খাদ্য নিরাপত্তা ও মুদ্রাস্ফীতি

সাম্প্রতিক কালে বিশ্ব উপর্যুপরি সংকট মোকাবিলায় খাবি খাচ্ছে। প্রথমে চলল কভিড-১৯ অতিমারী। সেটা শেষ হতে না হতেই শুরু হলো মুদ্রাস্ফীতির অশ্বমেধযজ্ঞ। মার্কিন মুলুকে এটা এখন ৮.৫ শতাংশ এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে ৯.০১ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে। সব দেশে এখন চলছে এর আগ্রাসন। সম্প্রতি খাদ্য ও কৃষি সংস্থা থেকে প্রকাশিত চলতি বছরের আগস্ট মাসের খাদ্যশস্যের মূল্য সূচক ২ পয়েন্ট কমলেও বৈশ্বিক বাজারে গমের মূল্য এক বছর আগের মূল্যের চেয়ে ১০.৬ শতাংশ বেশি রয়েছে। বিশ্বব্যাংক তাদের চলতি বছরের এপ্রিল মাসের পণ্য বাজার আউটলুকে মন্তব্য করেছে যে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক বাণিজ্য, উৎপাদন ও ভোগের ধারা এমনভাবে পরিবর্তন করে ফেলেছে যে, তাতে  দ্রব্যমূল্যের উচ্চ স্তর অন্তত ২০২৪ সালের শেষ অবধি বজায় থাকবে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, বর্তমান সংকটের কারণে বিশ্বের অন্তত ২৩ দেশ ৩৩ জাতীয় খাদ্যপণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে; অন্তত ৭টি দেশ ১১ ধরনের পণ্যের রপ্তানি সীমিতকরণ করে ফেলেছে। বিশ্বে ২০২১ সালে ৮২৮ মিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো ভাবে ক্ষুধায় আক্রান্ত হয়েছে। এ সময় খাদ্য-অনিরাপদ মানুষের সংখ্যা ৪৬ মিলিয়ন বৃদ্ধি পেয়েছে। টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের সর্বশেষ সময়সীমা ২০৩০ সাল; হাতে সময় আছে মাত্র ৮ বছর। এই সময়সীমার মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট-২, অর্থাৎ শূন্য ক্ষুধার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রয়োজন আক্রমণাত্মক কর্মসূচি। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সে ধরনের কোনো কিছু তো হচ্ছেই না, বরং ঘটনা ঘটছে সম্পূর্ণ বিপরীত;  লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতিতে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় নতুন করে ভুখানাঙ্গাদের তালিকা স্ফীত হচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে শূন্য ক্ষুধার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সর্ব শেষ সময় ২০৩০ সালেও বিশ্বে ৬৭০ মিলিয়ন মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টির বোঝা বহন করে বেড়াবে। এই প্রেক্ষাপটে আমাদের অবস্থা কী?

কয়েক দিন আগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিলম্বিত জনশুমারি ও খানা গণনা শেষ হলো। সমস্যা হলো দীর্ঘদিন ধরে খানা আয়-ব্যয় জরিপ (Household Income and Expenditure Survey, HIES) না হওয়ায় দেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষের সরকারি হিসাব পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বেসরকারি থিংকট্যাংক সিপিডি, পিপিআরসি, সানেমের মতে দরিদ্র মানুষের হার এখন ৪২ শতাংশ; আর হতদরিদ্রের হার বেড়ে হয়ে গেছে ২৮.৫ শতাংশ; অর্থাৎ সংখ্যার হিসাবে ৫ কোটি। The State of Food Security and Nutrition in the World report (SOFI) ২০২২ থেকে দেখলাম যে, ২০১৯-২১ সালে দেশে অপুষ্টির শিকার মানুষের সংখ্যা ছিল ১৮.৮ মিলিয়ন। আর এ সময় চরম ভাবে খাদ্য-অনিরাপদ মানুষের সংখ্যা ছিল ১৭.৫ মিলিয়ন। দেশে মাঝারি পর্যায়ের খাদ্য-অনিরাপদ মানুষের সংখ্যা ২০১৪-১৬ সালে ছিল ৫০.৪ মিলিয়ন, কিন্তু ২০১৯-২০ সময়ে তাদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২.৩ মিলিয়নে। ২০২০ সালে নিজেদের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার সংগ্রহে অসমর্থ মানুষের সংখ্যা ছিল ১২১.১ মিলিয়ন। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতে এই সব মানুষের জীবনমান কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

দেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ীই  মে/২০২২ মাসে মুদ্রাস্ফীতি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, জুন মাসে তা উঠে যায় ৭.৫৬ শতাংশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় যথাক্রমে ৮.৩০ ও ৮.৩৮ শতাংশ। দুঃখের বিষয় হলো শহরের চেয়ে গ্রামে মুদ্রাস্ফীতির হার এখন বেশি; জুনে শহরে মুদ্রাস্ফীতি ছিল ৬.৬২ শতাংশ, আর গ্রামাঞ্চলে ৮.০৯ শতাংশ। জুলাই/২০২২ মাসে অবশ্য কিছুটা নিচে নেমে এটার শতাংশ দাঁড়ায় ৭.৪৮। সামনের অবস্থাও যে সহসা ভালো হবে, তারও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

কয়েকদিন আগে একটা কাজে উত্তরবঙ্গে গিয়েছিলাম। বৃষ্টি নেই, আমনের চারা রোপণে ইতিমধ্যে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১৫/২০ দিন বিলম্ব হয়ে গেছে। এখন আবার অনেক স্থানে মাঠ ফেটে চৌচির। আমন ধান বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় সাধারণত চাষাবাদে খরচ কম হয়। কিন্তু অনাবৃষ্টির কারণে চাষিদের এবার ক্ষেতে সেচের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। খরচ বাবদ পানির কলওয়ালাকে দিতে হবে এক-পঞ্চমাংশ ফসল। ইউরিয়ার দাম বাড়ানো হয়েছে কেজিপ্রতি ৬ টাকা। তারপর বাড়ানো হয় ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৩৪ টাকা। পরে অবশ্য লিটারে জ্বালানির দাম ৫ টাকা করে কমানো হয়েছে, কিন্তু তাতে চাষির উৎপাদন খরচে ইতর বিশেষ হবে না। তার ওপর সারের লভ্যতা ও মহার্ঘ্য নিয়ে যে ধূম্রজাল চলছে, তাতে খরচ ন্যায্যতার মাত্রা অতিক্রম করে যাবে। ফলে অনেক চাষির বিনিয়োগে সক্ষমতা উবে যাবে। অনেকে ধান চাষে উৎসাহ হারাবে। সব মিলে আমনের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইউএসডিএ-এর হিসাব মতে বিগত বোরো মৌসুমে ২.০৯ কোটি টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে অর্জন হয়েছে ১.৯৭ কোটি টন। আমনের ঘাটতি যুক্ত হলে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি উদ্বায়ী হয়ে উঠতে পারে। আউশ ধান কাটার ভরা মৌসুমেও চালের দাম প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মিলারদের কাছ থেকে শুনলাম ধানের ঘাটতির কথা। আগে স্বর্ণা ধানের মণ ছিল ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়ে গেছে ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকা।

খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির তাৎপর্য আমাদের মতো উন্নয়নশীল ও আয় বৈষম্যের দেশে খুবই মারাত্মক। স্বল্প আয়ের মানুষ তাদের আয়ের সিংহভাগ অর্থ ব্যয় করে খাদ্য সংগ্রহের পেছনে। মুদ্রাস্ফীতি তাদের খাদ্যের প্রাপ্যতা কমিয়ে ফেলে। পরিণতিতে তারা অনাহার-অপুষ্টির দুষ্টচক্রে প্রত্যাবর্তন করে। স্বল্প মেয়াদে মুদ্রাস্ফীতি কমাতে আমদানি একটি হাতিয়ার। পত্রিকায় দেখলাম সরকার ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে  চাল আমদানি করতে যাচ্ছে। তাছাড়া রাশিয়া থেকে ৫ লাখ টন গম ক্রয়ের প্রক্রিয়া চলছে। সরকারি খাতে আরও চাল আমদানির খবর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা। এটা অবশ্যই একটা সুখবর। তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভারত কখনো নির্ভরযোগ্য আমদানির উৎস নয়; এখন শুল্ক আরোপ করছে, কয়েক দিন পর রপ্তানি বন্ধও করে দিতে পারে। সে জন্য উৎসের বৈচিত্র্যকরণ অপরিহার্য। আর শহরায়ন ও শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশে গমের চাহিদা ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে; বর্তমানে গড়ে বার্ষিক চাহিদা ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টন। অথচ দেশে উৎপন্ন হয় মাত্র ১০/১২ লাখ টন; প্রতি বছর গড়ে ৫৫ থেকে ৬০ লাখ টন গম আমদানি করতে হয়। এই গমের সিংহভাগই আমদানি করে বেসরকারি খাত। কাজেই সরকারি পর্যায়ে ৫/১০ লাখ টন গম আমদানি করে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না; বেসরকারি খাত যাতে নির্বিঘ্নে আমদানি প্রবাহ অব্যাহত রাখতে পারে, তার ব্যবস্থা নিতে হবে।

