সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

বিদেশিদের কাছে ধরনার অভ্যাস ছাড়তে হবে

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘বাংলাদেশে ঔপনিবেশিকতার কারণে এখনো আমরা বিদেশি কিছু হলে পছন্দ করি। সেই কারণে আমরা বিদেশিদের কাছে ধরনা দিই। এই অভ্যাস থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’ 

গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না’ ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। 

ড. মোমেন গণমাধ্যমকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনারাও ওকে (পিটার হাস) জোর করে বলান। সে (পিটার হাস) বাধ্য হয় উত্তর দিতে। আপনারা বিদেশের কাছে ধরনা না দিলেই ভালো। আপনারা আমাদের কাছে আসেন। তাদের কাছে যান বলেই তো তারা বক্তব্য দেয়।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ গণতন্ত্রের নেতা। ভারতবর্ষে আমরা ষষ্ঠ শতাব্দীতে গণতন্ত্র চালু করেছি। ১৯৭১ সালে গণতন্ত্রের জন্য রক্ত দিয়েছি, ৩০ লাখ লোক প্রাণ দিয়েছে। পৃথিবীর কোথাও দিয়েছে? আমরা এ দেশে সংগ্রাম করেছি, যখন মানুষের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। যখন মানুষের গণতন্ত্রের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে।’ 

আব্দুল মোমেন বলেন, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়, বাংলাদেশে গণহত্যার সময় কোথায় ছিল যুক্তরাষ্ট্র? আমাদের অন্যরা কী শেখাবে? আমরা ফিলিস্তিনের বিষয়ে সোচ্চার। আমরা কোনো বড় শক্তির দেশ নই, তবে যেখানে অন্যায় হয়, সেখানে আমরা সোচ্চার।’

তিনি বলেন, ‘যখন এ দেশে গণহত্যা হচ্ছিল, তখন তারা ধারে-কাছেও আসেনি। মিয়ানমারে যখন গণহত্যা হচ্ছিল, তখন ওই লোকগুলোকে কেউ আশ্রয় দেয়নি। আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সীমান্ত খুলে দিয়েছেন। মানবাধিকার রক্ষা করেছেন।’ 

ড. মোমেন বলেন, ‘আমাদের সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন করার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ঘিরে একজন নাগরিকের মৃত্যু যেন না হয়, আমরা সেই চেষ্টা করছি।’ এ প্রসঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, ‘ওদের দেশে কত লোক মারা যায়? আমাদের দেশেও মরে, তবে সংখ্যাটা কম। আর যেন না মরে, আমরা সেই চেষ্টা করছি।’

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা তাদের (যুক্তরাষ্ট্রকে) জিজ্ঞেস করেন, তাদের দেশে এত অল্প লোক কেন ভোট দেয়। তারা (যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা) আপনাদের গণতন্ত্র পছন্দ করে না। ২৩ থেকে ২৭ শতাংশ ভোটার ভোট দেয়। আমার এখানে তো ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ লোক ভোট দেয়।’

সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ব্রুনাইয়ের সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়াহ্ মুইজ্জাদ্দিন ওয়াদ্দৌলাহ্ তিন দিনের সফরে ১৫ অক্টোবর ঢাকায় আসছেন। এটি হবে তার প্রথম বাংলাদেশ সফর। এই সফরে ৫টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।’

ব্রুনাইয়ের সুলতানের সফরে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি উড়োজাহাজ চলাচল, দেশটিতে বাংলাদেশের কর্মী নিয়োগ, সমুদ্রগামী জাহাজে কর্র্মরত নাবিকদের সনদ দেওয়া প্রভৃতি বিষয়ে ৫টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।

আব্দুল মোমেন বলেন, ‘জ¦ালানি আমদানির বিষয়ে ব্রুনাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করছি। আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। প্রায় ২০-২৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী বর্তমানে ব্রুনাইয়ে কাজ করছেন।’

জানা গেছে, ব্রুনাইয়ের সুলতান রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। তার সম্মানে রাষ্ট্রপতির দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকও করবেন সুলতান।

এদিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ নিয়ে জাতিসংঘে আলোচনা হচ্ছে। মঙ্গলবার রাতে রাশিয়ার নিন্দা জানিয়ে একটি প্রস্তাব নিউইয়র্কে জাতিসংঘে ভোট দেওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। এই ভোটের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমরা ভোটে বিরত থাকব কি না, সেটি আমি বলব না।’ নিজেদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন পর্যন্ত আমরা ভোট বিচক্ষণতার সঙ্গেই দিয়েছি। ভোট হলে আমরা বিচক্ষণ বিবেচনা থেকেই দেব।’