কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে

ফের উত্তেজনার পারদ বাড়ছে দুই কোরিয়ার মধ্যে। গতকাল দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া দুটি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর পেছনে অবশ্য অন্য পরিকল্পনা রয়েছে বলে মনে করছে দক্ষিণ কোরিয়া। সিউল ও ওয়াশিংটন মনে করছে, কিম জং উনের দেশ পরমাণু পরীক্ষা চালাতে পারে।

সম্প্রতি ১২ দিনের যৌথ নৌসেনা মহড়া চালিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া এবং আমেরিকা। আগামী সোমবার থেকে এই দুদেশের বিমানসেনারও যৌথ মহড়ায় অংশ নেওয়ার কথা। সেখানে থাকবে দুই শতাধিক যুদ্ধবিমান। এই পরিস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ।

কূটনৈতিক মহলের মতে, সিউল ও ওয়াশিংটনের যৌথ মহড়ায় ক্ষুব্ধ পিয়ংইয়্যাং। একে তাদের দেশের উপরে আক্রমণের মহড়া বলে মনে করছে উত্তর কোরিয়া। তাই পাল্টা নিজেদের শক্তিপ্রদর্শন করেছে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে। এই নিয়ে চলতি বছরে ২৮টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করল তারা।

দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গতকাল স্থানীয় সময় দুপুর ১১টা ৫৯ ও ১২টা ১৮ মিনিট নাগাদ গাংওনের টংচন অঞ্চল থেকে উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূল বরাবর ক্ষেপণাস্ত্র দুটি ছোড়া হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ জানিয়েছেন, আমেরিকার সঙ্গে সমন্বয় রেখে সেনা নজরদারির মাত্রা আরও বাড়াচ্ছেন তারা।

গত কিছুদিন ধরেই ক্রমশ উত্তেজনা বাড়ছে কোরীয় উপদ্বীপের দুই প্রতিবেশীর মধ্যে। গত মাসেই উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন ঘোষণা করেছেন, তাদের পরমাণু নীতি অপরিবর্তনীয়। এ দিকে ওয়াশিংটন ও সিউলের তরফেও সতর্কতা জারি করে বলা হয়েছে, কিম ফের পরমাণু পরীক্ষা চালাতে পারেন। যা উত্তর কোরিয়ার সপ্তম এবং ২০১৭ সালের পরে প্রথম বার হতে চলেছে।

গত মঙ্গলবার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক-ইয়োল জানান, পিয়ংইয়্যাং‌ তাদের সপ্তম পরমাণু পরীক্ষার প্রস্তুতি সেরে ফেলেছে। পরের দিন, বুধবার আমেরিকা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে, উত্তর কোরিয়া পরমাণু পরীক্ষা করলে অভূতপূর্ব প্রত্যাঘাতের জন্য তৈরি থাকতে হবে। পিয়ংইয়্যাং‌য়ের এই পরীক্ষাকে প্ররোচনা হিসাবেই দেখছে দক্ষিণ কোরিয়া। সে দেশের জয়েন্ট চিফ অব স্টাফ জানান, ওই হামলা কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি ও শৃঙ্খলার প্রতি হুমকির শামিল। এর ফলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবিত বিধিও লঙ্ঘন করবে উত্তর কোরিয়া।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সির ডিরেক্টর জেনারেল রাফায়েল গ্রসি জানান, উত্তর কোরিয়ার পদক্ষেপের উপর তারা খুব কাছ থেকে নজর রাখছেন। তার আশা, এমনটা হয়তো ঘটবে না। তবে পরিস্থিতি সেই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার দিকেই ইঙ্গিতবাহী।

উত্তর কোরিয়াকে নিয়ে উদ্বেগ নতুন কিছু নয়। এই উদ্বেগ কখনও বাড়ে কখনও খানিকটা কম থাকে। কিন্তু কোরিয়া উপদ্বীপের বর্তমান পরিস্থিতি গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় আছে এবং দিন দিন তা আরও খারাপের দিকে যাওয়ারই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।

গত মাসে উত্তর কোরিয়া জাপানের উপর দিয়ে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। যেটির কারণে জাপান ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা সংকেত (সাইরেন) বাজায় এবং বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়। নিশ্চিতভাবেই সেটি ছিল আক্রমণাত্মক এবং উস্কানিমূলক আচরণ।

উত্তর কোরিয়া সম্প্রতি আরও বেশ কয়েকটি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তের কাছে যুদ্ধবিমান উড়িয়েছে এবং সমুদ্রে শত শত কামানের গোলা নিক্ষেপ করেছে। যেগুলো সমুদ্রের ‘সামরিক নিরাপত্তা অঞ্চলে’ গিয়ে পড়েছে। দুই কোরিয়ার মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে ২০১৮ সালে ওই ‘সামরিক নিরাপত্তা অঞ্চল’ চিহ্নিত করা হয়।

বিবিসি জানায়, গত সোমবার উত্তর কোরিয়ার একটি বাণিজ্যিক জাহাজ সমুদ্রসীমা অতিক্রম করে দক্ষিণ কোরিয়ার জলসীমায় ঢুকে পড়েছিল। যার জেরে উভয় দেশ সতর্ক করে গুলি ছুড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ, উত্তর কোরিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে এই অনুপ্রবেশ কাণ্ড ঘটিয়েছে।

অন্যদিকে, গত দুইমাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর কোরিয়া এবং জাপান কখনও যৌথভাবে আবার কখনও এককভাবে বৃহৎ আকারে সামরিক মহড়া চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা হয়তো যে কোনও সময় উত্তর কোরিয়ায় পরমাণু হামলার জন্য প্রস্তুত থাকার বার্তা দিতে চাইছে।

কিন্তু উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন ওই অঞ্চলে কেন উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন?  এবার কিম যেভাবে উত্তেজনা বাড়াচ্ছেন তার কারণ খুব একটা স্পষ্ট নয়। হয়ত তিনি আরো উস্কানিমূলক পরীক্ষা চালানোর আগে ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে এমনটা করছেন। কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, তিনি হয়ত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রথমবার পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা করতে যাচ্ছেন। অথবা, এমনকী হতে পারে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ায় ছোট আকারে আক্রমণও করে বসতে পারেন।

উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ দফা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার জবাবে দক্ষিণ কোরিয়াও সীমান্তে যুদ্ধবিমান পাঠিয়েছে এবং কামানের গোলা ছুড়েছে।

অনেক বিশ্লেষক আবার বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে আরও অনুকূল শর্ত দিয়ে আলোচনায় বসানোর জন্যই দেখাতে চাইছেন যে, তার দেশ অনেক বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তিনি গত মাসে উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু শক্তিধর দেশ বলেও ঘোষণা করেন এবং বলেন, এ ক্ষেত্রে তার অবস্থান অপরিবর্তনশীল।