দেশের নানা শিল্প খাতে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যহানিকর কর্মপরিবেশে নিয়োজিত রয়েছে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক। কিন্তু কলকারখানার কর্মপরিবেশের উন্নয়ন যে সরকার এবং শিল্পমালিকদের মনোযোগে নেই সেটা বারবার সামনে আসে ভয়াবহ সব দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা শিল্প খাতে একের পর এক দুর্ঘটনায় বিপুল সংখ্যক হতাহতের ঘটনায় দেশে-বিদেশে তুমুল সমালোচনা চলতে থাকলেও এ বিষয়ে অগ্রগতি সামান্যই। পেছন ফিরে তাকালে দেখা যাবে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে সরকার কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন পরিদপ্তরকে অধিদপ্তরে উন্নীত করেছিল। বিধিমালাও দ্রুততার সঙ্গে সংশোধন করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এখনো কলকারখানার কর্মপরিবেশ যেমন নিরাপদ হয়নি তেমনি পরিদর্শনের নামে ঘুষ খেয়ে দুর্নীতি করে কলকারখানার অবৈধ নির্মাণও বন্ধ হয়নি। অন্যদিকে, শিল্প খাতের কর্মপরিবেশে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, শ্রমিকদের ওপর কর্মপরিবেশের স্বাস্থ্যগত প্রভাব এবং কর্মপরিবেশের সঙ্গে উৎপাদনশীলতার সম্পর্ক নিয়ে বিশদ কোনো গবেষণা যেমন নেই তেমনই ব্যাপক ও বিস্তৃত পরিসরের এসব বিষয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের কোনো ব্যবস্থাও নেই দেশে।
শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘দুর্ঘটনা কমেছে ভয়াবহতা কমেনি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উঠে আসে সরকারের পরিসংখ্যান অনুসারে গত চার বছরে শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনা কমেছে। আহত ও নিহতের সংখ্যা একেক সময় একেক রকম কখনো বাড়ে আবার কখনো কমে। ২০১৮-১৯ সালে দুর্ঘটনা ঘটেছে ৮৮টি। পরের বছর ৫৯টি। এর পরের বছর ৫৪টি। গত বছর এই সংখ্যা কমে হয়েছে ৪৫টি। ২০২১ সালে বেসরকারি সংস্থা সেইফটি অ্যান্ড রাইটস জানায়, গত ১০ বছরে পোশাক খাতের বাইরে শিল্প-কারখানায় ৪৫৩টি অগ্নিকাণ্ড এবং দুর্ঘটনায় অন্তত ৬৯৭ শ্রমিক মারা গেছেন। শিল্প-কারখানায় দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানে সংখ্যা কমার প্রমাণ মিললেও কর্মপরিবেশের উন্নয়ন কতটা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। একইভাবে দুর্ঘটনার ভয়াবহতার কথাও পরিসংখ্যানে উঠে আসে না। কলকারখানায় দুর্ঘটনার ভয়াবহতার গভীর ছাপ পাওয়া যায় আহত-পঙ্গু হয়ে বেঁচে থাকা শ্রমিকের জীবনে, শ্রমিক পরিবারগুলোর মানবেতর জীবনযাপনে। কখনো কখনো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা কারখানা-মালিকের দেউলিয়া হয়ে পড়ার উপাখ্যানে। প্রতিবেদনটিতে একইসঙ্গে দেশের শিল্প খাতের ঝুঁকিপূর্ণ ও স্বাস্থ্যহানিকর কর্মপরিবেশের উন্নয়ন না হওয়ার উদ্বেগেও উঠে এসেছে। শিল্প খাতের সামগ্রিক বাস্তবতা বিচার করলে দেখা যায়, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাক-কারখানার পরিবেশ ও ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ হলেও অন্যান্য শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা নিয়ে খুব একটা কাজ হয়নি। কিন্তু কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের আওতা শুধু গার্মেন্ট-কারখানায় নয়। প্রায় দুই লাখ ছোট-বড় প্রতিষ্ঠান আছে, সেসব অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণের আওতায় নেই। লেদ মেশিন, রি-রোলিং মেশিন, কেমিক্যাল কারখানা, কেমিক্যাল গোডাউন, শিপব্রেকিং শিল্প এসবে দুর্ঘটনার পরিমাণ ও ভয়াবহতা দুটোই বাড়ছে। শিল্প ও শ্রম সেক্টরের সরকারি নীতিনির্ধারক কর্মকর্তারা মনে করেন, পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি মাল্টি সেক্টরাল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় শ্রমিক-পরিবারে দুর্ভোগ নেমে আসে। অন্যদিকে দুর্ঘটনার কারণে শ্রমিক কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকে ও প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ে। নতুন শ্রমিক-নিয়োগের ফলে প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতা কমে। কাজেই নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা সব পক্ষের জন্যই কল্যাণকর। অধিকাংশ পেশাগত দুর্ঘটনা ও মৃত্যু এড়ানো সম্ভব, যদি নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকরা পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি ঝুঁকি সম্পর্কে সজাগ থাকে।
এমন প্রেক্ষাপটে সরকার এখন একটি প্রকল্পের আওতায় জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে যাচ্ছে। এই সংস্থা পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা কাজের তত্ত্বাবধান করবে। কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তাসংক্রান্ত মান নির্ধারণ, দুর্ঘটনার ওপর গবেষণা এবং তা রোধে সুপারিশ করা হবে এই সংস্থার প্রধান কাজ। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেবে এ সংস্থা। ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স পরিচালনা করবে সংস্থাটি। এমন উদ্যোগ জরুরি ও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু এ ধরনের গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট কেন একটি অধিদপ্তরের অধীনে করা হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের এই সংক্রান্ত প্রকল্পের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের আইনানুগ অধিকার ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর কাজ করে। তাই এই অধিদপ্তরের অধীনেই পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা যুক্তিসংগত। অন্যদিকে, শ্রমিক সংগঠনের নেতারা মনে করছেন এমন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান অধিদপ্তরের অধীনে না হয়ে স্বাধীন হওয়া উচিত। স্মরণ করা যেতে পারে সরকার ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিলেশন ইনস্টিটিউট (আইআরআই) করার সময় বলা হয়েছিল সেটা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হবে। কিন্তু সেটা হয়নি। এই অবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করে জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটকে অবশ্যই সত্যিকার অর্থে উচ্চতর গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী দায়িত্বসম্পন্ন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।