো. সাহাব উদ্দিন এবার দেড় একর জমিতে আমন ধানের চাষ করেন। তিনি কদিন আগে স্থানীয় বাজার থেকে ২৮ টাকা কেজি দরে ইউরিয়া এবং ৩০ টাকা কেজি দামে পটাশ সার কিনে জমিতে প্রয়োগ করেন। অথচ কৃষক পর্যায়ে ইউরিয়া সারের সর্বোচ্চ মূল্য ২২ টাকা এবং পটাশ সারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১৫ টাকা। সারের ডিলার ও সার ব্যবসায়ীদের কারসাজির কারণেই কৃষক সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পাচ্ছেন না। এর অবশ্যই প্রতিকার হওয়া প্রয়োজন।

সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, চাহিদার বিপরীতে দেশে সব ধরনের সারের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বর্তমানে (০৭.০৯.২০২২) ইউরিয়া সারের মজুদ রয়েছে ৬ লাখ ৪১ হাজার টন, টিএসপি ৪ লাখ ১৫ হাজার টন, ডিএপি ৯ লাখ ৪ হাজার টন, এমওপি ২ লাখ ৪৬ হাজার টন। সারের বর্তমান মজুদের বিপরীতে সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সারের চাহিদা হলো ইউরিয়া ৩ লাখ ৫০ হাজার টন, টিএসপি ৯৬ হাজার টন, ডিএপি ২ লাখ ১৯ হাজার টন এবং এমওপি ১ লাখ ২১ হাজার টন। বিগত বছরে একই সময়ে  ইউরিয়া সারের মজুদ ছিল ৫ লাখ ৯৯ হাজার মেট্রিক টন, টিএসপি ২ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন, ডিএপি ৬ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন এবং এমওপি ১ লাখ ৮১ হাজার টন। এতে প্রতীয়মান হয় যে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই। এক শ্রেণির সার ডিলার ও ব্যবসায়ী সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের কারসাজির কারণেই দেশে সার নিয়ে এই অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে।

সারের কারসাজি রোধে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কতিপয় নির্দেশনা দেওয়া হয় কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে। নির্দেশনাগুলো হলো রসিদ ছাড়া যেন সার বিক্রি না হয়, তা নিশ্চিত করা। ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার দোকানে লালসালুতে বা ডিজিটালি সারের মূল্য তালিকা টানিয়ে রাখা নিশ্চিত করা। খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার সরবরাহ নিশ্চিত করা।

কৃষককে যেন লাইনে দাঁড়িয়ে  সিøপ দিয়ে সার কিনতে না হয়, তা নিশ্চিত করা। ডিলারের গুদাম পরিদর্শন করে সারের আগমন নিশ্চিত করতে হবে ও ট্রাক চালানের সঙ্গে, তা যাচাই করে দেখতে হবে। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কৃষি বিভাগ নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করবে। এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে সার বরাদ্দের সঙ্গে সঙ্গেই বিসিআইসি থেকে সার উত্তোলনের  অনুমতি দেওয়ার জন্য বিসিআইসি চেয়ারম্যানকে পরামর্শ প্রদান করা হয়। এসব নির্দেশনা মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সারের কৃত্রিম সংকট অনেকটা রোধ হবে। কৃষক সরকার নির্ধারিত মূল্যে সময় মতো রাসায়নিক সার সংগ্রহ করতে পারবেন এবং লক্ষ্যমাত্রা মোতাবেক ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে দেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা।

শুধু রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভর না করে কৃষক ভাইদের জৈব সার ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য আমাদের দেশের প্রতিটি পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনে বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। উৎপাদিত জৈব সার নগর ও তার আশপাশের এলাকার কৃষকদের মধ্যে নামমাত্র মূল্যে বিতরণ করতে হবে। প্রতিটি গ্রামে কৃষক পর্যায়ে ভার্মিকম্পোস্ট ও ট্রাইকোকম্পোস্ট সার উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বোরো ধান কাটার পর আমন রোপণের আগে ওই জমিতে জৈব সার হিসেবে ধইঞ্চার চাষ করতে হবে। আমন ধানের জমিতে ইউরিয়া সারের বিকল্প হিসেবে অ্যাজোলার চাষেও কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। এতে রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার হ্রাস পাবে। জৈব সারের ব্যবহার বাড়বে। মাটির গুণাগুণ উন্নত হবে। ফসলের স্বাদ বাড়বে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষিত হবে। বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এজন্য সরকারকে রাসায়নিক সারের মতো জৈব সার উৎপাদন ও বিপণনে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি প্রদান করতে হবে। ধান ক্ষেতে গুটি ইউরিয়া ব্যবহারে যেহেতু ২৫ শতাংশ সার কম লাগে এবং ১৫ শতাংশ ফলন বৃদ্ধি পায় তাই এ প্রযুক্তির ব্যবহারে কৃষকদের মনোযোগ দিতে হবে। সেইসঙ্গে লিফ কালার চার্ট ব্যবহার করে ধানক্ষেতে ইউরিয়া সার ব্যবহার করতে হবে।

লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন

netairoy18@yahoo.com