সিজারিয়ানে খরচ বেশি সিলেটে

বেসরকারি হাসপাতালে অপারেশনের মাধ্যমে সন্তানের জন্মদানে সবচেয়ে বেশি খরচ সিলেটে এবং সবচেয়ে কম খরচ বরিশালে। সিলেটে খরচ হয় ৩০ হাজার ৫৫৭ টাকা ও রাজশাহীতে খরচ হয় ১৫ হাজার ৭০৫ টাকা। সরকারি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় সিলেটেই ১৭ হাজার ৮৩৭ টাকা; আর সবচেয়ে কম খরচ হয় রংপুরে ৭ হাজার ৩১ টাকা। নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশনএনজিওতে সবচেয়ে বেশি খরচ ২১ হাজার ৪৭৬ টাকা, সিলেটে এবং কম খরচ ১২ হাজার ৮১ টাকা, রংপুরে।

গতকাল বুধবার রাজধানী ঢাকার আগারগাঁওয়ে নিজস্ব ভবনে দুপুর ২টায় এ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। তাতে মেসিভ বোম অব সি-সেকশন ডেলিভারি ইন বাংলাদেশ: আ হাউজহোল্ড লেভেল অ্যানালাইসিস ২০০৪-২০১৮ শীর্ষক জরিপের ফল তুলে ধরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজবিআইডিএস। বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে জরিপের ফল তুলে ধরেন পপুলেশন স্টাডিজ ডিভিশন ও বিআইডিএসের গবেষণা ফেলো ড. আব্দুর রাজ্জাক সরকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে সাধারণ (স্বাভাবিক বা ধাত্রী-সহায়তার) প্রসব ও প্রাতিষ্ঠানিক (চিকিৎসক-সহায়তার) প্রসব বাড়ার সঙ্গে সি-সেকশনের হারও বাড়ছে। এক জরিপে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে অপ্রয়োজনীয় সি-সেকশন হয়েছে ৮ লাখ ৬০ হাজার। প্রতি ১০টি সি-সেকশনের অন্তত ছয়টি অপ্রয়োজনীয় ছিল। সি-সেকশন বাড়ার ফলে অনেক পরিবারকে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। বাড়িতে স্বাভাবিক প্রসবে ১ হাজার ৩০০ টাকা, ধাত্রী-সহায়তার স্বাভাবিক প্রসবে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার বেশি এবং সি-সেকশনে ২০ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে।

বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে (বিডিএইচএস) ২০০৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে অপারেশন করা নারীদের থেকে তথ্য নেয়। ২৭ হাজার ৩২৮ নারীর মধ্যে এই জরিপ চালানো হয়। জরিপে অন্তর্ভুক্ত নারীদের বয়স ১৫ থেকে ৪৯ বছর।

জরিপে জানানো হয়, দেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে ডেলিভারিতে সরকারি হাসপাতালে ঢাকায় ১৩ হাজার ৩৮৩ টাকা, চট্টগ্রামে ১৫ হাজার ৮৩১, বরিশালে ১৬ হাজার ৮৪৬, খুলনায় ১১ হাজার ৮৯৩, রাজশাহীতে ১০ হাজার ৯৪১, সিলেটে ১৭ হাজার ৮৩৭, রংপুরে ৭ হাজার ৩১, ময়মনসিংহে ১১ হাজার ৫১৬ টাকা খরচ হয়।

