মানুষ যে রাজনৈতিক জীব তা আর ব্যাখ্যা করে বলার প্রয়োজন হয় না। দেশের যে কোনো অঞ্চলে চায়ের দোকান থেকে সাজানো ড্রয়িংরুম সব জায়গায় যে কোনো আলোচনার এক পর্যায়ে যে প্রশ্ন অবধারিতভাবে উঠে আসে তা হলো দেশের অবস্থা কেমন ভাবছেন ভাই? এবং সঙ্গে সঙ্গেই কোনো না কোনো উত্তর আসবেই, কেউ না কেউ উত্তর দেবেন আর মৃদু থেকে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়ে যাবে। এই পরিস্থিতি চলে সারা বছর ধরে। আর নির্বাচন এলে তার তীব্রতা বাড়তে থাকে।
একটা সাধারণ প্রশ্ন প্রায় সময়ই শুনতে পাওয়া যায়। রাজনীতির কী অবস্থা আর কেমন চলছে দেশ? প্রশ্ন দুটো প্রায় একই রকম আর উত্তরও প্রায় তেমনই। প্রায় একবাক্যে সবাই বলবেন যা চলছে তা ভালো না। অর্থনীতিতে অস্থিরতা, রাজনীতিতে সহিংসতা আর সংস্কৃতিতে ভোগবাদিতা জীবনে এবং সমাজে ক্রমাগত দুর্ভোগ সৃষ্টি করেই চলছে। রাজনীতিতে বিতর্ক, সমালোচনা থাকবেই আর থাকবে ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা। একেই অনেকে বলেন গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু জবাবদিহির পরিবেশ না থাকলে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। গণতন্ত্র হারানোর সেই অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে দেশে।
ক্ষমতাসীন দলের মনোভাব যদি থাকে, আমরা যা করছি ঠিকই করছি, বিরোধিতাকারীরা বিরোধিতার নামে ষড়যন্ত্র করছে, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে, ক্ষমতায় যাওয়ার স্বার্থে মানুষকে ক্ষেপিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে। ফলে পুলিশ এবং প্রশাসন দিয়ে দমন করতে হবে। তাহলে তৈরি হয় কর্র্তৃত্ববাদী মানসিকতা। এই মানসিকতা ও তৎপরতার ফলে বিশ্বের বহু কর্র্তৃত্ববাদী দেশে দুটি অবশ্যম্ভাবী পরিণতি ঘটেছে। প্রথমত, কিছু দেশের সরকার বিরোধীদের দমনে বেশ খানিকটা সফল হয়েছে। ফলে তাদের স্থায়িত্ব এবং জনগণের দুর্ভোগ আরও স্থায়ী হয়েছে। দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে জিম্বাবুয়ের স্বাধীনতার পর অত্যন্ত জনপ্রিয় কিন্তু পরে একক কর্র্তৃত্বে দেশ শাসন করা রবার্ট মুগাবের একটানা ৩৭ বছরের শাসনামলকে এই ধরনের সরকার বলা যায়। দ্বিতীয়ত, কিছু দেশে এই পথে কর্র্তৃত্ববাদী সরকার টিকে থাকতে ব্যর্থ হয়েছে। যার পরিণতিতে দেশগুলোতে চরম বিশৃঙ্খলা আর বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এক অর্থে সেসব দেশ দেউলিয়া হয়ে পড়েছে।
যেমন প্যারাডাইস অফ ক্যারিবিয়ান নামে পরিচিত দেশ হাইতি। মধ্য আমেরিকার এই দ্বীপরাষ্ট্রে জনসংখ্যা প্রায় সোয়া কোটি। পুলিশ বাহিনীর সদস্য বারো হাজার। সরকার অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তাদের বেতন দিতে পারছে না বেশ কয়েক মাস ধরে। ফলে তারা সংঘবদ্ধভাবে নেমেছে লুটপাট আর ডাকাতিতে। আর সম্পন্ন নাগরিকরা যে যেভাবে পারছে, দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে।
লেবাননকে একসময় বলা হতো ভূমধ্যসাগরের স্বর্গ। প্যালেস্টাইন নিয়ে এত বিপর্যয়ের পরও লেবাননের সমৃদ্ধি ছিল ঈর্ষণীয়। কিন্তু রিজার্ভের ডলারসহ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যাংক থেকে নিয়ে সরকার ঋণ হিসেবে খরচ করে ফেলেছে। ফলে ব্যাংকে টাকা নেই। আমানতের টাকা ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ফেরত দিতে না পারায় জনগণ চড়াও হচ্ছে ব্যাংক কর্মচারীদের ওপর। ব্যাংকগুলো তাই নিরাপত্তার স্বার্থে ঘোষণা দিয়েছে, ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে তারা ব্যাংক আর খুলবে না।
