মিতা-যুবরাজকে রথী মহারথীদের শ্রদ্ধা

‘যুবরাজ’ নামে পরিচিত মঞ্চ ও টিভি নাটকের শক্তিমান অভিনেতা খালেদ খান। আর কিংবদন্তিতুল্য রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক। এই তারকা দম্পতি এখন সুদূরের ওপারের অতিথি। কিন্তু ভক্ত ও আপনজনের হৃদয়ে আজও তারা অক্ষয় মূর্তি। সে কথাই বারবার উঠে এলো গত শুক্রবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল মিলনায়তনে। এদিন মিতা-যুবরাজকে স্মরণ করলেন বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের রথী-মহারথীরা। কে না ছিলেন এই আয়োজনে! কিংবদন্তি অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার থেকে শুরু করে আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তাফা, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, শিমূল ইউসুফ, সারা যাকের, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে আফসানা মিমি, চঞ্চল চৌধুরী, ইন্তেখাব দিনার, ত্রপা মজুমদার, তানভীন সুইটি, বিজরী বরকতউল্লাহসহ আরও তারকাশিল্পী শ্রদ্ধা জানান ‘মিতা-যুবরাজ উৎসব’-এ। দুই বন্ধুর স্মরণে সংগীত পরিবেশন করতে উড়ে আসেন কলকাতার প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্য্য। অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন ফেরদৌসী মজুমদার। এ সময় তার সঙ্গী ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক, অভিনয়শিল্পী সারা যাকের, নাট্যকার ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক রতন সিদ্দিকী। আলোচনা পর্বের আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন মিতা হকের গড়া সংগীত দল সুরতীর্থের শিল্পীরা। উদ্বোধনী বক্তব্যে ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, ‘মিতা হক ও খালেদ খান দুজনই আমার পছন্দের মানুষ ছিল। বিশেষ করে যুবরাজের অভিনয়ের পাশাপাশি তার গাওয়া গান আমার ভালো লাগত। সব সময় তার ঠোঁটের কোণে একটা স্মিত হাসি লেগে থাকত। অন্যদিকে মিতার গানের কণ্ঠে মুগ্ধ হতাম। এপারে না থাকলেও ওপারে এই দুই মানুষের ভালোবাসা অটুট থাকুক।’

সারা যাকের আলো ফেলেন মিতা হকের একেবারে ভিন্ন এক জগতে। তিনি বলেন, ‘একটা সময় মিতাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। সে কেন অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে কথা বলবে জনসম্মুখে, কেন নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলবে? তাকে এক প্রকার বিধর্মী হিসেবে পরিচয় করানোর চেষ্টা করা হয়। অথচ আমি দেখেছি, সে কতটা ধর্মপ্রাণ ছিল। ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করত। কিন্তু তার সঙ্গে অন্যদের পার্থক্য হলো, সে ধর্মকে কখনো ব্যবহার করেনি। রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহার করাকে সে ঘৃণা করত।’

আসাদুজ্জামান নূর বলেন, মিতার গানের প্রতি যে নিমগ্নতা, সেটি বিরল। তার গান যখন শুনি, মনে হয় এর চেয়ে ভালো আর কেউ বোধহয় গাইতে পারবে না। আর যুবরাজ তো আমাদের দল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়েরই সদস্য। সে একাধারে ভালো অভিনেতার পাশাপাশি ভালো গাইতেও পারত। সে প্রতিটি চরিত্রে যেভাবে নিজেকে প্রমাণ করেছে তা মঞ্চের দর্শক আজীবন মনে রাখবে।’

সুবর্ণা মুস্তাফা বলেন, ‘যুবরাজের সঙ্গে মঞ্চ ও টিভিতে অনেক কাজ করেছি। অসম্ভব উঁচু মানের শিল্পী ছিলেন। একই সঙ্গে শিক্ষিত, মার্জিত, রুচিশীল মানুষ ছিলেন। বাবা-মায়ের গুণগুলো দিয়েই তারা মেয়ে ফারহিন খান জয়িতাকে গড়ে তুলেছেন। আজ সে এত চমৎকার একটি আয়োজন করেছে বাবা-মায়ের জন্য, এটা ভাবতেই ভালো লাগছে। মজার বিষয় হলো, আমার জন্য মিতা যেমন নাটকে গেয়েছে, জয়িতাও গেয়েছে।’  

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘খালেদ খান নাট্যমঞ্চের সেরা অভিনেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন। আপন অভিনয়শৈলীর গুণে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য তিনি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। মিতা হক শুধু বাংলাদেশেই নন, ভারতের গন্ডি ছাপিয়ে সব বাংলাভাষীর কাছে সমাদৃত হয়েছেন। এ দম্পতি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস।’ গান, কবিতা আর নৃত্যের পাশাপাশি চলতে থাকে স্মৃতিচারণা। অ্যাকাডেমির নিশাত চত্বরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বিকেল থেকে বাউলগান পরিবেশন করেন আরিফ বাউল ও তার দল। নাট্যশালার বারান্দায় ‘আকাশে দুই হাতে প্রেম বিলায়’ গানের সুরে আহ্বান নৃত্য পরিবেশন করেন র‌্যাচেল প্রিয়াঙ্কা ও তার দল। মিলনায়তনে নৃত্য পরিবেশন করেন সামিনা হোসাইন প্রেমা, অনিক বোস এবং কস্তুরী মুখার্জী ও তাদের দল। আবৃত্তি পরিবেশন করেন আসাদুজ্জামান নূর, সুবর্ণা মুস্তাফা ও জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। মঞ্চস্থ হয় মাসুম রেজা রচিত ও মোস্তাফিজ শাহীন নির্দেশিত নাটক ‘আবছায়ায় যুবরাজ’। প্রযোজনাটিতে অভিনয় করেন ইন্তেখাব দিনার, রওনক হাসান, ত্রপা মজুমদার ও জ্যোতি সিনহা। স্মৃতিচারণামূলক বক্তব্য দেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বুলবুল ইসলাম ও লাইসা আহমদ লিসা। এ ছাড়া উৎসব উপলক্ষে খালেদ খান ও মিতা হকের বর্ণিল

সাংস্কৃতিক জীবনের স্মৃতিময় নানা আলোকচিত্রের দেখা মেলে জাতীয় নাট্যশালার লবিতে।

আয়োজনটি প্রসঙ্গে খালেদ খান ও মিতা হকের মেয়ে রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ফারহিন খান জয়িতা বলেন, ‘আমি মনে করি, একজন প্রকৃত শিল্পীর তার দেশ ও সমাজের প্রতি আদর্শিক দায়বদ্ধতা থাকে। সৌভাগ্যক্রমে এই দম্পতির সন্তান হওয়ায় আমি দেখেছি তাদের সেই গুণটি। শিল্পচর্চার পাশাপাশি তারা সমাজ নিয়ে ভেবেছেন, দেশ নিয়ে ভেবেছেন, সংস্কৃতি নিয়ে ভেবেছেন। পাশাপাশি তারা নিজস্ব গন্ডি এবং গন্ডির বাইরে তাদের সেই দর্শনকে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সংস্কৃতি যতবার আক্রান্ত হয়েছে, তারা তাদের জায়গা থেকে কখনো নীরবে, কখনো সরবে কাজ করে গেছেন।’