না.গঞ্জে বিএনপির ১৫ নেতার পদত্যাগের নেপথ্যে কী?

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির নবগঠিত কমিটি নিয়ে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে ১৫ নেতা পদত্যাগ করায়। গত রোববার ৪১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির ১৫ জন একযোগে পদত্যাগ করেন।

পদত্যাগকারীদের ভাষ্যমতে, গত ১৫ বছর ধরে দলীয় কোনো কর্মসূচিতে দেখা যায়নি এমন অনেককে কমিটিতে পদ দেওয়া হয়েছে। আহ্বায়ক-সদস্য সচিব দুজনই নারায়ণগঞ্জের বাইরের। এছাড়া বিএনপি আমলের বিতর্কিত তিন ‘সন্ত্রাসী পরিবার’ ও সহযোগীদের প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে মহানগর বিএনপির কমিটিতে। যারা অনেকেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে নারায়ণগঞ্জছাড়া। সরকারি দলের সঙ্গে আঁতাত করে সুবিধাভোগীদেরও পদ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ, বিএনপিকে ধ্বংস করার মিশন নিয়ে দুই প্রভাবশালী পরিবারকে মাইনাস করতে কোটি টাকা লেনদেনের মধ্য দিয়ে অনুমোদন আনা হয়েছে এই কমিটির।

অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেছেন, এখন দলে ভেদাভেদ করার সময় না। সামনে আমাদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। সেই লক্ষ্যেই নতুন কমিটি কাজ করে যাচ্ছে।

এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি প্রকাশ করা হয়। নবগঠিত কমিটিতে সাখাওয়াত হোসেন খানকে আহ্বায়ক এবং আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সদস্য সচিব করা হয়েছে।

কমিটি ঘোষণার পর থেকে দলের ভেতরে-বাইরে চলছিল সমালোচনা ও ক্ষোভের ঝড়। কমিটি প্রকাশের চার ঘণ্টার মধ্যে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা। যিনি সদ্য সাবেক মহানগর বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি আবুল কালামের ছেলে এবং নাসিকের ২৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর। স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘সদ্য ঘোষিত কমিটির ইমানদারদের সঙ্গে আমার মতো একজন নগণ্য লোক না থাকাটাই শ্রেয়। তাই আমি পদত্যাগ করলাম।’

একদিন পর ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক আতাউর রহমান মুকুল। যিনি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও সদ্য সাবেক সহ-সভাপতি। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, নতুন কমিটির বিষয়ে ন্যূনতম জিজ্ঞেস করা হয়নি আমাকে। যাদের কমিটির আহ্বায়ক-সদস্য সচিব করা হয়েছে তাদের একজন চাঁদপুরের আরেকজন মুন্সীগঞ্জের।

কমিটির সদস্য অপর কাউন্সিলর শওকত হাসেম শকু ফেইসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, মহানগর কমিটিতে খোরশেদ (তৈমূরের ভাই যুবদলের সাবেক সভাপতি ও কাউন্সিলর) নেই, ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। এরপর কমেন্টে অনেকে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত সময়ের আন্দোলন সংগ্রামে যাদের দেখা যায়নি, তারাই পদ পেয়েছে। জুলহাস নামে এক যুবদল নেতা কমেন্টে লিখেন, ‘দেড় কোটি টাকার কমিটি।’ গত রবিবার সন্ধ্যায় নগরীর এস এম মালেহ রোডে বিএনপি নেতা নুরউদ্দিনের  বাড়িতে একত্র হয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন মহানগর কমিটির চার যুগ্ম আহ্বায়কসহ ১৫ জন। পরে তারা পদত্যাগপত্রও জমা দেন।

পদত্যাগকারী নেতারা বলেন, নারায়ণগঞ্জে মহানগর বিএনপির এ কমিটি আন্দোলনের কমিটি নয়, লিয়াজোঁ কমিটি। নগরের মন্ডলপাড়ায় বিএনপির কার্যালয়টি ৩০ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসান ও তার ভাই এম এ মজিদ। এখন নারায়ণগঞ্জ বিএনপি ছন্নছাড়া। কার্যলয় বিক্রির বিষয়ে গতকাল জানতে চাইলে আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিএনপির একটি সূত্র জানায়, চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদ থেকে বহিষ্কার করা হয় তৈমূর আলম খন্দকারকে। অপরদিকে, তৈমূরের ভাই নাসিক কাউন্সিলর খোরশেদ করোনার ভয়াবহ সময়ে জীবন বাজি রেখে মানবসেবায় ব্যাপক ভূমিকার কারণে ‘করোনা হিরো’ উপাধি পেয়েছিলেন। বিএনপির রাজনীতি করতে গিয়ে প্রায় অর্ধশত মামলার আসামি হলেও তাকে সদস্য পর্যন্ত রাখা হয়নি। এসব কারণে সেসব বলয়ের অনেকে বলছেন, তৈমূর-কালাম বলয়কে মাইনাস করতেই মোটা অঙ্কের টাকায় নতুন মহানগর বিএনপির কমিটি আনা হয়েছে।