কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় স্থগিত হয় দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি বিষয়ের এসএসসি পরীক্ষা। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার কেন্দ্র সচিব ও নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানসহ চার সহকারী শিক্ষক ও এক কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করে ব্যবস্থাপনা কমিটি।
অভিযোগ উঠেছে, নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অভিযুক্ত এ প্রধান শিক্ষকের নেতৃত্বে কয়েক বছর থেকে চলছিল জেএসসি ও এসএসসির প্রশ্নফাঁস। তার সঙ্গে ছিলেন ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম রাসেল, ধর্মীয় শিক্ষক মাওলানা যুবায়ের হোসেন, সোহেল রানা, হামিদুর রহমান, অফিস সহকারী সুজন মিয়া ও অফিস সহকারী আবু হানিফ।
সাতজনের মধ্যে ছয়জনই বর্তমানে প্রশ্নফাঁসের মামলায় কারাগারে। আবু হানিফ পলাতক আছেন।
বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ক্লাস করানোর নামে স্কুলের ভেতরে কোচিং সেন্টার গড়ে তোলে শিক্ষকদের এ সিন্ডিকেট। শতভাগ ‘এ প্লাস’ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে করা হতো প্রশ্নফাঁস।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জেএসসি, এসএসসির প্রশ্নফাঁসের কারণে গত পাঁচ বছরে নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল আশাতীত ভালো হয়। গত বছরও ১৮ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায় এ স্কুল থেকে।
কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৮ সাল থেকে নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ‘এ প্লাস’ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আশপাশের স্কুলের চেয়ে বেশি। সর্বশেষ ২০২১ সালে যা ছিল ১৮ জন। যা একই কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়া অন্যান্য স্কুলের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি।
অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের বাড়ি নাগেশ্বর উপজেলায় সেখান থেকে তিনি তৃতীয় শ্রেণিতে ডিগ্রি পাস করেন। এইচএসসি পাস করেন বিশেষ বিবেচনায়। ২০১৩ সালে তিনি এ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তার কয়েক বছর পর প্রধান শিক্ষক হন।
স্থানীয় সংবাদকর্মী এমদাদুল হক মন্টু বলেন, নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় অতিরিক্ত ক্লাসের নামে কোচিং করানো হতো। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন দেওয়া হতো তাদের কাছে। এ কেন্দ্র যে অন্যান্য স্কুলের পরীক্ষা হতো তাদেরও প্রশ্ন দিয়ে সহায়তা করত তারা।
তবে এ বিষয়ে নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক পার্শ্ববর্তী একটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে আমার যেটা মনে হয় প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান আর্থিকভাবে খুব একটা সচ্ছল পরিবারের ছিলেন না। লুৎফর রহমানের শ্বশুর প্রাইমারির শিক্ষক ছিলেন। শ্বশুরের সহযোগিতায় হামিদা খানম উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সুযোগ পান তিনি। পরবর্তীতে সেখানে শিক্ষকতা বাদ দিয়ে ২০১৩ সালে নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ওই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির লোকজনকে নিজের আয়ত্তে এনে হয়ে যান প্রধান শিক্ষক।
তিনি জানান, দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর তারা প্রশ্নফাঁসের মতো কাজ কররে আসছেন। দেখা গেছে এ সময়ে অন্যান্য সব স্কুলের চেয়ে তাদের স্কুলের রেজাল্ট ভালো। কিন্তু তাদের স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ভালো স্থানে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে না। আমার স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা কিন্তু প্রতিবছর মেডিকেলসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন’।
তিনি আরো বলেন, আমার মনে হয় তার প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি তারা অনেক গোপনে চালাত। এ কাজ করে আস্তে আস্তে তাদের সাহস বেড়ে যায়। একসময় তো সে প্যান্ট-শার্ট পরত। এখন পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে। সে ধরা পড়ে অনেক ভালো হয়েছে, না হলে আগামী বছর আরো বড় পরিসরে এ কাজটি করত। হয়তো তখন অনেক মানুষ ফেঁসে যাইত। শুনেছি তার যে সম্পদের পরিমাণ এভাবেই হয়েছে।
তখন ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন বলেন, প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ চক্রে যারা জড়িত আছে আমরা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করার চেষ্টা করছি।
ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষা চলাকালীন প্রশ্ন ফাঁসের ‘গুজব’ ওঠায় নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ট্যাগ কর্মকর্তা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরী বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মার নজরে আনেন। এরপর পরীক্ষা শেষে তারা কেন্দ্র সচিব ও স্কুলের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের কক্ষে গিয়ে এ নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
প্রথমে তিনি ( প্রধান শিক্ষক) সদুত্তর দিতে না পারলেও পরে অধিকতর জিজ্ঞাসায় স্বীকার করেন তার কাছে পরবর্তী পরীক্ষার প্রশ্ন রয়েছে। পরে তিনি সবার উপস্থিতিতে তার রুমের বুক শেলফের নিচের তাকে রাখা একটি কাপড়ের ব্যাগের ভেতর থেকে কয়েকটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বের করে দেন।
এ মামলার বাদী ও ওই কেন্দ্রের ট্যাগ কর্মকর্তা এজাহারে উল্লেখ করেন, ব্যাগের ভেতর থেকে গণিত (আবশ্যিক), উচ্চতর গণিত, রসায়ন, কৃষি, জীববিজ্ঞান ও পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রের প্যাকেট বের করা হয়। এর মধ্যে একটি প্যাকেট ছাড়া বাকি সবগুলোর মুখ খোলা ছিল।
পরে এ ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও বরখাস্ত করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মাকে কারণ দর্শাতে বলা হয়। সাময়িক বরখাস্ত করা হয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুর রহমানকে।