জ্বালানি তেল আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের জন্য সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেডকে (আইওসিএল) জিটুজি ভিত্তিতে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আর এর ফলে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে ও সাশ্রয়ী মূল্যে ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও এভিয়েশন ফুয়েল আমদানি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে বাংলাদেশ। ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানি করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু যে পাইপলাইন দিয়ে এই ডিজেল আনা হবে তার নির্মাণকাজ চলছে ধীরগতিতে।
গত বুধবার বিকেলে ভারত সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের শিলিগুড়ি থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আসবে। এতে করে তেল পরিবহনের খরচ অনেকটা কমে যাবে। এ প্রকল্পের আওতায় ১৩১ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ অংশে রয়েছে ১২৬ এবং ভারত অংশে ৫ কিলোমিটার পাইপলাইন ভারত সরকারের অর্থায়নে নির্মাণকাজ চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দিনাজপুরের পার্বতীপুর শহরের অদূরে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্পের কাজে ধীরগতি বিরাজ করছে। এরইমধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ২০২২ সালের ৩০ জুন শেষ হয়েছে। কিন্তু কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫০ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্পটি সংশোধন করে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কাজ আটটি অয়েল ট্যাংক (তেল মজুদের আধার) স্থাপন। অয়েল ট্যাংকের আরসিসি ভিত্তির কাজ শেষ হলেও এর প্রধান উপকরণ ১ হাজার ৩শ’ টন স্টিলের পাত এখনো বিদেশ থেকে আমদানি করা সম্ভব হয়নি। ফলে ট্যাংকগুলো নির্মাণের কাজও বন্ধ রয়েছে। এছাড়া এখনো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি সংশ্লিষ্ট আরও অনেক অবকাঠামোর। যার মধ্যে রয়েছে পাম্প হাউজ, নিয়ন্ত্রণ কক্ষ, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন ও ২৪টি ট্রান্সফরমার, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ, সিকিউরিটি পোস্ট, সিকিউরিট গেট, ফায়ার অ্যালার্ম সিস্টেম, ওয়াচ টাওয়ার, ৫ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার ৬টি ফুয়েল ট্যাংক, অগ্নিনির্বাপণ কাজের জন্য ৩ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার দুটি ওয়াটার ট্যাংক, অগ্নিনির্বাপক ফোম রাখার জন্য ২ হাজার ৫শ লিটার ধারণক্ষমতার দুটি ব্লাডার ট্যাংক ও অটোমোশন সিস্টেম।
পার্বতীপুর শহরের অদূরে ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন প্রকল্পের আওতায় ৬ দশমিক ৮০ একর জমিতে রিসিপ্ট টার্মিনাল (আরটি) ও অয়েল ডিপো নির্মাণ করা হচ্ছে। রিসিপ্ট টার্মিনালের নির্মাণকাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স দীপন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড এবং অয়েল ডিপোর নির্মাণকাজের দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পাইপ লাইনার্স লিমিটেড।
অয়েল ডিপোর নির্মাণকাজে ধীরগতির কারণ জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পাইপ লাইনার্স লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক (পিএম) মো. তোজাম্মেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অয়েল ট্যাংক নির্মাণের স্টিল পাত দক্ষিণ কোরিয়া অথবা ভারত থেকে আমদানি করতে হবে। এলসি খোলায় বিলম্ব হওয়ায় সময়মতো স্টিল পাতের সরবরাহ না পাওয়ায় ট্যাংক নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া প্রকল্পের সীমানা প্রাচীর ও দালানকোঠা ছাড়া আর সবকিছুই আমদানিনির্ভর হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি।’
এদিকে করোনা পরিস্থিতিসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেছেন ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) টিপু সুলতান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্প প্রস্তাব (পিপি) অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্ধারিত সময়কাল ২০২০ থেকে ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত। কিন্তু করোনাসহ কিছু বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। তাই প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন স্থাপন প্রকল্পের জন্য পঞ্চগড়, নীলফামারী ও দিনাজপুর জেলায় ১৯৯ দশমিক ৩৪ একর জমি অধিগ্রহণ এবং ১৩৪ দশমিক ১২ একর জমি হুকুম দখল করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ভারত ও বাংলাদেশ অংশে মোট ১৩০ কিলোমিটার পাইপলাইনের কাজ শেষ হয়েছে। পাঁচটি এসভি স্টেশনের (সেকশনলাইজিং ভালভ স্টেশন) কাজও শেষ হয়েছে। প্রতিটি এসভি স্টেশনের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় সীমানা প্রাচীর নির্মাণের কাজও প্রায় শেষের পথে।
প্রকল্প প্রস্তাবের নথি থেকে জানা যায়, পূর্ব ভারতের নুমালীগড় থেকে শিলিগুড়ি রেল টার্মিনাল পর্যন্ত ৬০ কিলোমিটার পাইপলাইন থাকছে। শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ভারত সরকার দিচ্ছে ৩০৩ কোটি ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন দিচ্ছে ২১৭ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, ২০১৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই পাইপলাইন নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০২০ সালের মার্চে পাইপলাইন স্থাপন কাজ শুরু হয়। ভারতের লুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড এবং বাংলাদেশের মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। পাইপলাইনটি চালুর পর বছরে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন ডিজেল ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ আড়াই লাখ টনের মতো ডিজেল আমদানি করবে। পরের বছরগুলোতে তা ৪ থেকে ৫ লাখ টন পর্যন্ত বাড়বে। চুক্তির অধীনে সরবরাহ শুরু হওয়ার দিন থেকে ১৫ বছরের জন্য ভারত থেকে ডিজেল কিনবে বাংলাদেশ।