ঢাকার নদী পুনরুদ্ধার প্রসঙ্গে

ঢাকার ইতিহাস ঢাকা পড়ে গেছে। ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা পড়েছে ঢাকার ভূগোলও। প্রাকৃতিকভাবে পাঁচটি বড় নদ-নদী ঘিরে রয়েছে রাজধানী ঢাকাকে। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, টঙ্গী ও তুরাগ। অবশ্য বালু থেকে তুরাগ পর্যন্ত প্রবাহটিকে এখন অনেকে টঙ্গী খাল, অনেকে তুরাগ হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। এ ছাড়া বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার মধ্যবর্তী সংযোগের সঙ্গে মিশেছে ধলেশ^রীও। একসময় এই নদীগুলোর সঙ্গে যুক্ত শতাধিক খাল পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ঢাকার ভেতর জালের মতো ছড়িয়ে ছিল। নদী ও খালের শহর ঢাকার এই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন জগদ্বিখ্যাত নগর পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেড্ডেস। একশ পাঁচ বছর আগে নগর ঢাকার প্রথম মহাপরিকল্পনা‘ঢাকার নগর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রতিবেদন-১৯১৭’ প্রণয়ন করেছিলেন তিনি। ঢাকার সার্বিক নগর পরিকল্পনার সেই প্রথম প্রয়াসেই তিনি বলেছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশের নদী ও জলপথকেন্দ্রিক নগরের এক উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত ঢাকা। এই নগরকে সচল রাখতে নদী ও খালের এই জালকে সংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু শত বছরেও সে কথায় আমরা কর্ণপাত করিনি। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। ঢাকার চারপাশের প্রাকৃতিক বৃত্তাকার নৌপথ যেমন অচল হয়ে পড়েছে, তেমনি একদা নদী-খালের এই নগর এখন একটু বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতায় অচল হয়ে যায়। অন্যদিকে ঢাকার ভেতরের বেশিরভাগ খাল যেমন বেদখল হয়ে গেছে, তেমনি চারপাশের নদীগুলো দখল-দূষণে মৃতপ্রায়। 

এটা অনুধাবন করা জরুরি যে, স্থানীয় ভূগোল এবং পরিবেশ-প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান না করে অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই আজ ঢাকা মহানগরে এমন সংকট তৈরি হয়েছে। নদী ও খালের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যকে কাজে লাগাতে ঢাকার ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়া খাল-জলাশয়গুলোকে পুনরুদ্ধার করে সেগুলোকে চারপাশের নদীগুলোর সঙ্গে যুক্ত করা হলে জলাবদ্ধতা থাকবে না। এটা বাস্তবায়ন করা গেলে ঢাকার ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় অন্তত কোথাকার জল কোথায় গড়াবে সেই সাধারণ জ্ঞানেরও অভাব দেখা যাবে না। তবে এ বিষয়ে কথা যত হয়েছে কাজ তত হয়নি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে, উচ্চ আদালতের রায়ে বিশ্বের চতুর্থ দেশ হিসেবে কোনো নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ বা ‘আইনি সত্তা’ ঘোষণার মর্যাদা দেওয়ার মধ্য দিয়ে। ওই রায়ে তুরাগ নদকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার পাশাপাশি দেশের সব নদ-নদীকে মিলিয়ে এই বদ্বীপের পুরো নদীব্যবস্থাকে একটি ‘একীভূত সত্তা’ উল্লেখ করা সত্যিই যুগান্তকারী ঘটনা। এর অর্থ দেশের সব নদ-নদী-খাল-বিল-জলাশয় পরস্পর সম্পৃক্ত বা একীভূত সত্তা হিসেবে সাংবিধানিক অধিকার ও মর্যাদা পাবে। পাশাপাশি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেশের সব নদ-নদীর অভিভাবক ঘোষণা করা হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ে। নদ-নদী তথা পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় এ রায় যেমন একটি আইনগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে, তেমনি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে এর আদর্শিক তাৎপর্যও ব্যাপক। বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল-জলাশয় দখল ও দূষণমুক্ত করতে কমিশন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যে রাজধানী ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, টঙ্গী ও তুরাগ নদ দখলমুক্ত করতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান উল্লেখযোগ্য। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন জানিয়েছে, সারা দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে অবৈধভাবে দখল করে রাখা ৪৯ হাজার ১৬২ দখলদারের তালিকা তৈরি করে কমিশন তাদের উচ্ছেদের চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, এক্ষেত্রেও বড় ধরনের অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মাধ্যমে এক প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে থাকা নদীগুলো পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম বা ‘ছত্র বিনিয়োগ কর্মসূচি’ তথা ‘ইউআইপি’ প্রণয়নের জন্য বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহায়তা দেওয়ার খবর আশাব্যঞ্জক বটে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে এবং বিনিয়োগকে ফলপ্রদ করতে সরকার ইউআইপিকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগাতে পারবে। ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়ানোর এই প্রচেষ্টায় সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) নেতৃত্বে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কারিগরি সহায়তার কাজে জড়িত রয়েছে। আমরা আশা করব, এ সংক্রান্ত প্রচেষ্টায় সরকার যথাযথ ভৌগোলিক সমীক্ষার পাশাপাশি নদীর সীমানা নির্ধারণ এবং ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথ সচল করার জন্য কম উচ্চতার সেতু ও নাব্য সংকটসহ সব কাঠামোগত বাধা অপসারণে কঠোর অবস্থান নেবে। একইভাবে স্পারসোর স্যাটেলাইট সার্ভের মাধ্যমে কেবল ঢাকা নয় দেশের নদ-নদীগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান নির্ধারণ এবং সে-সংক্রান্ত ডিজিটাল ডেটাবেইজ জেলা-উপজেলা-পৌরসভা-ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশ দ্রুত কার্যকর করা হোক। নদ-নদী-জলাশয়ের সুরক্ষা কেবল পরিবেশ-প্রতিবেশ নয়, সংস্কৃতি ও নাগরিকদের উন্নততর জীবনমানের জন্য অপরিহার্য।