অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আহরণে ছন্দপতন

চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রাজস্ব আদায়ে ভালো প্রবৃদ্ধি থাকলেও তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে তা গতি হারিয়েছে। ফলে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। 

চলতি প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৬৫ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি। যেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ শতাংশ। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। 

এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূলত বিলাস পণ্যের আমদানি নিরুৎসাহিত করার পর থেকেই রাজস্ব আয় কমতে শুরু করেছে। এ ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষ কেনাকাটা কমিয়েছে। ফলে রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় খাত ভ্যাট থেকে উল্লেখযোগ্য আয় আসেনি। বতর্মানে দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে। গত আগস্টে সেটি ৯ দশমিক ৫২ শতাংশে পৌঁছেছিল।

এনবিআরের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে জুলাই-আগস্টে রাজস্ব আয় আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২৩ শতাংশ বাড়তে দেখা গেছে; সেখানে সেপ্টেম্বর শেষে অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সেই প্রবৃদ্ধি কমে ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অবশ্য দেশের রাজস্ব আদায়ের এ হিসাব সাময়িক বলে জানিয়েছেন রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা। চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ হবে আরও পরে।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে মোট রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা। 

সাময়িক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৬৫ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৫৮ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। ফলে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব আয় বেড়েছে বা প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, অভ্যন্তরীণ বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আহরণে প্রভাব পড়েছে। এ কারণে সামগ্রিকভাবে আলোচ্য অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আহরণে ছন্দপতন হয়েছে। এ ছাড়া আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে আমদানির পরিমাণ কমায় রাজস্ব আহরণে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, এবার রাজস্ব আয়ে যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে তা অর্জন করতে হলে আদায় বাড়াতে হবে কমপক্ষে ৩১ শতাংশ। যদিও এই লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত ‘উচ্চাভিলাষী’ বলে মনে করেন তারা। 

সরকার বাজেট বাস্তবায়নে যে অর্থায়ন করে তার ৮৫ থেকে ৮৬ শতাংশ জোগান দেয় এনবিআর। যে কারণে রাজস্ব আয় ভালো হলে সরকারকে ব্যাংক থেকে কম ঋণ নিতে হয়। 

আমদানি, ভ্যাট ও আয়কর- এই তিন উৎস থেকে রাজস্ব আহরণ করে এনবিআর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান ভ্যাটে। মোট আদায়ের ৩৯ শতাংশ আসে ভ্যাট থেকে। আয়কর থেকে আসে ৩৭ শতাংশ। বাকি রাজস্ব আসে আমদানি শুল্ক থেকে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি শুল্ক খাতে আদায় হয় ২২ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের এই সময়ে আদায় হয়েছিল ১৯ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা। এ হিসাবে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে অভ্যন্তরীণ রাজস্বের অন্যতম উৎস ভ্যাট আদায় হয়েছে ২৩ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এই সময়ে আদায় হয় ২১ হাজার ১৫ কোটি টাকা। ভ্যাটে এই সময়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ সম্পদের আরেকটি উৎস আয়কর আদায় হয়েছে ২০ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময় আদায় হয়েছিল ১৮ হাজার ৭ কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধি হয়েছে সাড়ে ১১ শতাংশ।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে মোট রাজস্ব আহরণ হয় ৬৫ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, যা পুরো বছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার ৮ শতাংশ। গত ২০২১-২২ অর্থবছরের পুরো সময়ে সব মিলিয়ে ২ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছিল এনবিআর।