ভেনেজুয়েলাকে বলা হতো দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে ধনী দেশ। ষষ্ঠ বৃহত্তম তেলের ভা-ার আর বহু খনিজ সম্পদের আধার ভেনেজুয়েলা। সম্পদ ব্যবহারের ভুলনীতি, দুর্নীতি আর দেশি-বিদেশি লুটপাটে সেই ভেনেজুয়েলায় এখন ক্ষুধার্তের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার কমবেশি অর্ধেক। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলায় বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে মানুষ। সম্পত্তিবানরা সম্পদ নিয়ে দেশ ছাড়ছে। দেশ হারাচ্ছে মানবসম্পদ, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ফলাফল হচ্ছে দুর্বিষহ। রাজনৈতিক দমন যত বাড়ছে সমাজে অস্থিরতা আর আতঙ্ক দুটোই বাড়ছে। একটি দেশের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন আর অর্থনৈতিক লুণ্ঠন যদি চলে তাহলে অনেক সম্ভাবনা সত্ত্বেও সেই দেশের সমৃদ্ধি অর্জন ও রক্ষা করা সম্ভব নয়।
এইসব নানান দেশের উদাহরণ থেকে তাহলে আমাদের দেশের জন্য আমরা কী সতর্কতা অবলম্বন করব? প্রবাদ আছে এবং রথী মহারথীরা বলে গেছেন, মিথ্যা তিন প্রকার। মিথ্যা, ডাহা মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান। বাংলাদেশে এখন আমরা আছি পরিসংখ্যানভিত্তিক উন্নয়নের বন্যায় প্লাবিত দেশে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী খাদ্যে উদ্বৃত্ত দেশ কিন্তু বাস্তবে চালের বাজার চড়া, আমদানি বাড়িয়ে, শুল্ক কমিয়েও তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। দেশের উন্নয়ন আর উৎপাদন কি তাহলে বাড়ছে না? অবশ্যই বাড়ছে। কারণ গাছের বয়স বাড়লে ডালপালা বাড়ে। নতুন পাতা গজায়, পুরো গাছের আয়তন বাড়ে। তেমনি দেশের বয়স বাড়লে বাজেট বাড়ে, অন্যান্য সূচকগুলোও বাড়ে, বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ছোঁয়া দেশের প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়ে। পঞ্চাশ বছর পার হওয়া বাংলাদেশের তো তাই হওয়ার কথা। কিন্তু প্রশ্ন অন্যত্র। বিশাল ভবন, মহাসড়ক, উড়াল সড়ক, মেট্রো রেল, হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র সবকিছুর ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন আছে। ঋণ নিয়ে হোক আর নিজস্ব অর্থে হোক দিন শেষে দায়দেনা পরিশোধ করতে হবে জনগণের দেওয়া ট্যাক্সের টাকায়। ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার দেশে তৈরি হয়েছে এর দ্বিগুণ উৎপাদন ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় না ফলে অনেক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বসিয়ে রেখে জনগণের কাছ থেকে তাদের জন্য আদায় করা হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। ফলে ভর্তুকি বৃদ্ধি বা দাম বৃদ্ধি দুটোর বোঝাই চাপবে জনগণের কাঁধের ওপর।
কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন আর গণতান্ত্রিক পরিবেশ কি বিপরীতমুখী অবস্থানে থাকবে? ক্ষমতায় থাকা বা ক্ষমতায় যাওয়ার গণতন্ত্রসম্মত একটি পদ্ধতি হিসেবে নির্বাচনকে গুরুত্ব দেন অনেকেই। নির্বাচন নিয়ে আমাদের দেশে উৎসাহ বা অংশগ্রহণ খুব বেশিদিনের নয়। আমাদের দেশে নির্বাচনী চর্চা বা উন্মাদনা শুরু হয়েছিল প্রধানত ১৯৫৪ সালে। তারপর সামরিক শাসন, নির্বাচন নিয়ে নানা টালবাহানার পর আন্দোলনের চাপে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে জাতপাত, নারী- পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছিলেন। আর অন্যদিকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্রে আইন পাস হয়েছিল ১৯৬৪ সালে। কিন্তু এই আইনের বাস্তব প্রয়োগ হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। অর্থাৎ, ওই বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে যুক্তরাষ্ট্রের সব নাগরিক ভোট দিতে পেরেছিলেন। সেক্ষেত্রে আমাদের এই ভূখ-ে আমরা সাধারণ নির্বাচন পেয়েছিলাম ১৯৭০ সালে। কিন্তু গণতান্ত্রিক আন্দোলন আর অর্জনের এতসব ঐতিহ্য সত্ত্বেও দেশের ভোট নিয়ে এখন আমাদের পরামর্শ শুনতে হয়ে আমেরিকানদের কাছ থেকেই।