চাল উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতার দ্বারপ্রান্তে। দেশে ফলনের যে সম্ভাবনা রয়েছে, সেটা পুরোপুরি কাজে লাগানো গেলে দেশ চাল রপ্তানিকারকের মর্যাদাও লাভ করতে পারে। আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করা যেমন ব্যয়সাধ্য, তেমনি কষ্টসাধ্যও বটে। সে কারণে দীর্ঘ মেয়াদে চাল উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত বিনিয়োগের ব্যবস্থা নিতে হবে। সার, সেচসহ সব কৃষি উপকরণ সুলভ ও সহজলভ্য করতে হবে। অনাবৃষ্টিতে এখন ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের যে পুনর্ভরণ সমস্যা হচ্ছে, তা বোরো মৌসুমে সেচের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এর প্রতিকারের ব্যবস্থা এখন থেকে চিন্তা করতে হবে।        

সর্বশেষ ঝঙঋও রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, সস্তায় পুষ্টিকর খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা না গেলে ২০৩০ সালে শূন্য ক্ষুধার লক্ষ্যমাত্রা অধরাই থেকে যাবে। আর এটা করার জন্য প্রয়োজন কৃষির রূপান্তর; কৃষি খাতে প্রদত্ত ভর্তুকি ও সহায়তার আমূল সংস্কার। কৃষি সহায়তা কার্যক্রম এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে স্বল্প খরচে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্যের উৎপাদন সম্ভব হয়, গ্রিন হাউস গ্যাস কম উৎপাদিত হয়, আয় বৈষম্যের লাগাম টেনে ধরা যায় এবং মানুষের খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়। এর জন্য প্রয়োজন নির্ভেজাল তথ্য-উপাত্ত, উপযুক্ত গবেষণা, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং সর্বোপরি পর্যাপ্ত সময়। উন্নয়নশীল দেশে খাদ্যের মতো স্পর্শকাতর পণ্য উৎপাদনে অসময়োচিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফল কী দাঁড়ায় শ্রীলঙ্কার জৈব সার নিরীক্ষা তার একটা বড় দৃষ্টান্ত।

এই মুহূর্তে প্রয়োজন মুদ্রাস্ফীতি, বিশেষ করে খাদ্যশস্যের মূল্যস্তর সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। সরকার অবশ্য টিসিবি এবং ওএমএসের মাধ্যমে শহরাঞ্চলে এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে চাল, ডালসহ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ভর্তুকি মূল্যে বিতরণ করছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় এটা অপ্রতুল। এজন্য দরকার ঘাটতি পণ্য আমদানির ব্যবস্থা করা। সেই সঙ্গে প্রয়োজন বেসরকারি খাতে আমদানি ও মজুদ খাদ্যশস্যের নির্দোষ এবং স্মার্ট পরিবীক্ষণ। ডিজিটাল পদ্ধতিতে এটা পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে কোনো মানবীয় স্পর্শ না থাকে। তাতে আমলাতন্ত্রের লাল ফিতার বাঁধনে কেউ অযথা আটকা পড়বে না। ইদানীং চাল ও গমের বাজারে অলিগার্ক প্রকৃতির করপোরেট হাউজগুলোর দৌরাত্ম্য বাড়ায় এই জাতীয় স্মার্ট পদক্ষেপের বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। 

তথ্যের সঠিকতার ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি সব ধরনের কার্যক্রম ও পরিকল্পনায় এটা অত্যন্ত জরুরি। দেশে উৎপাদন, আমদানি ও প্রয়োজনীয়তার পরিমাণ, ভোগের পরিমাণ, বিকল্প ব্যবহার, বেসরকারি খাতে মজুদ, আপৎকালে মজুদ প্রবণতা প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে গবেষণার মাধ্যমে যতটা সম্ভব বস্তুনিষ্ঠ উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে এবং নিয়মিত ব্যবধানে সেগুলো হালনাগাদ করতে হবে। চলতি আবাদের অবস্থা বিবেচনা করে অন্তত ২ মাস অন্তর অন্তর উৎপাদন প্রক্ষেপণ করার ব্যবস্থা নেওয়া হলে তার ভিত্তিতে আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করা সহজ হতে পারে। মানুষকে মুদ্রাস্ফীতির দানবীয় থাবা থেকে রক্ষা করাই হবে এখন এক নম্বর কাজ।

লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক

rulhanpasha@gmail.com