কালের ভাষ্যকার আবুল মনসুর আহমদ

আবুল মনসুর আহমদের যখন জন্ম তখন (১৮৯৮) এই অঞ্চলের মানুষ ধর্ম ও আত্মপরিচয় নিয়ে ছিল দ্বিধান্বিত। কে কোথা থেকে এসেছে, কী করবে, কী তার পরিচয়সেসব ভাবনার দোলাচলে বিশাল এক জনগোষ্ঠী। ফলত বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের সঙ্গে আবুল মনসুরের জীবন ও কর্ম পরস্পর হাত ধরাধরি করে আছে শত বছর। তার সামাজিক রাজনৈতিক চিন্তাধারা জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রচিন্তাকে এগিয়ে নিতে সব সময় ভূমিকা রেখে আসছে। দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে অনেক শিক্ষিত মুসলমানের মতোই বাংলার আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্যময় পটভূমির সন্তান তিনি। স্বভাবতই দুই স্রোতে অবগাহন তার জন্য ভবিতব্যই হয়ে ওঠে। মেধার বিকাশ ঘটান প্রধানত সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনীতির ত্রিধারায়। তবে সাহিত্য ছিল তার রক্তে। হয়তো তাই এর প্রকাশ পায় কৈশোরে-তারুণ্যে।

রাজনৈতিক সচেতনতা, সমাজ ভাবনা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার চোখ আবুল মনসুর আহমদকে দিয়েছে অনন্যতা। তাই তিনি রচনা করতে পেরেছেন ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’-এর মতো অসামান্য ইতিহাস। এটি ১৯২০ থেকে ১৯৭০ দশকের মধ্যবর্তী সময়ের একটি দলিল। তবে বইটি লেখা শেষ হয়েছিল ১৯৬৭ সালে। স্বাধীনতার পর আরও কয়েকটি অধ্যায় জুড়ে দিয়ে ১৯৭৩ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত সময়টিকে ধরে রেখেছেন বইতে। এটা আমাদের দূর অতীতে নিয়ে যায়টানাপড়েনের দশকগুলোতে, যখন অবিরাম রাজনীতিতে ভাঙাগড়ার খেলা চলছিল।

এই বইয়ে আবুল মনসুর আহমদের অনেক ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং শ্রেণি-অবস্থানের জানান থাকলেও তা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তিনি এতটা নিখুঁতভাবে সময়কে তুলে এনেছেন তা খুব রাজনৈতিকই করেছেন। ফলে বাংলাদেশের শতবর্ষের রাজনৈতিক ইতিহাস হোক কি কেবল গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাস হোক, সূত্রগ্রন্থ হিসেবে ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ কাছে না পেলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। তিনি আসলে অনুসন্ধিৎসু ভাষ্যকার। তিনি সময়ের ইতিহাস লিখেছেন, দিয়েছেন নিজস্ব ভাবনাযোগে টীকা-টিপ্পনী।

বিশেষ করে পাকিস্তান কেমন রাষ্ট্র হবে তার স্পষ্ট ধারণা দিয়েছেন পাকিস্তান জন্মের অনেক আগেই। ১৯৪৪ সালে আনুষ্ঠানিক সভায় সভাপতি হিসেবে তিনি বলেছিলেন : ‘পাকিস্তান দাবিটা প্রধানত কালচারাল অটনমির দাবি। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার চেয়ে কালচারাল অটনমি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই দিক হইতে পাকিস্তানের দাবি শুধু মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক দাবি নয়, এটা গোটা ভারতের কালচারাল মাইনরিটির দাবি। ভারতীয় মুসলমানরা হিন্দু হইতে আলাদা জাত তো বটেই, বাংলার মুসলমানরাও পশ্চিমা মুসলমানদের হইতে পৃথক জাত। শুধুমাত্র ধর্ম জাতীয়তার বুনিয়াদ হইতে পারে না।’ তার এই চিন্তাটি সাতচল্লিশে নয়, একাত্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে আমাদের কালক্রমে ঘটে যাওয়া বড় ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপট যার জানার জন্য বইটি দরকার।

অন্যদিকে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবুল মনসুর আহমদের পর্যবেক্ষণ ছিল একেবারে আলাদা। যেমন তিনি বলেছেন‘তিনশ পনেরো সদস্যের পার্লামেন্টে জনা-পঁচিশেক অপজিশন মেম্বার থাকিলে সরকারি দলের কোনোই অসুবিধা হইত না। বরঞ্চ ওইসব পার্লামেন্টারিয়ান অপজিশনে থাকিলে পার্লামেন্টের সৌষ্ঠব ও সজীবতা বৃদ্ধি পাইত।...বাংলাদেশের পার্লামেন্ট পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের একটা ট্রেনিং কলেজ হইয়া উঠিত। আর এসব শুভ পরিণামের সমস্ত প্রশংসা পাইতেন শেখ মুজিব।’ গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ লিখছেন‘স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদর্শন সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমদের মন্তব্য বেশ চাঁছাছোলা। বইজুড়ে আবুল মনসুর আহমদ এ ধরনের অনেক রূঢ় সত্য উচ্চারণ করেছেন সহজ-সরলভাবে’ বাংলাদেশের স্বাধীনতায় দ্বি-জাতিতত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, এমনটা তিনি মনে করেন না।

আবুল মনসুর আহমদের মতে, ‘এক পাকিস্তানের জায়গায় দুই পাকিস্তান হইয়াছে। ভারত সরকার লাহোর প্রস্তাব বাস্তবায়নে আমাদের সাহায্য করিয়াছেন।...লাহোর প্রস্তাবে “পাকিস্তান” শব্দটার উল্লেখ নাই, শুধু মুসলিম মেজরিটি রাষ্ট্রের উল্লেখ আছে। তার মানে রাষ্ট্রের নাম পরে জনগণের দ্বারাই নির্ধারিত হওয়ার কথা। পশ্চিমা জনগণ তাদের রাষ্ট্র-নাম রাখিয়াছে “পাকিস্তান”। আমরা পুরবীরা রাখিয়াছি “বাংলাদেশ”। এতে বিভ্রান্তির কোনো কারণ নাই।’ এ রকম অসংখ্য তিক্ত সত্য তিনি বলেছেন। অন্যদিকে দেখা যায়, রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমদের রাজনৈতিক জীবনকাল প্রায় চার দশক। এ দীর্ঘ সময়ে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে ছিলেন। তবে শৈশবেই তার সাংবাদিকতা ও রাজনীতির হাতেখড়ি হয়। এতে ত্রিকালদর্শী জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে যশ ও খ্যাতি যেমন ছিল, তেমনি জুটেছিল সামরিক শাসনের কারা যন্ত্রণা। কর্মজীবনে তিনি মহাত্মা গান্ধী, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নেতাজি সুভাষ বসু, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর, সৈয়দ নওশের আলী, খাজা নাজিমুদ্দিন, মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মিঞা ইফতেখার উদ্দিন, মিঞা মাহমুদ আলী কাসুরী, জি এম সৈয়দ, মিঞা মমতাজ দৌলতনা, আবুল হাশিম প্রমুখ এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও নেতাদের সঙ্গে ছিল তার ব্যক্তিগত পরিচয় ও হৃদ্যতার সম্পর্ক। জনশ্রুতি আছে নেতাজি সুভাষ বসুর সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল ‘তুমি’-‘তুমি’ পর্যায়ের। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। স্বাধীন বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শ্রদ্ধাস্পদ নেতা ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু সগৌরবে আবুল মনসুর আহমদকে ‘লিডার’ বলতেন এবং কলেজ জীবন থেকে নিজেকে তার শিষ্য বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।

বিশ শতকের ষাটের দশকে আবুল মনসুর আহমদ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিলেও একজন রাজনৈতিক-বিশ্লেষক হিসেবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। দেশের সংকট-সম্ভাবনায় এগিয়ে যাওয়ার নানান দিক গবেষণামূলক প্রবন্ধে অসামান্যভাবে তুলে ধরেছেন। ঐতিহাসিক সেসব প্রবন্ধ আজও প্রাসঙ্গিক রাষ্ট্রের প্রয়োজনে। তার আত্মজীবনীমূলক রচনাদি দেশীয়-আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-অধ্যয়নের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। ফলে আবুল মনসুর আহমদের জীবন থেকে দেখি : দেশপ্রেম বুকে নিয়ে সারাজীবন দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিলেন। তার দেখা সমাজের প্রতিটি অসংগতি নিয়েই কলম ধরেছেন। সময়ের বুকে পা রেখে কুয়াশা ভেদ করে দেখেছেন আলো। সর্বত্র বিচরণে দিনে দিনে তার কলম হয়ে উঠছে দুর্ধর্ষ। দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রেরণা জুগিয়ে, সবার মধ্যে দিয়েছে শুদ্ধচিন্তার খোরাক। স্বতন্ত্র কালচারের স্বপ্ন দেখে একাধিক গ্রন্থও রচনা করেন।

সর্বোপরি, গত শতকের সমাজ রাজনীতি বুঝতে ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি আবুল মনসুর আহমদের চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে দেখা। আর তাকে পাঠ করার মধ্য দিয়ে আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ পেতে পারি। আমাদের সমাজ-রাজনীতির চেহারা কেমন ছিল, কতটা পরিবর্তন হয়েছেপরিষ্কার ধারণা পাওয়া প্রয়োজন।

লেখক : কবি ও গবেষক

emranmahfuj@yahoo.com