অদম্য প্রতিবাদী আফেন্দি নুরুল ইসলাম

প্ল্যাকার্ড হাতে গুটি গুটি পায়ে প্রখর রোদে জনসমাগমপূর্ণ রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছেন এক বয়োবৃদ্ধ। প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘আমেরিকা ও ন্যাটো অনুগ্রহ করে আগের দুটি বিশ^যুদ্ধের মতো আরেকটি বিশ^যুদ্ধ সৃষ্টি করবেন না’, ‘রাশিয়া ও ইউক্রেনকে তাদের নিজ নিজ স্বার্থে একে অন্যের বিরুদ্ধে নিজেদের যুদ্ধ করতে দিন’, ‘যদি পারেন, তাদের যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করুন। অন্যথায়, কিছু সময় অপেক্ষা করুন। যুদ্ধ আপনা-আপনিই বন্ধ হয়ে যাবে।’ বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা এসব সে্লাগানে একই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তিনি। একক প্রতিবাদী এই ব্যক্তির নাম আফেন্দি নুরুল ইসলাম। এটি তার হিসেবে ৩৪৫তম একক প্রতিবাদ। সেই ১৯৮২ সাল থেকে প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে শুরু করা একক প্রতিবাদ আজও থামাননি তিনি। আফেন্দি নুরুল ইসলাম ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার শহিদ স্মৃতি আদর্শ সরকারি কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ১৯৭৭ সালে যোগদান করে ২০০৮ সালে অবসরে যান। ২০ ও ২১ অক্টোবর প্ল্যাকার্ড হাতে ৩৪৫তম প্রতিবাদের পদযাত্রা সম্পন্ন করেন তিনি।

আফেন্দি জানান, আশির দশকে নান্দাইলের বিভিন্ন এলাকা থেকে গরু চুরির ঘটনা ঘটত। ১৯৮২ সালের কোনো এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০০ গরু চুরি হয়েছিল। তখনকার সময় মানুষ এতটা সচেতন ছিল না। তাই প্রতিবাদ করারও তেমন সাহস পেত না। সেই সময় তিনি গরু চুরি বন্ধে মানুষকে সচেতন করাসহ প্রশাসনিক তৎপরতা বৃদ্ধির দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে একক প্রতিবাদ শুরু করেন। তখন প্ল্যাকার্ড বাইসাইকেলে বেঁধে গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষকে সচেতন করেন। সেই থেকে তার একক প্রতিবাদের পদযাত্রার শুরু। এরপর থেকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চলমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে একক পদযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন। প্রথম দিকে পদযাত্রার কোনো সংখ্যা হিসাব রাখেননি। ২০০০ সালের পরে তার এক স্বজনের পরামর্শে লিখিত পোস্টারের এক কর্নারে কততম প্রতিবাদ, সেটা উল্লেখ করা শুরু করেন।

আফেন্দি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন যৌবন ছিল, তখন প্ল্যাকার্ড হাতে মাইলকে মাইল হেঁটেছি। বর্তমানে আমার বয়স ৭৯। এখন আর আগের মতো পারি না। তবুও দেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে প্ল্যাকার্ড হাতে নান্দাইল উপজেলা সদরসহ নান্দাইল চৌরাস্তা প্রেস ক্লাব পর্যন্ত যাই। যত দিন বেঁচে আছি আল্লাহ শারীরিক সামর্থ্য দিলে আমার এ কাজ চালিয়ে যাব।’

আফেন্দি নুরুল ইসলামের প্রাক্তন ছাত্র অ্যাডভোকেট খলিলুর রহমান বলেন, ‘স্যার আজীবন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জীবনযাপন করেছেন। উনি শুধু অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামেন এমন না। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান বা সংস্থাকে অভিনন্দন জানিয়েও প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামেন।’

আরেক ছাত্র শহিদুল্লাহ বলেন, ‘স্যার শিক্ষকতার পাশাপাশি সারা জীবন মানুষের উপকার করে এসেছেন। তিনি অবসরে গল্প, উপন্যাস, কবিতা লেখেন। তার একাধিক বই বের হয়েছে। কিন্তু ওনার ত্যাগ ও সততার যথাযথ মূল্যায়ন কেউ করেনি।’