গণপরিবহনে নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে রাজধানীতে নানা সময় অভিযান পরিচালনা করেও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো যায়নি। দিনের পর দিন বেড়েই চলছে ভাড়া নিয়ে যাত্রী হয়রানি। সাধারণ যাত্রীদের একদিকে যেমন বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে, একইভাবে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে নানা রকম ঝামেলায় জড়াতে হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সড়কে যে কোনো ঘটনায় মুখোমুখি অবস্থানে চলে যাচ্ছেন সাধারণ যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিক। অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে ভাড়া নিয়ে বচসা একপর্যায়ে যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিক মারামারি-হাতাহাতিতে রূপ নিচ্ছে। এসব ঘটনায় মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। সড়কে যাত্রী সাধারণের সঙ্গে এ ধরনের যে কোনো ঘটনার পর রাগ ক্ষোভ গিয়ে পড়ে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর।
সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘ভাড়ার তর্ক গড়ায় মৃত্যুতে’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত তিন বছরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বাস থেকে যাত্রীদের ফেলে ১৫ জনকে হত্যার খবর আসে গণমাধ্যমে। সর্বশেষ গত শনিবারও রাজধানীর দক্ষিণ যাত্রাবাড়ীতে চলন্ত বাস থেকে ফেলে আবু সায়েম মুরাদ (৩৫) নামে এক যুবককে হত্যার অভিযোগ করেছে তার পরিবার। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ জনবহুল এ মহানগরে প্রায় পৌনে দুই কোটি মানুষের জন্য গণপরিবহনের সংখ্যা যেমন অপ্রতুল তেমনি ঝামেলাপূর্ণ এসব পরিবহনের ব্যবস্থাপনা। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো ঢাকার সড়কগুলোতে সীমাহীন যানজট আর বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কথা বলাই বাহুল্য। এ বাস্তবতায় সড়কে যাত্রী সাধারণ ও পরিবহন শ্রমিকদের পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে মালিকপক্ষ এবং ওপর মহলের ফায়দা লোটা যেমন বন্ধ হচ্ছে না, তেমনি গণপরিবহনের অরাজক পরিস্থিতিতে সাধারণের ভোগান্তিও কমছে না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ঢাকায় একই রুটে বিভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল এবং টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলার নিয়ম বাধ্যতামূলক না করা। রাজধানী ঢাকার প্রায় কোনো বাস সার্ভিসেই এখন টিকিট দেখে যাত্রী তোলাও হয় না কিংবা বাসেও ভাড়া নিয়ে কোনো টিকিট দেওয়া হয় না। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আলাদা আলাদা কোম্পানির অনেক মালিকনির্ভর এই গণপরিবহন ব্যবস্থাই এমন বিশৃঙ্খলার অন্যতম প্রধান কারণ। দ্বিতীয় বড় কারণটি হলো, ড্রাইভার-হেলপারের কাছে দৈনিক চুক্তির ভিত্তিতে বাস পরিচালনা করা। এই কারণে ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানির বাস যেমন পরস্পরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চালায় তেমনি একই কোম্পানির আলাদা আলাদা বাসও পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। এছাড়া যাত্রী সাধারণের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের আচরণগত সমস্যা সমাধানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ কথাও সত্যি যে মালিক পক্ষের সঙ্গে চুক্তি ও বেঁধে দেওয়া টার্গেট পূরণ ও নিজেদের মজুরি উঠিয়ে নেওয়ার জন্য বাসের চালক-হেলপাররা বেপরোয়া থাকে। যার প্রভাব পড়ে যাত্রীদের সঙ্গে তাদের আচরণে। অন্যদিকে কিছ কিছুু যাত্রীর অসহিষ্ণু আচরণও দায়ী। আবার যাত্রীদের অনেকে নির্দিষ্ট স্টপেজে নামতে না চেয়ে সড়কের যে কোনো স্থানে নামিয়ে দিতে বলেন। তাদের অনুরোধ না রাখলে হেলপার-চালকদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন। ফলে চালকরা নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া সড়কের যেখানে-সেখানে বাস থামাতে বাধ্য হন। এতে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। তবে চলন্ত বাস থেকে কোনো যাত্রীকে ফেলে দেওয়া মানা যায় না।
সংকট মূলত ভাড়া নিয়ে। সরকার যে ভাড়ার কথা বলে, সেগুলো তো পরিবহন শ্রমিকরা মানতে চায় না। ইচ্ছেমতোই চলে ভাড়া আদায়। পরিবহন খাত দেশের অর্থনীতির রক্তপ্রবাহের মতো। এখানে মালিক, সরকার, প্রশাসন ও চাঁদাবাজসহ বেশ কয়েকটি পক্ষ জড়িত। কিন্তু এই খাতের সব অব্যবস্থাপনার দায়ভার যেমন শ্রমিকদের বইতে হয় তেমনি এ খাতের বঞ্চনার সবচেয়ে বড় শিকারও এখানকার শ্রমিকরাই। ফলে অনেক সময় একজন শ্রমিক ভালোভাবে প্রশিক্ষণ পায় না বাসে যাত্রীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করা উচিত। তাই শ্রমিকদের এসব বিষয় নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। তা ছাড়া নিয়োগপত্র, কর্মঘণ্টা নির্ধারণ এবং বেতনভুক্ত না করলে শ্রমিকদের আচরণের কোনো পরিবর্তন হবে না। তাই মালিকদের উচিত, এসব বিষয়ের দিকে নজর দেওয়া। আর সড়কে বিআরটিএর কঠোর মনিটারিং দরকার। সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, পরিবহন শ্রমিকদের এই সংকট পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই সংকট কাটিয়ে উঠতে নগর-মহানগরগুলোতে সব কোম্পানির পরিবহনকে একটা একক পরিচালনা ব্যবস্থায় আনতে হবে।