রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা নদীগুলো পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (ছত্র বিনিয়োগ কর্মসূচি তথা ইউআইপি) প্রণয়নের জন্য কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।
‘ছত্র বিনিয়োগ কর্মসূচি’ (umbrella investment program--UIP) প্রণয়নের জন্য এই সহায়তা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটি। তারা বলছে, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে এবং বিনিয়োগকে ফলপ্রদ করতে সরকার ইউআইপিকে কার্যকরী হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) মাধ্যমে জমা দেওয়া প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব কথা বলা হয়েছে। ওই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই তারা কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে। গত বুধবার সংস্থাটির বার্ষিক সভা থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
এই বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারপাশের নদীগুলোর পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়ানোর এই প্রচেষ্টায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) নেতৃত্বে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কারিগরি সহায়তার কাজে জড়িত রয়েছে।
বিশ্বব্যাংক প্রয়োজনীয় অর্থ-সম্পদের জোগান দিচ্ছে। ‘ইউআইপি ঢাকা রিভারস’ নামের এই প্রোগ্রামের বিশ্লেষণী কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য তারা একটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক গ্রুপকে নিয়োজিত করেছে। তাদের মতে, বাংলাদেশ সরকারের স্টেকহোল্ডাদের নানা উদ্যোগকে সমন্বিত করা এবং পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ তৈরির কাজে এই কারিগরি সহায়তা (টিএ) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
টিএ কার্যক্রম শুরু হয়েছে চলতি বছরের মার্চে। এটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০২৩ সালের মার্চে। এই পর্যন্ত ২১টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে ৫১টি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা এবং পরামর্শকদের কাছ থেকে নদী পুনরুদ্ধার, প্রাসঙ্গিক নগর পরিষেবা সম্পর্কিত পরিকল্পনা এবং প্রকল্পবিষয়ক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
চলতি বছরের আগস্টে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়েছে এবং ফোকাল পারসনদের নিয়ে পাঁচটি টেকনিক্যাল মিটিং হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে টিএ-১ প্রতিবেদন (যাতে বেইজলাইন অ্যাসেসমেন্টের সারাংশ, ডেটা কালেকশন এবং পরামর্শমূলক সভাসমূহের মূল বিষয় সংযুক্ত করা হয়েছে) ইআরডি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে মূল্যায়নের জন্য দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের ৩-৪ অক্টোবর একটি টেকনিক্যাল ওয়ার্কশপ এবং সরকারি সংস্থাগুলোর উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব কর্মশালা ও বৈঠকে ইউআইপি ঢাকা রিভারসের বাস্তবিক ভিত্তি, মেথডলজি ফ্রেমওয়ার্ক, ইউআইপি ঢাকা রিভারস প্রণয়নবিষয়ক প্রশাসনিক বিধিব্যবস্থা এবং পরবর্তী পদক্ষেপ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। টিএ-২ প্রতিবেদন (যাতে মেথডলজির প্রায়োরিটাইজেশন (অগ্রাধিকারকরণ) এবং সমাধানবিষয়ক দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে) অক্টোবরের মাঝামঝি নাগাদ পাওয়া যাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদী পুনরুদ্ধার জটিল একটি কাজ। সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার জন্য সামগ্রিক কৌশল এবং কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করা দরকার। কার্যকরভাবে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে ফোকাস ঠিক করে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর প্রয়াসকে একত্রিত করতে হবে।
কারিগরি সহায়তার উদ্দেশ্য হলো ঢাকার নদী পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ কর্মসূচি (ইউআইপি) চূড়ান্ত করা; তথ্যসংগ্রহ করা, স্টেকহোল্ডারদের পরামর্শ নেওয়া, প্রাতিষ্ঠানিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেওয়া, আইনি-কাঠামোর পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন, বিদ্যমান প্রাসঙ্গিক পরিকল্পনা ও প্রকল্প খতিয়ে দেখা; ঢাকার নদীবিষয়ক পরিকল্পনার অবস্থা সার্বিকভাবে বিবেচনা করে দেখা এবং সেসবের হালনাগাদকরণ। সংশ্লিষ্ট ও নেতৃস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান কার্যক্রম একত্রিত করতে ভূমিকা রাখছে কারিগরি সহায়তা (টিএ) কার্যক্রম।
বিশ্বব্যাংকে জমা দেওয়া প্রস্তাবে বাংলাদেশ বলেছে, নদী পুনরুদ্ধারে অনেক খাত এবং অংশীজন (স্টেকহোল্ডার) জড়িত। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা, পদ্ধতি প্রয়োজন। ঢাকা নদী মহাপরিকল্পনার (২০১৯) একটি ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে ঢাকার নদী পুনরুদ্ধারের জন্য সামগ্রিক, অবিচ্ছিন্ন এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অভাব রয়েছে।
ঢাকার চারপাশে চারটি নদী (বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ) রয়েছে। একসময় এসব নদী ও খাল মিলে ঢাকা ছিল অপরূপা এক নগরী। অনেক খাল এখন নেই। যেগুলো আছে সেগুলোও এখন ভাগাড়। নদীগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। দখলে-দূষণে বেহাল। মাঝেমধ্যেই দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার সেগুলো দখল হয়ে যায়।