সর্বশ্রেষ্ঠ নেকির কাজ

অঙ্গীকার পূরণ, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, মহানুভবতা, উত্তম চরিত্র, শ্রেষ্ঠত্ব ও মূল্যবোধের অন্তর্গত হচ্ছে অন্যের সদ্ব্যবহারের স্বীকৃতি ও তার প্রতিদান দেওয়া, সদাচরণকারীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং ইহসানের মাধ্যমে ইহসানের বিনিময় প্রদান করা। এ জন্য প্রত্যেক মানুষের স্মরণ করা উচিত, তার পিতা-মাতা তাকে সুখী করতে কতই না কষ্ট সহ্য করেছেন। তার প্রশান্তির জন্য কত ক্লেশের সম্মুখীন হয়েছেন। তার আরামের ঘুমের জন্য কত রাত জেগেছেন। তাকে পরিতৃপ্ত রাখতে কতবার না খেয়ে থেকেছেন। তাকে তৃপ্ত করতে কত সময় পিপাসিত থেকেছেন এবং তাকে নিরাপদ রাখতে কত আতঙ্কে ভুগেছেন। বিনিময়ে আল্লাহতায়ালা তাদের প্রতি সদ্ব্যবহার, সদাচরণ, ইহসান এবং তাদের জন্য বাহু অবনত করাকে আবশ্যক করেছেন। এমনকি তাদের হককে আল্লাহতায়ালা স্বীয় হকের সঙ্গে, তাদের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টিকে স্বীয় সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন। আর মায়ের পদতলে জান্নাত রেখেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো ও কোনো কিছুকে তার শরিক করো না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির ও তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।’ -সুরা আন নিসা: ৩৬

সবচেয়ে বড় ও আবশ্যকীয় হক এবং অধিক পছন্দনীয় সৎকাজ হলো পিতা-মাতার হক আদায়, তাদের প্রতি ইহসান করা, তাদের জন্য বিনয়ের বাহু অবনত করা এবং তাদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহ প্রদর্শন করা। বিশেষ করে তাদের অক্ষমতা ও বার্ধক্যকালে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না। আর তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো। আর তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বলো হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ -সুরা আল ইসরা : ২৩-২৪

পিতা-মাতার প্রতি ইহসান করতে আল্লাহ আদেশ করেছেন এবং তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, যদিও তারা কাফের হয়। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ প্রস্ফুটিত হবে উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা, তাদের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও কোমল আচরণ, তাদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যয়, তাদের মনোবাসনা পূরণ করা এবং আবেগ-অনুভূতির প্রতি লক্ষ রাখার মাধ্যমে। দুর্ব্যবহার, অবাধ্য হওয়া, তাদের অবহেলা এবং হক বিনষ্ট করা তাদের সঙ্গে অসদাচরণের অন্তর্গত।

মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতা-মাতার সন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত, অনুরূপভাবে আল্লাহর অসন্তুষ্টিও পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত। ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘মহান রবের সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং রবের অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে।’ -সুনানে তিরমিজি

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘পিতা হলো জান্নাতের সর্বোত্তম দরজা। সুতরাং তুমি দরজাটির রক্ষণাবেক্ষণ করো।’ -মুস্তাদরাকে হাকেম

আরেক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘ওই ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক, ওই ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক, ওই ব্যক্তির নাক ধূলিমলিন হোক! বলা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! কার? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে কিংবা একজনকে বার্ধক্যাবস্থায় পেল, কিন্তু তাদের সেবা করে- জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ -সহিহ মুসলিম

পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা সর্বশ্রেষ্ঠ নেকির কাজ, গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল। পিতা-মাতার অধিকারের প্রতি হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এত বেশি গুরুত্ব প্রদান করেছেন যে, এটাকে তিনি আল্লাহর পথে জিহাদের ওপর অগ্রাধিকার দিয়েছেন। হজরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী কারিম (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম কোন আমল আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়? তিনি বললেন, যথাসময়ে নামাজ আদায় করা। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার। আমি বললাম, অতঃপর কোনটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদ করা।’ -সহিহ বোখারি

পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ বালা-মসিবত দূর ও দোয়া কবুলের অন্যতম মাধ্যম। পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের পথ তাদের মৃত্যুর মাধ্যমে বন্ধ হয়ে যায় না। বরং তা চলমান থাকে তাদের করা প্রতিশ্রুতি পূরণ, ঋণ পরিশোধ, তাদের জন্য দান-সদকা ও দোয়া করা এবং তাদের আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ, প্রীতি-ভালোবাসা ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে। হজরত আবু উসাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা আমি রাসুল (সা.)-এর কাছে উপবিষ্ট ছিলাম এমতাবস্থায় তার কাছের একজন আনসারি ব্যক্তি আগমন করল। সে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পরে তাদের সঙ্গে সদাচারের কিছু অবশিষ্ট আছে কি যা আমি তাদের সঙ্গে করতে পারি? তিনি বললেন, হ্যাঁ, চারটি কাজ তাদের জন্য দোয়া এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা, তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা এবং তাদের দিকের আত্মীয়দের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। তাদের মৃত্যুর পরে তোমার ওপর তাদের জন্য পালনীয় এ সদাচারগুলোই অবশিষ্ট থাকে।’ -মুসনাদে আহমদ

পিতা-মাতার অবাধ্যতা করা অনেক বড় গোনাহ। এর পরিণতি অত্যন্ত খারাপ এবং শেষ ফলাফল জাহান্নামের শাস্তি। পিতা-মাতার অবাধ্য ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তার দিকে তাকাবেন না এবং আল্লাহ তার ওপর অভিশাপ করেছেন। সুতরাং পিতা-মাতার অবাধ্যতার পরিণতিস্বরূপ আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে সাবধান থাকা প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের জন্য কর্তব্য। কেননা হজরত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সব পাপের শাস্তি আল্লাহতায়ালা নিজ ইচ্ছা মোতাবেক কিয়ামত দিবস পর্যন্ত বিলম্ব করেন, পিতা-মাতার সঙ্গে নাফরমানির শাস্তি ছাড়া; কেননা আল্লাহতায়ালা পিতা-মাতার সঙ্গে নাফরমানির শাস্তি অবাধ্য ব্যক্তিকে তার মৃত্যুর আগে দুনিয়াতেই দিয়ে থাকেন।’ -মুস্তাদরাকে হাকেম

পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার এমন অধিকার যা আদায় করা ওয়াজিব। এমন ঋণ যা পরিশোধ করা অবশ্য কর্তব্য এবং তা জান্নাতের দরজাসমূহের একটি দরজা। সুতরাং পিতা-মাতার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করবেন না এবং তাদের জন্য ব্যয়িত অর্থকে অতিরিক্ত মনে করবেন না। কেননা তারা উভয়ে পৃথিবীতে আপনার আগমনের কারণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ইহসানের প্রতিদান ইহসান ছাড়া আর কী হতে পারে?’ -সুরা আর রাহমান : ৬০

৩০ সেপ্টেম্বর মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা।

অনুবাদ মুহাম্মদ আতিকুর রহমান