ভেস্তে গেছে ডিজিটাল সিলেট প্রকল্প

বিনা মূল্যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সিলেটবাসীর মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ‘ডিজিটাল সিলেট’ প্রকল্পটি বছর না ঘুরতেই ভেস্তে গেছে। ২০১৭ সালে ৩০ কোটি টাকা প্রাক্কলন ধরে প্রকল্পের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি)। পরে তা সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু করপোরেশনের দায়িত্বে যাওয়ার এক বছরের মাথায় মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রকল্পের সুফল। এতে বিনা মূল্যে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সিলেটবাসী।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেট নগরের কোথাও ওয়াই-ফাই সচল নেই। সচল নেই আইপি ক্যামেরাও। এ ছাড়া চালু হয়নি ওসমানী মেডিকেলের অটোমেশনে হেলথ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। সম্প্রতি প্রকল্পটি পরিদর্শন করেছে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। কিন্তু ব্যর্থ ও অচল প্রকল্প পর্যবেক্ষণের পরও এতে কোনো আপত্তি না জানিয়ে বরং মেয়াদ বাড়ানোর পক্ষে অনাপত্তি জানিয়েছে আইএমইডি। এ ছাড়া দুই অর্থবছরে ৫টি অডিট আপত্তির মধ্যে ৩টিই অনিষ্পন্ন। এর মধ্যে একটিতে ব্যক্তি পরামর্শকদের বেতন-ভাতা থেকে নির্ধারিত হারে ভ্যাট না কর্তন করায় ৯০ হাজার টাকার রাজস্ব ক্ষতি, আরেকটি রয়েছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রকল্পের অব্যয়িত ৫৮ হাজার ৬৫১ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তা কোথায় খরচ করা হয়েছে, তার হদিস না থাকা। আর তৃতীয়টি হলো, দুর্বল নেটওয়ার্ক সিগন্যাল ও ওয়াই-ফাই সিগন্যাল বিচ্ছিন্ন থাকা প্রসঙ্গে প্রকৃত উদ্যোগ ব্যাহত। এই অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।

আইএমইডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর নগরীতে ওয়াই-ফাই সিস্টেম স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। চলতি বছরের ২৫ মে সেখানে পর্যবেক্ষণে গিয়ে ১২৬টি ওয়াই-ফাই এক্সেস পয়েন্টের মধ্যে ৮৯টির ব্যান্ডউইথ সচল ও ৩০টি পয়েন্টে বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকার কারণে বন্ধ আছে। বাকি ৭টি পয়েন্টে কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ আছে।

কিন্তু দেশ রূপান্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সিলেট নগরে একটি পয়েন্টেও ওয়াই-ফাই সেবা সচল নেই। বিনা মূল্যের এ ওয়াই-ফাইসেবা প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ। এই সেবার জন্য স্থাপিত মূল্যবান যন্ত্রপাতি অকেজো পড়ে আছে। ফের কবে এটা সচল হবে, তাও অনিশ্চিত।

সেবা বন্ধ থাকা প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পটি আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল বাস্তবায়ন করে। পরে তা সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে প্রকল্পটি আবার চালুর জন্য সিটি করপোরেশন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের গণসংযোগ কর্মকর্তা আবদুল আলিম শাহ দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এটি সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু এর খরচ কীভাবে চলবে, সে ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। তাই টাকার অভাবে ওয়াই-ফাই সেবা বন্ধ রয়েছে।

 এ প্রসঙ্গে আইএমইডি সুপারিশ করে বলেছে, ১২৬টি ফ্রি ওয়াই-ফাই এক্সেস পয়েন্ট সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে সচল রাখা ও নিবিড় তদারকি করতে হবে। আর ১১০টি আইপি ক্যামেরা সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অর্থায়নে সচল রাখতে হবে।

সিলেট সিটি করপোরেশনসূত্র জানায়, ডিজিটাল সিলেট সিটি প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালের মার্চে নগরে বিনা মূল্যে পাবলিক ওয়াই-ফাই জোন, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সংবলিত আইপি ক্যামেরা স্থাপন ও অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা হয়। এই প্রকল্পে ব্যয় হয় ৩০ কোটি টাকা।

প্রকল্পটি হস্তান্তরের পরও ফের কেন মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে সিকিউরিটি অপারেশন ম্যানেজার ও প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মহিদুর রহমান খান সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পটি হস্তান্তর করেছি আড়াই বছর হবে। কিন্তু প্রকল্পের কাজ চলা অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের অটোমেশন ব্যবস্থা চালু করার কম্পোন্যান্ট যোগ হয়। শুধু সেই কাজের জন্য ২০২৪ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।

