বর্তমানে বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর ২০টি কারণের অন্যতম একটি হলো আত্মহত্যা। প্রতি ৪০ সেকেন্ডে বিশ্বের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, বছরে প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশেষত ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী যুবক-যুবতীরা বেশি আত্মহত্যা করে বলে জানা গেছে। যা মানবতার জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার পেছনে থাকা কারণগুলোর অন্যতম হলো মানসিক হতাশা ও বিষণœতা, দাম্পত্যজীবনে কলহ কিংবা যেকোনো সম্পর্কে অনৈক্য, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা ও পারিপার্শ্বিক অসহযোগিতা ইত্যাদি।
ইসলামের বিধান : ইসলামে হতাশাবাদের কোনো স্থান নেই। জীবনের প্রতি নিরাশ হওয়া এবং নিজের প্রাণকে সংহার করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এরপরও কিছু মুসলিম নিরাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নিচ্ছে। ইসলাম কখনো আত্মহত্যার মতো কোনো অপরাধকে সমর্থন করে না। এমন কাজ থেকে বিরত থাকার গুরুত্ব প্রদান করে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াতে ঘোষণা করেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি ক্ষমাশীল।’ সুরা নিসা : ২৯
পাশাপাশি কোনো কাজে ব্যর্থ হাওয়া মাত্রই আল্লাহর ওপর ভরসা না করে অনেকেই হতাশায় ভুগে আত্মহত্যা করেন। অথচ মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন বিপদন্ডআপদের সম্মুখীন হলে কর্তব্য কী হবে, সে সম্পর্কে বিশদ ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ সুরা বাকারা : ১৫৩
সবার স্মরণে থাকা উচিত, আত্মহত্যার মারাত্মক অপরাধ প্রবণতা থেকে বাঁচতে জীবন পথে চলতে গিয়ে বহু বিপদের সম্মুখীন হতে হবে এবং অর্জিত হবে নানান অভিজ্ঞতা। শত বিপদের মধ্যেও সর্বদা হাসিমুখে থাকার চেষ্টা করতে হবে। নিজের মধ্যে পরিবর্তনের চেষ্টা ও জীবনকে নতুন করে সাজানোর প্রচেষ্টা করতে হবে। এই জীবনযুদ্ধে যিনি প্রতিটি মুহূর্ত ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করবেন, দিন শেষে তিনিই সফলতার মুখ দেখতে পাবেন। বাংলা ভাষার সেই প্রবাদ বাক্যই তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে- ‘সবুরে মেওয়া ফলে’। আর এ সবর বা ধৈর্যশীলতাই মহান আল্লাহর কাছে একান্ত পছন্দনীয়। তিনি ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন।’
ভয়াবহ পরিণতি : আত্মহত্যার পরিণতি মারাত্মক। হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একাধিক বর্ণনা পেশ করেছেন। আত্মহত্যাকারীর শাস্তি জাহান্নামে কীভাবে দেওয়া হবে ও এর পরিণাম সম্পর্কে যদি কেউ যথাযথভাবে অবহিত থাকে, তবে আল্লাহর কাছে আত্মহত্যা থেকে অবশ্যই সে পানাহ চাইবে এবং এমন কাজের প্রতি নিজের অন্তরে ঘৃণা জন্মাবে। আত্মহত্যার শাস্তির ধরন সম্পর্কে হাদিসের একাধিক বর্ণনা রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে (অনুরূপভাবে) নিজেকে ফাঁস লাগাতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি বর্শার আঘাতে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে (অনুরূপভাবে) বর্শা বিদ্ধ হতে থাকবে।’ সহিহ্ বোখারি
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে আত্মহত্যাকারীর জানাজা পড়েননি। হাদিসে এসেছে, হজরত জাবের ইবনে সামুরাহ (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এক ব্যক্তির লাশ উপস্থিত করা হলো। সে চ্যাপ্টা তীরের আঘাতে আত্মহত্যা করেছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার জানাজা আদায় করেননি।’ সহিহ্ মুসলিম
কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এটি প্রমাণিত যে, আত্মহত্যা মারাত্মক অপরাধ ও হারাম কাজ। এর পরিণতিও খুবই ভয়াবহ। আত্মহত্যাকারীকে জাহান্নামের আগুনে কঠোরশাস্তি ভোগ করতে হবে। এটা সর্বদা মাথায় রাখতে হবে। জীবন চলার পথে হতাশা কিংবা যেকোনো কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হয়ে নিমেষেই আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া যাবে না। বরং এক আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতার মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে ধৈর্য ও নিজের মেধা খাঁটিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এটাই হলো বুদ্ধিমানের কাজ। কেননা আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়, বরং আবেগতাড়িত হয়ে নিজের ভুলে নিজের জীবনকে চিরতরে নিঃশেষ করে দেওয়া মারাত্মক ভুল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ।