দেশেই আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা দিতে যাত্রা শুরু হলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের। এটাই দেশের প্রথম সেন্টারভিত্তিক হাসপাতাল। এখানে চিকিৎসা শুরু হলে আর দেশের মানুষকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হবে না।
গতকাল বুধবার সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি এ হাসপাতালের উদ্বোধন করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসকদের শহরকেন্দ্রিক না থেকে উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি অনলাইনে চিকিৎসাসেবাও জোরদার করার পরামর্শ দেন। তিনি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, সেবার মান যাতে বাড়ে সে জন্যও ব্যবস্থা নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দক্ষিণ কোরিয়া ও বাংলাদেশ সরকার এবং বিএসএমএমইউর যৌথ অর্থায়নে নির্মিত এটাই দেশের প্রথম ও একমাত্র সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। এখানে শয্যাসংখ্যা ৭৫০টি। দুটি বেজমেন্টসহ হাসপাতালটি ১৩ তলা ভবনের। বর্তমানে সিঙ্গাপুর, কোরিয়াসহ বিশ্বের অধিকাংশ উন্নত দেশে সেন্টার বেইজড চিকিৎসাসেবা পদ্ধতি চালু থাকলেও দেশে এ ধরনের হাসপাতাল এই প্রথম নির্মিত হলো।
এ হাসপাতালে আন্তর্জাতিক মানের মডিউলার অপারেশন থিয়েটার রয়েছে ১৪টি। রয়েছে বিভিন্ন বিভাগ, ডিসিপ্লিন নিয়ে কমপক্ষে বিশ্বমানের পাঁচটি সেন্টার। এগুলো হলো স্পেশালাইজড অটিজম সেন্টারসহ মেটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ কেয়ার সেন্টার, ইমার্জেন্সি মেডিকেল কেয়ার সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি ও গ্যাস্ট্রোঅ্যান্টারোলজি সেন্টার, কার্ডিও ও সেরিব্রো ভাসকুলার সেন্টার এবং কিডনি সেন্টার। দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকবে রেসপিরেটরি মেডিসিন সেন্টার, জেনারেল সার্জারি সেন্টার, অপথালমোলজি, ডেন্টিস্ট্রি, ডার্মাটোলজি সেন্টার এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন বা রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। থাকছে ১০০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ-ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) ও ৬৪টি কেবিন। এর মধ্যে ৬টি ভিভিআইপি কেবিন, ২৩টি ভিআইপি কেবিন। বাকিগুলো ডিলাক্স কেবিন। এ ছাড়া অত্যাধুনিক সিটিস্ক্যান, এমআরআই থেকে শুরু করে সব পরীক্ষা হবে ডিজিটালাইজড এ হাসপাতালে। জরুরি বিভাগে থাকবে ১০০ শয্যা। সেন্টারভিত্তিক প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকছে আটটি করে শয্যা। গুণগতমান বজায় রাখতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনা হয়েছে আসবাবপত্র ও সরঞ্জাম।
বিশেষ করে দেশে এই প্রথমবারের মতো এ হাসপাতালে শুরু হতে যাচ্ছে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন, রোবোটিক অপারেশন ও জিন থেরাপি। রয়েছে মৌলিক গবেষণার জন্য আলাদা সেন্টার। এ হাসপাতালকে অনুসরণীয় বিশ্বমানের মডেল হাসপাতাল হিসেবে গড়ে তুলতে রাখা হচ্ছে উন্নতমানের আধুনিক ব্যবস্থাপনার বহির্বিভাগ এবং ইনফো ডেস্ক ও ডিজিটাল ইনফরমেশন সেন্টার।
স্পেশালাইজড হাসপাতালে সেবা নিতে এসে গ্রাহককে অন্য কোনো জায়গায় যেতে হবে না বলেও জানান হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। তাদের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের ভেতরেই থাকবে একটি কনভেনিয়েন্স শপ, ব্যাংকিং সুবিধা, ফার্মেসি, ক্যাফেটারিয়া, উন্নত লন্ড্রি হাউজসহ কার পার্কিংয়ের বিশাল সুবিধা।
বিএসএমএমইউর উত্তর পাশে ৩ দশমিক ৪ একর জায়গায় ১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে এ হাসপাতাল। নির্মাণ ব্যয়ের মধ্যে ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকা ঋণ হিসেবে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশ সুদ এবং যে ঋণ পরিশোধের গ্রেস পিরিয়ড থাকবে ১৫ বছর। পরবর্তী ৪০ বছরে এ ঋণ পরিশোধ করতে হবে। বাকি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার ও বিএসএমএমইউ কর্র্তৃপক্ষ।
মাঠপর্যায়েও চিকিৎসা দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর : হাসপাতালের উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, মাঠপর্যায়ে এখনো চিকিৎসক-নার্সের অভাব দেখা যায়। অনেকেই মাঠপর্যায়ে যেতে চান না। সবাইকে রাজধানীতেই থাকবে হবে এমন নয়। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি চিকিৎসকদের দেখার অনুরোধ করছি। যেন উপজেলা পর্যন্ত মানুষ চিকিৎসা সেবা পায়।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের সেবা করুন, মানুষের পাশে দাঁড়ান। কারণ, আমার তো মনে হয় ওষুধের থেকেও একজন ডাক্তারের মুখের কথায় আশ্বস্ত হলে তার অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যায়। কাজেই এ আশ্বস্ত যেন রোগীরা পায় সেই ব্যাপারে প্রত্যেক ডাক্তারকে আন্তরিকতার সঙ্গে রোগীদের দেখাতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালে খুব অল্প খরচে চিকিৎসা নিতে আসেন। তারা যেন উন্নত চিকিৎসা পায়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের সুফল পাচ্ছে দেশের মানুষ। বেসরকারি খাতে হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বেসরকারি খাতেও স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্বের অনেক প্রতিষ্ঠিত অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের বাংলাদেশে আসার সুযোগ করে দিতে হবে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের ডাক্তারদের উদার হতে হবে। দরজা বন্ধ করে রাখলে আলো-বাতাস বাসায় ঢোকে না। এ বিষয়ে বিশেষভাবে ভাববেন।
শেখ হাসিনা বলেন, দেশে অনেক প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক রয়েছেন। তাদেরও সামনে আসার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। তারা যেন তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারেন। তাদের সঙ্গে কাজ করলে অভিজ্ঞতা বাড়ার সুযোগ হবে। এ বিষয়ে আরও বেশি উদার হতে হবে।
সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল দেশের চিকিৎসাসেবায় নবদিগন্ত উন্মোচন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ হাসপাতাল চালু হলে বাংলাদেশের বার্ষিক আনুমানিক ৩৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
বিএসএমএমইউর চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার নামে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, চিকিৎসাসেবা ও গবেষণা কার্যক্রমের গুণগত মান উন্নয়নের জন্য আপনারা যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, সে জন্য আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। স্বাস্থ্যশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব উদ্যোগে প্রফেসর ইমেরিটাস নিয়োগ দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আরও বেগবান করার জন্য ইউজিসি প্রফেসর নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের শুধু চিকিৎসা দিলেই চলবে না, গবেষণা করাও জরুরি। কাজেই এ বিষয়ে প্রতি বিশেষভাবে নজর দেন।
অন্যান্যদের বক্তব্য : উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, দেশের ওষুধের চাহিদা শতভাগ দেশেই উৎপাদন হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি মানুষে উচ্চতর চিকিৎসা প্রদানের জন্য নির্মিত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের মুদ্রার সাশ্রয় হবে। করোনাভাইরাস রোধে সরকারের সফলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩০ কোটি ভ্যাকসিন পেয়েছে। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ মানুষ ভ্যাকসিনের আওতায় এসেছে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিএসএমএমইউ উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় একটি নতুন যুগের সূচনা হবে। হাসপাতালটি চালু হলে দেশেই রোগীরা বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পাবেন। এ হাসপাতালে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, লিভার, গল ব্লাডার ও প্যানক্রিয়েটিক, অরগান ট্রান্সপ্ল্যান্ট, ক্যানসার, নিউরোসার্জারিসহ বিভিন্ন জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা বাংলাদেশে চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব সাইফুল হাসান বাদল এবং বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি জেং কিউন বক্তব্য রাখেন।