গভীর সংকটের কালে ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী কে এই ঋষি সুনাক

একাধিক রেকর্ড গড়ে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হলেন ঋষি সুনাক। প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত, অশ্বেতাঙ্গ, এশীয়, প্রথম হিন্দু নেতা, ১৮১২ সালের পর সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী এবং সবচেয়ে অল্প সময়ে প্রধানমন্ত্রী পদে পৌঁছানোর রেকর্ড গড়েছেন তিনি।

২০১৫ সালে প্রথম এমপি হওয়া দিয়ে শুরু। তারপর মাত্র সাত বছরেই ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা এবং একইসঙ্গে নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে ব্রিটেনের রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছেন ঋষি সুনাক। ইতিহাসের পাতায় একঝাঁক রেকর্ড গড়ে অনেক প্রথমের জন্ম দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতার শীর্ষ পদে বসলেন তিনি।

সুনাক এই প্রথম যুক্তরাজ্যে একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসীর সন্তান, একজন অশ্বেতাঙ্গ, এশীয় এবং প্রথম হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতা হিসাবে দেশ চালাবেন। এখানেই শেষ নয়, গত ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে মাত্র ৪২ বছর বয়সে প্রথম যুক্তরাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীও হচ্ছেন তিনি।

দেশটির রাজনীতির ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ে ২০১০ সালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের চেয়েও ছোট সুনাক। ২০১০ সালে ক্যামেরন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় তার বয়স ছিল ৪৩। আর এর আগে ১৮১২ সালে সর্বকনিষ্ঠ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন টোরি দলের রবার্ট জেনকিনসন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় সদ্য ৪২ এ পা দিয়েছিলেন তিনি।

বয়সের রেকর্ড ছাড়াও আধুনিক যুগে প্রথমবার এমপি হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে দ্রুত প্রধানমন্ত্রী পদে পৌঁছানোর রেকর্ড গড়েছেন সুনাক। রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছ থেকে সরকার গঠনের প্রথম আমন্ত্রণও পেতে চলেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত এ নেতা।

অর্থাৎ, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ-পরবর্তী যুগে শপথ নেওয়া প্রথম ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হবেন ঋষি সুনাক। যুক্তরাজ্যে গত সাধারণ নির্বাচনের পর থেকে বরিস জনসন এবং লিজ ট্রাসের পর সুনাক হচ্ছেন তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী। ইতিহাস সৃষ্টি করে একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবেও ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করছেন তিনি।

 

জন্ম ও পড়াশোনা

যুক্তরাজ্যের সাউদাম্পটনে চিকিৎসক বাবা যশবীর সুনাক এবং ফার্মাসিস্ট মা উষা সুনাকের ঘরে ১৯৮০ সালের ১২ মে জন্ম গ্রহণ করেন ঋষি সুনাক। ভারতে যখন ব্রিটিশ শাসন চলছে ওই সময়ে (১৯৩৫ সালে) ঋষির দাদা রামদাস সুনাক উন্নত জীবনের আশায় ভারতীয় উপমহাদেশের পাঞ্জাবের গুজরানওয়ালা (বর্তমানের পাকিস্তানের অংশ) থেকে পরিবার নিয়ে পশ্চিম আফ্রিকার নাইরোবিতে চলে যান। ঋষির বাবা যশবীরের জন্ম কেনিয়ায় এবং মা উষার জন্ম তানজানিয়ায়। ঋষির দাদা পুরো পরিবার নিয়ে ১৯৬০ সালে যুক্তরাজ্যে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

ছোটবেলা থেকেই মেধাবী সুনাকের আনুষ্ঠানিক পড়াশোনার শুরু হয় বেসরকারি উইনচেস্টার কলেজিয়েট স্কুল থেকে। এরপর উইনচেস্টার কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করেন। তারপর তিনি ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি দর্শন ও অর্থনীতি নিয়ে লেখাপড়া করেন। তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ফুলব্রাইট স্কলার ছিলেন, যেখান থেকে তিনি এমবিএ শেষ করেন।

স্নাতক শেষ করে ঋষি সুনাক ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত আর্থিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাক্সের বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি পরবর্তী সময়ে দুটি হেজ ফান্ডের অংশীদার হন এবং নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। রাজনীতিতে আসার আগে ঋষি একটি বিলিয়ন পাউন্ডের গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই কোম্পানি যুক্তরাজ্যে ক্ষুদ্র ব্যবসায় বিনিয়োগে সহায়তা করতো।

সুনাকের আরও একটি পরিচয় হলো, তিনি ভারতের বিখ্যাত শিল্পপতি ও তথ্য প্রযুক্তি খাতের বৃহৎ কোম্পানি ইনফোসিসের সহ প্রতিষ্ঠাতা ধনকুবের নারায়ণ মূর্তির মেয়ের জামাই। অক্ষতা মূর্তির সঙ্গে ২০০৯ সালে বিয়ে হয় ঋষির। নারায়ণমূর্তির মেয়ে অক্ষতার সঙ্গে তার আলাপ স্ট্যানফোর্ডে এমবিএ পড়াকালেই। পরে তাকে বিয়ে করেন এবং তাদের দুই কন্যাসন্তানও রয়েছে।

ধনী স্ত্রীর কারণে ঋষিকে বার বার সামালোচিত হতে হয়েছে। বিশেষ করে তার স্ত্রীর কর ফাঁকি সংক্রান্ত কাণ্ডের কারণে। অক্ষতা ভারতীয় নাগরিক হওয়ায় যুক্তরাজ্যের বাসিন্দা হিসেবে তার পুরো আয়ের উপর কর দিত বাধ্য ছিলেন না। তিনি শুধু যুক্তরাজ্য থেকে যে আয় করেছেন সেটার উপর কর দেন। অথচ, ৪২ বছর বয়সী অক্ষতা মূর্তি যুক্তরাজ্যের শীর্ষ ধনীদের একজন। সানডে টাইমস রিচ লিস্ট ম্যাগাজিনের এক খবরে দাবি করা হয়েছিল, অক্ষতার সম্পদের পরিমাণ প্রয়াত ব্রিটিশ রানি দ্বীতিয় এলিজাবেথের চেয়েও বেশি। ২০২১ সালে সানডে টাইমসের ধনীদের তালিকা অনুসারে তার স্ত্রীর ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড। বর্তমানে মাত্র ৪২ বছর বয়সী সুনাককেও যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ধনী এমপি বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু তার সম্পদের পরিমাণ ঠিক কত, সে ব্যাপারে প্রকাশ্যে কখনো কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। গত মে মাসে তিনি ব্রিটেনের ২২তম ধনীর তালিকায় ছিলেন। ওয়েস্টমিনস্টারের প্রথম কোটিপতি দম্পতি তারা।

 

রাজনীতিতে ঋষি সুনাক

ঋষি সুনাক ২০১৫ সালে ইয়র্কশায়ারের রিচমন্ড আসন থেকে কনজারভেটিভ প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়ে প্রথমবারের মত পার্লামেন্ট সদস্য হন। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি পরিবেশ, খাদ্য এবং গ্রামীণ বিষয়ক নির্বাচন কমিটির সদস্য ছিলেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছেদের প্রশ্নে ২০১৬ সালের গণভোটে তিনি ‘ব্রেক্সিটের’ পক্ষে ছিলেন এবং বরিস জনসনের নেতৃত্বে যে দলটি ব্রেক্সিটের পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল তিনি তার সদস্যও ছিলেন।

২০১৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে সুনাক তার আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে সরকারের মন্ত্রিসভার স্থানীয় সরকারবিষয়ক উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা নির্বাচনে তিনি বরিস জনসনকে সমর্থন করেছিলেন। ওই বছর ২৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী জনসন তাকে চিফ সেক্রেটারি টু দ্য ট্রেজারি (সিএসটি) নিয়োগ দেন। তখন চ্যান্সেলর ছিলেন সাজিদ জাভিদ। পরদিন তিনি প্রিভি কাউন্সিলের সদস্য হন।

২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে আরও বড় ব্যবধানের জয় নিয়ে পুনরায় এমপি হন ঋষি সুনাক। ২০২০ সালে তার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটনা ঘটে। ওই বছর ফেব্রুয়ারিতে জনসনের মন্ত্রিসভার রদবদলে তিনি যুক্তরাজ্যের ‘চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার’ (অর্থমন্ত্রী) হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে যান। বরিস জনসনের আমলে প্রথমে রাজস্ববিষয়ক মন্ত্রী, এরপর অর্থমন্ত্রী হন ঋষি সুনাক।

চ্যান্সেলর ঋষির জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা ছিল ‘পার্টিগেট’ কেলেঙ্কারি। কোভিড-১৯ বিধি লঙ্ঘন করে লকডাউনের মধ্যে সরকারি অফিসে পার্টির আয়োজন করে ওই সময়ের প্রধানমন্ত্রী জনসনের সঙ্গে চ্যান্সেলর ঋষিও ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন। পরে জনসনের পাশাপাশি ঋষি সুনাকও ওই কাণ্ডের জন্য দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান এবং শাস্তি হিসেবে জরিমানা দেন। লকডাউনের মধ্যে পার্টি করার কেলেঙ্কারিই জনসন সরকারের পতনের মূল কারণ বলে বিবেচনা করা হয়।

সুনাক গত জুলাই মাস থেকেই যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে আলোচিত হয়ে উঠেছিলেন। গত ৫ জুলাই হঠাৎ করেই চ্যান্সেলরের (ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী) পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন সুনাক। তার পরপরই ওই সময়ের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভিদের পদত্যাগের ঘোষণা আসে। ব্যক্তিগত নানা কেলেঙ্কারিতে নাজুক অবস্থায় থাকা বরিস জনসনের প্রধানমন্ত্রীত্বে শেষ ধাক্কা হিসেবে দেখা হয় গুরুত্বপূর্ণ ওই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগকে।

কারণ, তাদের পদত্যাগের দুইদিনের মাথায় প্রধানমন্ত্রী জনসন পদত্যাগের ঘোষণা দেন। জনসনের সমর্থকরা তখন সুনাকের বিরুদ্ধে সুযোগ-সন্ধানীর অভিযোগ তুলেছিল। তবে সুনাক এর জবাবে বলেছিলেন, নৈতিক কারণে সে সময়ে তিনি সরে গিয়েছিলেন। বরিস জনসনের পদত্যাগের পর নেতৃত্বের লড়াইয়ে শুরুতে ঋষি সুনাকই এগিয়ে ছিলেন। এমনকী দলের নেতা নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটে তিনিই জিতেছিলেন। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তার জনপ্রিয়তায় ভাটার টান দেখা দেয়।

এর কারণ বিশ্লেষণে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, জনসনের পদত্যাগের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর ঋষি সুনাক একটি ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। যেটির শিরোনাম ছিল ‘ঋষির জন্য প্রস্তুত হও’। প্রাথমিকভাবে ভিডিওটি তার পক্ষে গেলেও সেটির কারণে দলীয় নেতাদের সঙ্গে তার আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়।

সাজিদ জাভিদ, নাদিম জাহাওয়ি ও পেনি মর্ডেন্টের মত ‘হেভিওয়েট’ এমপিদের সমর্থন হারান তিনি। স্ত্রীর অঢেল সম্পদ নিয়ে বিতর্ক, বিলাসবহুল জীবনযাপন, অর্থ বিভাগের অবস্থা, করনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুনাকের ভাবমূর্তি নিয়ে পুরাতন বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়। অনেকে সুনাককে সাধারণ ব্রিটিশদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরের মানুষ বলে মনে করেন।

তবে এর আগে কনজারভেটিভ পার্টিতে তরতরিয়ে উপরে উঠছিলেন সুনাক। ২০২০ সালে তিনি ‘চ্যান্সেলর অব দ্য এক্সচেকার’ অর্থাৎ, অর্থমন্ত্রী হওয়ার পরই যুক্তরাজ্যে শুরু হয় কোভিডের ঢেউ। সুনাক পেশ করেন ‘কোভিড-বাজেট’। প্রথমেই সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ‘ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস’ বা এনএইচএস-র খাতে তিনি প্রায় ব্ল্যাঙ্ক চেক লিখে দেন। কোভিড-মোকাবেলায় যত খরচ লাগে তা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