বেসরকারি হাসপাতালে ঢাকায় ২৩ হাজার ১৬৮, চট্টগ্রামে ২৫ হাজার ৫০৭, বরিশালে ২৮ হাজার ৯৫৯, খুলনায় ১৫ হাজার ৭২৯, রাজশাহীতে ১৫ হাজার ৭০৫, সিলেটে ৩০ হাজার ৫৫৭, রংপুরে ১৮ হাজার ২৩০, ময়মনসিংহে ১৯ হাজার ৯৭৩ টাকা খরচ হয়। এনজিও’র হাসপাতালগুলোতে ঢাকায় ২০ হাজার ৪৯৮, চট্টগ্রামে ১৫ হাজার ২৬৯, বরিশালে ১৫ হাজার ৮২৩, খুলনায় ১৪ হাজার ৭১০, রাজশাহীতে ১০ হাজার ৩৪৬, সিলেটে ২১ হাজার ৪৭৬, রংপুরে ১২ হাজার ৮১, ময়মনসিংহে ১৫ হাজার ৬১ টাকা খরচ হয়।

এই অপারেশন হার ২০০৪ সালে ছিল ৩ দশমিক ৯৯ ভাগ থেকে ২০১৭-২০১৮ সালে ৩৩ দশমিক ২২ ভাগ।

অনলাইনে যুক্ত হয়ে নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরিন হক বলেন, গ্রামেও সি-সেকশন বেড়ে যাচ্ছে, বাড়ার কারণ চিকিৎসকদের চাপ। তাদের চাপে পড়েই পরিবারগুলো সি-সেকশনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্তদের সংখ্যা বেশি।

শিরিন হক বলেন, ‘আগে আমাদের দেশের ধাত্রীপ্রথা ছিল। সেটা হারিয়ে গেছে। সন্তান জন্ম নেওয়ার লক্ষণগুলো এসব ধাত্রীই ভালোভাবে ধরতে পারেন, চিহ্নিত করতে পারেন। এখন ডাক্তারকে অগ্রিম টাকা দিতে হয়। না হলে তারা আসতে চান না।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা হচ্ছে, অপারেশন ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে হতে পারে কিন্তু বাংলাদেশে এই হার ২০১৭-১৮ সালে ৩৩ শতাংশ ছিল। একই সময়ে ভারতে ২২ শতাংশ, পাকিস্তানে ২২ শতাংশ, নেপালে ১৬ ও মিয়ানমারে ১৭ শতাংশ ছিল।

বছরভিত্তিক হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২০০৩-০৪ সালে ৫৪১৩ জনের মধ্যে ২১৬ জন অর্থাৎ ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ ছিল। ২০০৭ সালে ছিল ৪৯০৩ জনের মধ্যে ৪২২ জন অর্থাৎ ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০১১ সালে ছিল ৭৩৪১ জনের মধ্যে ১১০৮ জন অর্থাৎ ১৫ দশমিক ০৯ শতাংশ।

২০১৪ সালে বাংলাদেশে ৪৬২৬ জনের মধ্যে ১১২২ জন অর্থাৎ ২৪ দশমিক ২৫ শতাংশ ছিল। আর ২০১৭-১৮ সালে ছিল ৫০৪৫ জনের মধ্যে ১৬৭৬ জনের মধ্যে অর্থাৎ ৩৩ দশমিক ২২ শতাংশ।

অনুষ্ঠানে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, একটি দেশে মোট শিশুর জন্মের ১৫ শতাংশের বেশি সি-সেকশন হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশে ২০০৪ সালে সি-সেকশনের হার প্রায় ৪ শতাংশ ছিল। ২০১৮ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ শতাংশের বেশি। গ্রামের চেয়ে শহরের নারীদের বেশি সি-সেকশন হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এই প্রবণতা বেশি।

বিডিএইচএস ২০১৭-১৮ প্রতিবেদন অনুসারে, শহরের ৪৪ শতাংশ ও গ্রামের ২৯ শতাংশ মায়ের সি-সেকশন হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালে প্রসবের ৫২ শতাংশ ও সরকারি হাসপাতালে ১১ শতাংশ সি-সেকশন হচ্ছে। ২০ বছর থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে সি-সেকশনের হার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। সি-সেকশনে সন্তান জন্ম দিয়েছেন এমন মায়ের প্রায় ৬০ শতাংশ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেশি পড়াশোনা করেছেন।