হস্তান্তরের আড়াই বছরের মাথায় সব ওয়াই-ফাই ও আইপি ক্যামেরাগুলো বন্ধ কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে মহিদুর রহমান বলেন, ‘আমরা হস্তান্তরের পরও দেড় বছর পর্যন্ত ওয়াই-ফাই ও ক্যামেরাগুলো ঠিক ছিল। কিন্তু হস্তান্তরের পর তারা যদি মেইনটেন্যান্স না করতে পারেন, তাহলে তো নষ্ট হবেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাস্তা সংস্কার হয়েছে, অপটিক্যাল ফাইবারগুলো কাটা পড়ার কারণে ক্যামেরা ও ওয়াই-ফাইয়ের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তারাও এগুলো সচল রাখার কাজ করছেন বলে জেনেছি।’

ওয়াই-ফাই জোন চালুর পর নগরের ৬২ এলাকার ১২৬টি পয়েন্ট থেকে বিনা মূল্যে ইন্টারনেট সেবা পেতেন নগরবাসী। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ ইউজার নেম ও ‘জয় বাংলা’ পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে নগরবাসী ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে পারতেন। তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের কাছে এই প্রকল্প হস্তান্তরের পর থেকেই বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাইসেবা বন্ধ হয়ে যায়।

এই প্রকল্পের আওতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে অটোমেশন ব্যবস্থা চালু করা। প্রকল্পটি পর্যবেক্ষণের পর আইএমইডি মতামতে বলেছে, ওসমানী মেডিকেল অটোমেশনের কাজ অনেক পিছিয়ে আছে। দ্রুত এমওইউ সম্পন্নের কথা বলা হয় ওই সুপারিশে।

 জবাবে বিসিসি জানিয়েছে, দুই দফায় আইসিটি থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ওসমানী মেডিকেল কলেজে তাগিদপত্র পাঠানো হলেও তারা সাড়া দেয়নি। অন্য এক মতামতের জবাবে বিসিসি জানিয়েছে, সিলেট ওসমানী মেডিকেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় চুক্তি অনুযায়ী ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজ বুঝে নেওয়ার জন্য প্রকল্পের মনোনীত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ১৩ জন শিক্ষকের একটি দল সেখানে কর্মরত আছে।

সিলেট সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, আর্থিক সমস্যার কারণে তারা বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সেবা দিতে পারছে না। ‘ডিজিটাল সিলেট সিটি’ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল নগরে বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু করে ২০২০ সালে। নগরের ৬২ এলাকায় ১২৬টি পয়েন্টে ওয়াই-ফাই জোন স্থাপন করা হয়।

ওই সময় ডিজিটাল সিলেট প্রকল্পের সহকারী পরিচালক মধুসূদন চন্দ জানিয়েছিলেন, প্রতিটি এক্সেস পয়েন্টে একসঙ্গে অন্তত ৫০০ জন বিনা মূল্যে ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে পারবেন। এর মধ্যে ১০০ জন উচ্চগতির ইন্টারনেট পাবেন। প্রতিটি এক্সেস পয়েন্টের চারদিকে ১০০ মিটার এলাকায় ব্যান্ডউইথ থাকবে প্রতি সেকেন্ডে ১০ মেগাবাইট।

অবশ্য শুরু থেকেই ইন্টারনেটের মন্থর গতি নিয়ে অভিযোগ ছিল ব্যবহারকারীদের। তবে গতি ধীর হলেও প্রায় সব এলাকা থেকে ওয়াই-ফাই সুবিধা মিলছিল। ২০২১ সালের ২১ মার্চ এই প্রকল্পের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিলেট সিটি করপোরেশনকে। প্রকল্পটির খরচ কীভাবে চলবে, এ ব্যাপারে স্পষ্টতা না থাকায় সিটি করপোরেশন প্রথমে প্রকল্পটি নিতে চায়নি। পরে এ ব্যাপারে কয়েক দফা আলোচনা করে শেষ পর্যন্ত সিটি করপোরেশন তা গ্রহণ করে। সিটি করপোরেশন প্রকল্প বুঝে নেওয়ার পর কয়েক মাস ওয়াই-ফাইসেবা চালু ছিল। এরপর তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। নগরে এখন ইউজার নেম ও পাসওয়ার্ড লিখে ওয়াই-ফাই কানেক্ট হওয়া গেলেও ইন্টারনেট ডিজেবলড দেখায়।