ভোটের প্রতি বিপুল আগ্রহী এ দেশের মানুষ শিখে গেলেন কীভাবে ভোট দিতে হয় এবং তারা নির্বাচনকে একটা উৎসবে পরিণত করে ফেললেন। এরপর তাদের চাওয়া ছিল প্রতি পাঁচ বছরে অন্তত একবার সুষ্ঠু নির্বাচন হোক। কিন্তু গত দুটি জাতীয় নির্বাচনের পর তারা বুঝে গেছেন, তাদের ভোট এখন মূল্যহীন। তারা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন এবং তাদের দেওয়া ভোটের সঠিক গণনায় নির্বাচনের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হবেÑ এ আশা এখন করতেও পারেন কিনা সন্দেহ। নির্বাচনকেন্দ্রিক হতাশা শুধু রাজনৈতিক কাজের উৎসাহ নষ্ট করে তাই নয় মানুষের মধ্যে দায়হীনতা আর বিচ্ছিন্নতাও তৈরি করে থাকে। যা কোনো দেশের জন্যই ভালো ফল বয়ে আনে না। সমস্যা দেখে বা নিজের স্বার্থে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া বা দেশের সমস্যায় উদাসীন থাকলে তো আর সমাজ উন্নত হবে না। বরং অনেক আন্দোলনে অর্জিত সুফল হাতছাড়া হয়ে যাবে। দেশ পরিণত হবে দুঃস্বপ্ন আর দীর্ঘশ্বাসের দেশে।
তাই অভিজ্ঞতা বলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনেক পরিসংখ্যান থাকলেও রাজনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত হলে একটা দেশ ভালো থাকতে পারে না। সুষ্ঠু নির্বাচনসহ রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান দুরূহ নয়। কিন্তু যখন কে ক্ষমতায় থাকবে সেই প্রশ্নটাই প্রধান হয়ে দাঁড়ায় তখন কীভাবে ক্ষমতায় যাবে সেই প্রশ্ন গৌণ হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের বহুল কথিত স্লোগান তখন অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেই ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল যারা সরকারে থাকে তারা রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথে অগ্রসর হবে নাকি কর্র্তৃত্ববাদ বজায় রেখে বিরোধী মত দমনের পথে হাঁটবে, এই সিদ্ধান্তের ওপর গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। অতীতের অভিজ্ঞতা বলে দমন-পীড়ন আর রাজনৈতিক সহিংসতা দুটোই অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের কপালে দুর্ভোগ ডেকে আনে।
রাজনীতিকে রাজপথে মোকাবিলা করা বা রাজনীতির মাঠেই খেলা হবে বলে যেভাবে রাজপথ ও মাঠ দখল কিংবা মাঠ ছাড়া করার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে তাতে মানুষের আতঙ্ক ক্রমাগত বাড়ছে। অতীতের কিছু দৃষ্টান্ত থেকে বলা যায়, দেশে নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা বাড়লে অনেকের মধ্যে দেশত্যাগের প্রবণতা শুধু বাড়ে তাই নয়, দেশ থেকে সম্পদ পাচারের প্রবণতাও বাড়তে থাকে। দরিদ্র এবং শ্রমজীবীদের কথা অবশ্য আলাদা। তারা দেশকে গড়ে তোলেন শ্রম দিয়ে, ট্যাক্স দিয়ে, বিদেশে কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে, নির্বাচন সুষ্ঠু হলে ভোট দিয়ে আর সহিংসতা হলে মারা গিয়ে, আহত হয়ে, মামলা মাথায় নিয়ে। দেশের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা জীবনটা যেন শান্তিতে কাটাতে পারেন এমন একটা পরিবেশ। জিডিপি, মাথাপিছু আয়ের পরিসংখ্যান তাদের কাছে সংখ্যা মাত্র। দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের প্রভাব যদি তাদের জীবনে না পড়ে, তাদের জীবনমান যদি সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী না বাড়ে তাহলে প্রশ্ন করার, জবাব চাওয়ার অধিকার কি তাদের থাকবে না? দেশটা শ্রমজীবী ও দরিদ্র মধ্যবিত্তদের, দেশের ক্ষমতায় থাকেন যারা তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কথা ভাববেন এটা কি খুব বড় কোনো চাওয়া?
লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
rratan.spb@gmail.com