শুধু স্বাস্থ্য নয়, যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি-কে কোভিড থেকে বাঁচাতে একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। স্বনিযুক্ত কর্মীদের অসুস্থতার সময় সাহায্য করতে ‘এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সাপোর্ট অ্যালাওয়েন্স’ অনুদানের ব্যবস্থা করেছেন। স্কটল্যান্ডের জন্য আলাদা তহবিল বরাদ্দ করেছেন। লকডাউনের কারণে দেশ-বিদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলো ধুঁকছিল। কোভিড মোকাবেলায় সরকারি ঋণ হিসেবে সুনাক তাদের তহবিল সহায়তা দেন। অসংগঠিত ক্ষেত্রে স্বনির্ভর, স্বেচ্ছসেবী কর্মীদের কাছে সরাসরি সাহায্য পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করেছেন তিনি।

এভাবে কোভিড সামালের কাজটি সুনাক ভালভাবেই করেছিলেন। আর সেটি করেই দেশজুড়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন তিনি।

বরিস জনসনের পদত্যাগের পর কনজারভেটিভ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী দৌড়ে তার প্রার্থিতা ঘোষণার সময় সুনাক বলেছিলেন, দেশকে সংকট থেকে বের করে আনা, অর্থনীতিকে ঠিক পথে আনা এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ যে তিনি করতে পারেন তার ট্র্যাক রেকর্ডই সেটি দেখিয়ে দিয়েছে।

 

গভীর সংকটের কালে প্রধানমন্ত্রী

গককাল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে জয়ী হওয়ার পর প্রথম ভাষণে ঋষি সুনাক ‘গভীর অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের’ মুখে ঐক্যের আবেদন জানিয়েছেন। দুই মিনিটেরও কম সময়ের এ সংক্ষিপ্ত ভাষণে সুনাক বলেছেন, তার দল ও যুক্তরাজ্যকে একত্রিত করাই ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’ হবে। আজ মঙ্গলবার (২৫ অক্টোবর) রাজা কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি দায়িত্ব পালন শুরু করবেন।

দেশে গভীর বিভক্তি এবং অর্থনীতিতে মন্দার একটি সময়ে সুনাক প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চলেছেন। এই দুঃসময় তার প্রধানমন্ত্রীত্বের আমলে ছায়া ফেলবে বলেই মনে করা হচ্ছে। সামনে ৩১ অক্টোবরেই প্রকাশ করার কথা রয়েছে একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। এই পরিকল্পনায় যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত করার চেষ্টায় কিছু কঠোর পদক্ষেপও নেওয়া হতে পারে।

সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের স্থলাভিষিক্ত হলেন সুনাক। লিজ ট্রাস ক্ষমতা গ্রহণের পর আরও অশান্ত ও সংকট বাড়ে ব্রিটেনে। এর ফলে মাত্র ৪৫ দিনের মধ্যে তিনি পদত্যাগ করতেন বাধ্য হন। মাত্র সাত সপ্তাহ আগে কনজারভেটিভ দলের নির্বাচনে লিজ ট্রাসের কাছে হারের পর এবার ঋষি জয়ী হয়ে ফিরে এলেন।

ঋষির নির্বাচিত হওয়া আরও যে কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তা হলো যুক্তরাজ্যে কোনো সরকারের পতন ঘটানোর জন্য কাউকে প্রধান অনুঘটক ভাবা হলে তার সেই দলে নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড নেই। বরিস জনসনের বিদায়ের ক্ষেত্রেও দলটির তৃণমূলে বদ্ধমূল ধারণা যে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ঋষির পদত্যাগই তখন সরকারের পতনের সূচনা করেছিল। তৃণমূলে সে ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটার কোনো আলামত মেলে নি।

