বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে উত্তপ্ত সংসদ

বিদ্যুতের লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকট নিয়ে সংসদ অধিবেশনে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ। তার সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদও বিগত বিএনপি সরকারের সমালোচনায় মুখর হন। গতকাল মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি সমালোচনায় সংসদে উত্তাপ ছড়ায়। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।

সংসদ অধিবেশন শুরুই হয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি বিষয়ে প্রশ্নোত্তর পর্ব দিয়ে। এ অধিবেশনে বিএনপিদলীয় সদস্যরা নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়েও কথা বলেন। জবাবে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিএনপি জোট সরকারের সময়ে বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির সমালোচনা করে বলেন, ‘তারেক রহমান যে লুটপাট করেছে সে হিসাব আমাদের কাছে আছে। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে তা তুলে ধরা হবে।’ এরপর অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপিদলীয় সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, সরকার সবকিছুর দায় চাপিয়ে দিচ্ছে তিন নন্দঘোষের ঘাড়ে।

বিএনপিদলীয় সদস্য হারুনুর রশিদ তার সম্পূরক প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, প্রতিমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত সরকারের কথা কমপক্ষে ৫০ বার বলেছেন; যা প্রাসঙ্গিক নয়। তিনি বলেন, ‘আপনি জানাবেন (বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী) বিএনপি সরকারের আমলে বিদ্যুৎ, গ্যাসের দাম কত ছিল?’ তিনি বলেন, ‘আমি আপনার কাছে স্পষ্ট জানতে চাচ্ছি বিএনপি সরকার গ্যাসের যে চুক্তি করেছে, সেটা আছে কি না? সেটা সংসদে উপস্থাপন করবেন। বিএনপির আমলে নিত্যপণ্যের দাম কত ছিল তার উত্তর দিন। শুধু বিএনপি জোট সরকারের সময় এই হচ্ছে, ওই হচ্ছে গল্প শোনাচ্ছেন।’

হারুনের প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘সংসদ সদস্য (হারুন) অনেক উত্তেজিত হয়ে গেছেন। অনেকে সত্য কথা সহজে নিতে পারেন না। আমিও চাই সংসদে সময় দেন। সেখানে জ্বালানি নিয়ে কথা বলব। নাইকো মামলা নিয়ে যে পরিমাণ প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্টে যে পরিমাণ টাকা চুরি করেছে, সেগুলোর প্রমাণপত্র আমাদের হাতে আছে। সেগুলোই ডকুমেন্ট সংসদের ভিডিও স্ক্রিনে তাদের দেখাব।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘খাম্বা কোম্পানি দিয়ে তারেক রহমান যে পরিমাণ লুটপাট করেছে, তার হিসাব আমাদের কাছে আছে। সেই তথ্য আমরা সংগ্রহ করেছি। সময় হলে সব বের করব। নির্বাচন সামনে আসছে তো, প্রস্তুত থাকেন। সব দেখাব।’ তিনি বলেন, বিএনপি জোট সরকারের সময় অন্ধকারে ১৭ ঘণ্টা ছিলেন। উনি (হারুনুর রশিদ) বিদ্যুতের দামের কথা বলেন। আরে অন্ধকারে থাকার যে খরচ, সেই খরচের কথা বলেন।

বিএনপির সময়ে বিদ্যুতের সিস্টেম লস কত ছিল তা কি হারুনুর রশিদ জানেন, নাকি তা জানতে চান নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘উনি ভুলে গেছেন। ৪৪ শতাংশ অপচয় ছিল। এটা দুর্নীতির মধ্যে পড়ে। তিন-তিনবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন কি খামোখা হয়েছে তারা।’ এ সময় পাশ থেকে একজন সদস্য বলেন, টানা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তখন প্রতিমন্ত্রী সংশোধন করে বলেন পাঁচবার।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হয়। বাংলাদেশ উদাহরণ হয় বিশ্বের কাছে সাফ চ্যাম্পিয়ন হয়। আর ওনারা করেছেন দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা শেষ হয়ে যাবে যদি বক্তব্য দিতে হয় তাদের ব্যাপরে।

নসরুল হামিদ বলেন, ‘কোনো প্রয়োজন নাই চাল, ডাল, গমের কী দাম ছিল জানানোর। আরে ভাই, আপনারা তো খাদ্যই দিতে পারেন নাই। গুলি করে মানুষ মেরেছেন। আবার দামের কথা জিজ্ঞেস করেন।’

বিদ্যুতের দাবিতে কানসাটে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার এখনো খেয়াল আছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া টঙ্গীতে বিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করতে যান। তিনি ঢাকায় পৌঁছাতে পারেননি, সেটা বন্ধ হয়ে গেছে।’

বিএনপি সংসদ সদস্যদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়ে সংসদে কথা না বলার অনুরোধ করেন নসরুল হামিদ বিপু। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না, কোন মুখে আপনারা কথা বলার সাহস করেন। হয়তো লজ্জা-শরম আপনাদের মাঝে নাই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলতে পারব। তথ্য না শুধু, প্রমাণাদিসহ।’

সরকারের হাতে তিন নন্দঘোষ : রুমিন ফারহানা

অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপিদলীয় সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে দায় এড়াতে সরকার তিন নন্দঘোষের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘একটা নন্দঘোষ হচ্ছে করোনা, একটা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আরেকটা বিশ্বমন্দা। যাই হোক না কেন, যে অবস্থায় দাঁড়াক না কেন, সরকার সব দোষ চাপাচ্ছে এই তিনটি নন্দঘোষের ঘাড়ে।’

রুমিন ফারহানা বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব পড়েছে। তাহলে সরকারের হিসাবে আমাদের চেয়ে কম মাথাপিছু আয়ের দেশ ভারত, নেপাল ও আফ্রিকার অনেক গরিব দেশকে বিবিসি কেন শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি হওয়ার তালিকায় রাখেনি। গত একযুগে যে লুটপাট হয়েছে, অনিবার্যভাবে তা হওয়ার কথা।’

বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে রুমিন কুইক রেন্টালের দায়মুক্তির সমালোচনা করেন। এ ছাড়াও অবকাঠামো উন্নয়নে দুর্নীতি হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘যেখানে লুটপাট হয়, সেখানে টাকা পাচার স্বাভাবিক।’

প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ-জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীকে ধন্যবাদ দিয়ে এবং তার বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি কী অবস্থায় আছে সেটা তৌফিক-ই-ইলাহীর চেয়ে বেশি আর কেউ ভালো জানে না।’

আগামী বছর বিশ্বে দুর্ভিক্ষ হবে এমন আশঙ্কা করে প্রধানমন্ত্রী প্রতি ইঞ্চি জমি চাষ করার অনুরোধ জানিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সমালোচনা করেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, ‘সাধারণভাবে ভাবতে গেলে মনে হবে, প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের কথা কৌশলগতভাবে ভুল। আসলে যখন তার পক্ষ থেকে এ ধরনের বার্তা আসে তখন আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।’

মন্ত্রণালয়-দপ্তরের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া ১৯০০ কোটি টাকা

প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের পাওনা ১ হাজার ৮৯৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে পাবে ৯০৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে ৩৯৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সরকারদলীয় সদস্য মোজাফফর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এ তথ্য জানান।

নিজাম উদ্দিন হাজারীর প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ২৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৯ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে।