যুবকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ছয় বছর পর সভা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশনা দেওয়ার ছয় বছর পর ‘যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক)’ ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে একটি বৈঠক আহ্বান করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ১৬ বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া যুবকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতে আগামীকাল (১৩ সেপ্টেম্বর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের (বাণিজ্য সংগঠন) সম্মেলন কক্ষে বৈঠক করতে যাচ্ছে সরকার। কীভাবে যুবকের বেদখল সম্পত্তি উদ্ধার, বিক্রি, ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের টাকা ফেরত প্রক্রিয়াসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে বৈঠকে। এতে সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে বাণিজ্য সংগঠন (ডিটিও) অনু বিভাগের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. হাফিজুর রহমানের।

যুবকের বেদখল সম্পত্তি উদ্ধার ও গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ২০১৬ সালে অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু যুবকে প্রতারিত আমানতকারীদের আমানত ফেরতে কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। বরং যুবকের মূলবান সম্পদ একটি স্বার্থান্বেষী মহল লুটপাট করে খাচ্ছে। গত বছর সেপ্টেম্বরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, যুবকের সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের দায় মেটানো সম্ভব। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের দীর্ঘসময় পর সক্রিয় হয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনু বিভাগ। ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করতে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ‘যুব কর্মসংস্থান সোসাইটির (যুবক)’ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বৈঠক করতে যাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সূত্র জানায়, প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে যুবক। গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার উপায় খুঁজতে পার হয়েছে ১৬টি বছর। দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত কোনোটিই কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি ই-কমার্স প্রতারণা নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত এক বৈঠকে বলেছিলেন, যুবকের সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের অর্ধেক দায় মেটানো সম্ভব। বিষয়টি তিনি আইনমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানিয়েছিলেন। তারপর আর অগ্রগতি হয়নি।

১৯৯৪ সালে ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম শুরু করে যুবক। পরে যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের কার্যালয় থেকে নিবন্ধন নিয়ে মাল্টি লেভেল মার্কেটিংয়ের (এমএলএম) নামে প্রায় ২০ ধরনের ব্যবসা শুরু করে। ২০০৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের আলাদা তদন্তে গ্রাহকদের সঙ্গে যুবকের প্রতারণা উঠে আসে। পরে ২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘যুবকে ক্ষতিগ্রস্ত জনকল্যাণ সোসাইটি’ পরিচালিত অনুসন্ধানে বলা হয়, সারা দেশে যুবকের সম্পত্তি রয়েছে ২ হাজার ২৬৮ একর, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকা।

অনেক উদ্যোগের পরও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না যুবকের গ্রাহক : ২০১৬ সালের জুনে যুবকের ব্যাপারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা চাওয়া হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রীকে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশনা দেন। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনও বাস্তবায়ন হয়নি। যুবক নিয়ে গত বছর ২২ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির বক্তব্যের আগে ২০২০ সালে যুবকের বেদখল সম্পত্তি সরকারি হেফাজতে নিয়ে বিক্রি করে গ্রাহকের পাওনা বুঝিয়ে দিতে একজন প্রশাসক নিয়োগের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে গেলে আর আলোর মুখ দেখেনি।

২০১১ সালের ৪ মে তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব রফিকুল ইসলামকে চেয়ারম্যান করে যুবকের সমস্যা সমাধানের জন্য কমিশন গঠন করে সরকার। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রাহককে অর্থ ফেরত দিতে এবং সব স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য যুবকে একজন প্রশাসক নিয়োগের সুপারিশ করেছিল কমিশন। পরে ২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত ‘আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি’ যুবকের ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের জন্য ‘প্রশাসক’ নিয়োগের সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করেছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে প্রশাসক নিয়োগ হয়নি।

যুবকের গ্রাহকদের টাকা ফেরতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে চেয়ারম্যান করে প্রথম কমিশন গঠন করা হয় ২০১০ সালের ২৬ জানুয়ারি। কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুবকের মোট গ্রাহক ২ লাখ ৬৭ হাজার ৩০০ জন। গ্রাহকদের পাওনা পরিমাণ ২ হাজার ১৪৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। তবে যুবকের সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের দায়দেনা পরিশোধ সম্ভব। এ জন্য একজন প্রশাসক নিয়োগ করতে হবে। কিন্তু কমিশনের সুপারিশ এক যুগেও বাস্তবায়িত হয়নি।