বিশ্বের অন্যতম দুই প্রধান খাদ্য ও জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে ৮ মাসের বেশি সময় ধরে চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বৈশ্বিক এই সংকটের সমাধানে তুরস্কের আন্তরিক চেষ্টায় ও জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় গত ২২ জুলাই কিয়েভ এবং মস্কোর কর্মকর্তারা ইউক্রেনে আটকা আড়াই কোটি টন গম ও ভুট্টা বিশ্ববাজারে সরবরাহের লক্ষ্যে ব্ল্যাক সি গ্রেইন ইনিশিয়েটিভ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইউক্রেনে আটকা শস্য বহনকারী বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজ যেন নিরাপদে কৃষ্ণ সাগরে চলাচল করতে পারে, সেজন্য তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় একটি যৌথ সমন্বয় কেন্দ্র খোলা হয়। সেই কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে জাতিসংঘ, রাশিয়া ও তুরস্ক।
বহুল আকাক্সিক্ষত এই চুক্তিতে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই মাস, আর এই চুক্তির স্থায়িত্ব হওয়ার কথা ১২০ দিন। এই মেয়াদ আগামী ১৯ নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। তবে চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস শুক্রবারই চুক্তিটি নবায়নের জন্য রাশিয়াকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু রুশ নৌবহরে ড্রোন হামলার অভিযোগে আপাতত তা অনিশ্চিত হয়ে গেল।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফান দুজারিক বলেছেন, ‘কৃষ্ণ সাগর পথে শস্য রপ্তানির উদ্যোগ ভেস্তে যায় এমন কোনো কর্মকাণ্ড থেকে সব পক্ষেরই বিরত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবিক প্রচেষ্টা, যা স্পষ্টতই লাখো মানুষের খাবারের সহজলভ্যতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।’
চুক্তি থেকে রাশিয়ার বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে মস্কোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউর পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ‘চুক্তিতে অংশগ্রহণ স্থগিত করার রুশ সিদ্ধান্ত ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক খাদ্যসংকট মোকাবিলাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।’ এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন রাশিয়ার শস্য চুক্তি বাতিলের পদক্ষেপকে ‘আপত্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়ার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা বৃদ্ধি করবে।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন মস্কোর বিরুদ্ধে খাদ্যকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যশস্য রপ্তানির বিষয়ে জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত খাদ্যশস্য চুক্তিটি গত শনিবার স্থগিত করে রাশিয়া। অধিকৃত ক্রিমিয়া উপদ্বীপের বৃহত্তম বন্দরনগরী সেভাস্তোপলের কাছে কৃষ্ণ সাগরে রুশ নৌবহরে ড্রোন হামলার অভিযোগে ওই চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয় মস্কো।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, শনিবার ভোররাতে ইউক্রেন ১৬টি ড্রোন দিয়ে ক্রিমিয়া উপদ্বীপের সেভাস্তোপলের কাছে কৃষ্ণ সাগরে রুশ নৌবহরে হামলা চালিয়েছে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর বিশেষজ্ঞরা এই সন্ত্রাসী হামলা চালাতে সহায়তা করেছে। এতে কৃষ্ণ সাগর বন্দর থেকে ইউক্রেনের শস্য করিডোর নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত জাহাজগুলোর একটির সামান্য ক্ষতি হয়েছে। তবে রুশ সৈন্যরা ইউক্রেনীয় এই ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই হামলার কারণে ইউক্রেনের বন্দর থেকে কৃষিপণ্য রপ্তানির চুক্তি বাস্তবায়নে রাশিয়ার অংশগ্রহণ স্থগিত করা হলো। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির চিফ অব স্টাফ আন্দ্রি ইয়ারমাক রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘নিজেদের স্থাপনায় কাল্পনিক সন্ত্রাসী হামলার’ নাটক সাজানোর অভিযোগ করেছেন। আর ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিমিত্রো কুলেবা বলেছেন, চুক্তি নস্যাতের জন্য মিথ্যা অজুহাতকে ব্যবহার করছে রাশিয়া।