মসজিদে নববির পূর্ব পাশের বহির্গমন দরজাকে বাবে জিবরাইল বলা হয়। হজরত জিবরাইল (আ.) অহি নিয়ে এসে প্রায়ই এখানে অপেক্ষা করতেন বলে এই নাম হয়েছে মারজানা কুবরা
ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনার কথা স্মরণে আমার দুই চোখ প্লাবিত হয়। এই প্লাবন কখনো জীবনে নতুন ফাল্গুধারা নিয়ে আসে। আপনাকে দেখতে না পারার শোকতাপে নীল হয়ে যাই। বুঁদ হয়ে যাই মদিনার পথ-পান্তরে, ধুলোবালি আর খেজুর শাখের পাতার বিন্যাসে। আমি দেখিনি এসবের কিছুই, তবুও অদেখা ছবি আঁকে আমার তনুমন। অদেখা এক আপনি বারবারই আমার হৃদয় হরণ করেন। আপনার বর্ণনা আমায় বিচলিত করে, ব্যাকুলতায় ব্যগ্র করে তুলে আপনার দিদারের আশা। তৃষিত বুকে আপনার দরুদের শব্দমালা আবেহায়াত হয়ে তৃষ্ণা মেটায়।
আপনি হাদিসে বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার কাছে তার বাবা-মা, তার সন্তান-সন্ততি ও সব মানুষ থেকে প্রিয় হব।’ সহিহ বোখারি : ১৫
ছোট্ট একটা হাদিস, অথচ গভীর ভাবার্থ! কিন্তু আজ আর এ বিষয়ের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ নয়। আজ ভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা।
‘কেন রাসুলকে ভালোবাসি?’ এই প্রশ্ন যদি নিজেকে নিজে করি। উত্তর খুবই সাধারণ, ‘কেন ভালোবাসবো না রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে?’
যদি তার জীবনের দিকে তাকাই, কী করে যাননি তিনি আমাদের জন্য? সেই পনেরোশ বছর আগে, যখন আমাদের অস্তিত্ব ছিল না; তখন একটা মানুষ রাত জেগে আমাদের জন্য অশ্রু বিসর্জন করেছেন। আমাদের পথভ্রষ্ট হওয়া, ফেতনার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে ভীষণ শঙ্কিত ছিলেন! তিনি বারবার মহান রবকে ডেকে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা করেছেন, হে প্রিয়তম রব! আমার উম্মত! আমার উম্মত! শব্দের ঝঙ্কারে তখন জমিনও কেঁদে উঠত। আপনার কান্নায় সঙ্গ দিতে আকাশ-জমিন, বৃক্ষ-তরু, সাগর-তরঙ্গ। পক্ষীকুল ব্যাকুল হয়ে নীরব মাতমে জেগে উঠত।
আপনাকে কেন ভালোবাসব না ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইয়া হাবিবাল্লাহ!
মক্কার কাফেরদের দেওয়া হাজারো গঞ্জনা সহ্য করেছেন। আর তায়েফে? আহ কি বিভীষিকাময় ছিল সৃষ্টি জগতের জন্য সেই দিনটি! দুষ্টু পাষণ্ডদের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছে আপনার নুরানি বদন। এমন পরিস্থিতিতেও আপনি ধৈর্যের চরম নজির দেখিয়েছেন। তায়েফবাসীর ধৃষ্টতায় আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল। আপনার তো বদদোয়ার শব্দ উচ্চারণের দরকার ছিল না, শুধু মনের মধ্যেও যদি তাদের প্রতি বৈরীভাব পোষণ করতেন, তায়েফের ধ্বংস অনিবার্য ছিল। আপনি তো দয়ার নবী, ক্ষমার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। উপরন্তু দোয়ার হাত উত্তোলিত করেছেন হুঁশ হারানো পরিস্থিতিতে তায়েফবাসীর জন্য সুবাহানাল্লাহ!
আপনার নামে কোরআন মজিদে পুরো একটা সুরার নামকরণ করা হয়েছে। আপনার মর্যাদা ও ইজ্জত বর্ণনায় রয়েছে প্রচুর আয়াত। যেমন
‘বলো, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ Ñসুরা আলে ইমরান : ৩১
‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য, যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।’ সুরা আহজাব : ২১
‘হে মুমিনরা, তোমরা আনুগত্য করো আল্লাহর ও আনুগত্য করো রাসুলের এবং তোমাদের মধ্য থেকে কর্র্তৃত্বের অধিকারীদের। অতঃপর কোনো বিষয়ে যদি তোমরা মতবিরোধ করো তাহলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে প্রত্যর্পণ করো যদি তোমরা আল্লাহ ও শেষদিনের প্রতি ইমান রাখো। এটি উত্তম এবং পরিণামে উৎকৃষ্টতর।’ সুরা আন নিসা : ৫৯
‘অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়।’ সুরা আন নিসা : ৬৫
‘যে রাসুলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হলো, তবে আমি তোমাকে তাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক করে প্রেরণ করিনি।’ সুরা আন নিসা : ৮০
‘বলো, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ সুরা আলে ইমরান : ৩১
‘বলো, তোমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করো। তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ কাফেরদের ভালোবাসেন না।’ সুরা আলে ইমরান : ৩২
আপনার পুরো মক্কাজীবন ঘুরে দেখা যায় নির্যাতন, জুলুম, হেনস্তা আর দুঃখের উপাখ্যানে মোড়ানো। মক্কায় রাজত্ব করার চমকদার সুযোগ পর্যন্ত আপনি পায়ে ঠেলে দিয়েছেন, উম্মাহর বৃহৎ কল্যাণ কামনা এবং নবুয়তের বৃহৎ দায়িত্ব পালনে মহান রবের আজ্ঞাবহ হওয়ার জন্য। এখানেও আপনি আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রেখে গেছেন।
আফসোস, শত আফসোস! আমরা আপনার স্বার্থপর উম্মত। দুনিয়ার নানান অর্জন, সার্টিফিকেট, কথিত স্ট্যান্ডার্ড ক্যারিয়ার আর সমাজে উচ্চবিত্ত হওয়ার মোহে পদে পদে অবহেলা করছি আপনার আদর্শ!
আপনার মক্কাজীবন কিংবা মদিনার জীবন কোনটার ব্যাখ্যা করব? কী করে এই হাতে তুলে ধরব বিশাল সেই দাস্তান, হাত কাঁপে যে! আপনি কখনো কাউকে ঘৃণা করতে শেখাননি। ধর্মের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ও জোর-জবরদস্তি করতে নিষেধ করেছেন। আপনি সব ধর্মের, গোত্রের ও বর্ণের প্রতি উদারনীতি দেখিয়েছেন। প্রতিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বে মানবতা, শান্তি ও শৃঙ্খলার সুবিশাল স্তম্ভ। উড্ডয়ন করেছেন বিশ্বশান্তির ঝাণ্ডা। যার ধারক-বাহকের উত্তরসূরি ঘোষণা করেছেন আমাদের। কতটুকু পেরেছি বা পারছি আমরা সেই গুরুদায়িত্ব পালন করতে? কথা তো ছিল, জান-মাল দিয়ে, বুক দিয়ে আগলে ধরব আপনার শিক্ষা। কিন্তু বাস্তবতা তো ভিন্ন।
দুনিয়ার কায়দা-কানুনের ধূম্রজালে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়ে ভুলে গেছি আপনার আদর্শ। উল্টো সফলতা খুঁজে বেড়াচ্ছি অন্যের ঘরে। অথচ সভ্যতার পাতায় স্বর্ণাক্ষরে খচিত তোমার সম্মান, আদর্শের শ্রেষ্ঠত্বের বর্ণমালা।
যে আপনার সম্পর্কে অধ্যয়ন করেছে, বর্ণমালার ভাঁজে ভাঁজে বিমোহিত হয়েছে। এ স্বীকৃতি নিরেট, আপনার মতোই নিষ্কলুষ। অথচ আপনার উম্মত হয়েও আপনার চরিত্রে আঘাতকারী নষ্টচিন্তার বিকৃত আত্মাগুলোকে প্রতিহত করতে শিখিনি। আপনার ইজ্জতরক্ষায় জীবন উৎসর্গ করতে পারিনি। কতটা নির্বোধ আর অপদার্থ আমরা!
লজ্জিত আত্মা আমায় ধিক আর কী জানাবে, আমি নিজেই লুণ্ঠিত। কপট সভ্যতা আর মেকি দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের মোহে। আপনাকে ভালোবাসি ভালোবাসি বলে কত লম্ফঝম্প করি। মুখে আপনার নামে দরুদ-সালাত পেশ করি ঠিকই। কিন্তু আপনার ইজ্জত আর পবিত্রতম নিরেট চরিত্রের বিরুদ্ধে আঙুল চালানো, চোয়াল বাঁকানো ধৃষ্টতাকারীকে কি কোনো জবাব দিতে পেরেছি!
আমি আর কতটুকু বর্ণনা করব ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি অপারগ, অক্ষম, অধঃপতনের লম্বা ফর্দ থেকে কতটুকুই আর বলা যায়। আমাদের সবই তো ব্যর্থতায় পূর্ণ। একদিকে আমার ভালোবাসা, অন্যদিকে আমার অক্ষমতা, অদূরদর্শিতা। কীভাবে দাঁড়াব আপনার সামনে ইয়া রাসুলুল্লাহ!
জীবনের অন্তিমলগ্নে আপনি স্ত্রী-কন্যা কিংবা দৌহিত্রদের জন্য কান্না করেননি। তখনো আপনি উম্মতি উম্মতি বলে গেছেন। গোটা জীবন উম্মাহর কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। আপনি সেই নবী, যিনি হাশরে, মিজানে, শেষ বিচারের দিনে উম্মতের শাফায়াতকারী। সুতরাং দুনিয়ার তাবৎ ভালোবাসা তো আপনারই প্রাপ্য।
আমাদের হাজারো অপূর্ণতা রয়েছে, তবুও উম্মত হিসেবে আমাদের জীবনের সাধ আপনাকে দেখে চামড়ার চোখকে শীতল করব। হাউজে কাউসার পান করব আপনার হাতে! হে প্রিয়তম রাসুল! হাজারো বিচ্যুতি আমার। আপনার প্রতি নিবেদনÑ আমার জানমাল, জীবন-জিন্দেগি, পরিবার-পরিজন কোরবান হোক আপনার তরে। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আপনার প্রতি। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।