ইসলামী পণ্ডিত আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভির মৃত্যু

বিশ্বখ্যাত আলেম শায়খ আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রজিউন)। স্থানীয় সময় সোমবার দুপুরে কাতারের রাজধানী দোহায় তিনি ইন্তেকাল করেন। আলআরাবিয়া ও আলজাজিরা আরবি তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর।

একইসাথে শায়খ কারজাভির ছেলে আব্দুর রহমান ইউসুফ এক টুইটে বাবার মৃত্যুর বিষয়টি জানান। তিনি লেখেন, 'ঘোড়সওয়ার ঘোড়া থেকে নেমে গেলেন'। শায়খ কারজাভির ফেরিভায়েড ফেসবুক পেজ ও টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকেও তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

শায়খের পেজে লেখা হয়, 'ইমাম শায়খ ইউসুফ কারজাভি ইন্তেকাল করেছেন। যিনি তার গোটা জীবন ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠায় উৎসর্গ করেছেন।'

শায়খ ইউসুফ আবদুল্লাহ আল কারজাভি মিসরীয় বংশোদ্ভূত একজন প্রভাবশালী গবেষক আলেম। তিনি মিসরভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের উপদেষ্টা ছিলেন। মিসরীয় জাতিসত্ত্বার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও শায়খ কারজাভি কাতারে বসবাস করতেন। মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক থাকার কারণে তিনি কয়েকবার কারাবরণ করেন এবং সবশেষ মাতৃভূমি ত্যাগ করে কাতারে স্থায়ী হন। ২০১৫ সালে মিসরের একটি আদালত তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ জারি করে।

মুসলমানদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বেশকটি সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন শায়খ কারজাভি। মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিকদের অভিজাত সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সের সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। সেই সাথে জর্ডানের রয়্যাল একাডেমি ফর ইসলামিক কালচারাল অ্যান্ড রিচার্জ, ইসলামী সম্মেলন সংস্থা, রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী এবং ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার, অক্সফোর্ড এর সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আয়ারল্যান্ডভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফাতওয়া অ্যান্ড রিচার্জের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

আধুনিক উদ্ভূত নানা জটিল সমস্যার সাবলীল ও গভীর ইজতিহাদভিত্তিক সমাধানমূলক শতাধিক গবেষণা-গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। তার গ্রন্থগুলো প্রকাশের পরপরই পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়ে জ্ঞানী, গবেষক, বোদ্ধামহল ও সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।

তার জন্ম ১৯২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, মিসরের উত্তর নীলনদের তীরবর্তী সাফাত তোরাব গ্রামে। দুই বছর বয়সে বাবা ইন্তেকাল করলে চাচা তার লালন-পালন করেন। ১০ বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ করেন। হিফজ সম্পন্ন করে আল-আজহার কারিকুলামে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেন। উচ্চমাধ্যমিকে জাতীয় মেধায় দ্বিতীয় হন। প্রাচীন ইসলামী বিদ্যাপীঠ আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উসুলুদ দীন অনুষদ থেকে অনার্স, আরবি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা এবং পিএইচডি অর্জন করেন।

মিসরের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন 'ইনস্টিটিউট অব ইমামস'-এর পরিদর্শক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন শায়খ ইউসুফ কারজাভি। কিছুদিন তিনি আওকাফ মন্ত্রণালয়ের বোর্ড অব রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্স-এ কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে 'শরীয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ' অনুষদের প্রতিষ্ঠাকালীন ডিন নিযুক্ত হন। ১৯৯০ পর্যন্ত তিনি এখানে কর্মরত থাকেন এবং একই বছর তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় 'সীরাত ও সুন্নাহ গবেষণা কেন্দ্র'। ১৯৯০-৯১ সালে আলজেরিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্টিফিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের সীরাত ও সুন্নাহ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক হয়ে ফের কাতার ফেরেন।

শায়খ ইউসুফ কারাজাভি ১৪১১ হিজরিতে ইসলামী অর্থনীতিতে অবদান রাখায় ব্যাংক ফয়সল পুরস্কার লাভ করেন। ইসলামী শিক্ষায় অবদানের জন্য ১৪১৩ হিজরিতে মুসলিম বিশ্বের নোবেল খ্যাত কিং ফয়সাল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে ব্রুনাই সরকার তাকে 'হাসান বাকলি' পুরস্কারে ভূষিত করে। এ ছাড়াও তার বৈচিত্র্যময় পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নানা পদক ও সম্মাননায় ভূষিত হন। সূত্র : আলজাজিরা, আলআরাবিয়া, উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য