দলের তৃণমূল এবং বরিস জনসনের ভক্তদের সমর্থন আদায় ও দলকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রশ্নটি ঋষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বরিসের প্রতি আনুগত্যের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী নাদিন ডরিস নির্বাচন থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পরপরই এক টুইটে নতুন নির্বাচন ছাড়া যুক্তরাজ্যের চলমান সংকট থেকে উদ্ধারের যোগ্য নেতৃত্ব মিলবে না বলে মন্তব্য করেন।

কনজারভেটিভ পার্টিতে যারা কর কমানো, ছোট আকারের সরকার এবং সামাজিক সহায়তার পরিমাণ কমানোর পক্ষে তাদের তুষ্ট করাও ঋষির জন্য দুরূহ হবে। কোভিড মহামারির সময়ে সবার জন্য উদারভাবে রাষ্ট্রীয় সহায়তা দেওয়ার যেসব কর্মসূচি তিনি নিয়েছিলেন, দলটির অতি ডানপন্থী অংশটি তাকেই দেশটির মুদ্রাস্ফীতির কারণ হিসেবে দায়ী করে থাকে।

ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বমুখীনতার কারণে জীবনযাপনে যারা অসহায়ত্ব বোধ করছেন, তাঁদের জন্য কোনো বিশেষ সহায়তা দিতে গেলে তিনি দলের মধ্যেই বাধার মুখে পড়বেন। বিপরীতে, তার ব্যক্তিগত ধনসম্পদ, যার পরিমাণ অন্তত ৭৩ কোটি পাউন্ড (ডলারে শতকোটির কাছাকাছি) হওয়ায় তিনি যে সাধারণ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন, বিরোধী দলগুলোর এই অভিযোগ তার জন্য বাড়তি মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। 

মাত্র দুই মাসেরও কম সময়ে তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হতে ঋষি সুনাককে একটি বাক্যও খরচ করতে হয়নি। এবার তিনি দলীয় এমপিদের নিয়ে কোনো নির্বাচনী সভা করেননি, কোনো সংবাদ সম্মলন করেননি, টেলিভিশন-রেডিওতে কোনো সাক্ষাৎকার দেননি, কিংবা কোনো নতুন মেনিফেস্টোও প্রকাশ করেননি। সেপ্টেম্বরের নেতৃত্বের লড়াইয়ের সময়ে তিনি এখনই কর কমানো সম্ভব নয় এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বোঝা কমাতে ও মন্দা এড়াতে কিছু রাষ্ট্রীয় সহায়তার কথা বলেছিলেন। 

বিপরীতে লিজ ট্রাসের কর কমানো ও কথিত প্রবৃদ্ধি পরিকল্পনাকে কল্পনার অর্থনীতি বলে অভিহিত করেছিলেন। লিজ ট্রাসের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা যে সংকট ডেকে এনেছে, পাউন্ডের মূল্য কমে যাওয়া এবং সরকারি-বেসরকারি ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ার পটভূমিতে তাঁর প্রত্যাবর্তন তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঋষি নির্বাচিত হওয়ায় বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা হয়তো তাকে কিছুটা অহংকারীও করতে পারে।

গত চার মাসে যুক্তরাজ্যে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা গেছে, তা এতটাই অস্বাভাবিক যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং ইউরোপীয় নেতারা প্রকাশ্যেই তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) লিজ ট্রাসের করনীতির সমালোচনা করেছিল, যা জি-সেভেনভুক্ত দেশগুলোর জন্য বিরল ও বিব্রতকর। 

যুক্তরাজ্যের বিরোধী দলগুলো এ ধরনের অস্থিরতার পেছনে কনজারভেটিভ পার্টির অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগত লড়াই অভিহিত করে দাবি করেছে যে দেশটির সংকট কাটানোর জন্য শুধু নেতা পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, দরকার নতুন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রতি ম্যান্ডেট।

গত ১২ বছরের ভ্রান্ত নীতির কারণেই অর্থনীতির এ দুর্দশা বলে দাবি করে তারা অবিলম্বে নতুন নির্বাচন দাবি করেছে। অনেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছেদের চুক্তি ব্রেক্সিটকেও এ অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য দায়ী করেছেন এবং ব্রেক্সিটের বিষয়ে নতুন করে আলোচনার দাবি তুলেছেন।