আলোকচিত্র যখন বাংলায় ঠিক জমে ওঠেনি, তখন হাতেগোনা যে কজন ছবি তুলতেন, গোলাম কাসেম ড্যাডি তাদের একজন। তিনি যখন ফটোগ্রাফি শুরু করেন তখন অবিভক্ত ভারতে মুসলমান সমাজে ছবি তোলা গর্হিত কাজ হিসেবেই বিবেচিত হতো। এ রকম একটা বিরূপ সময়ে তিনি ক্যামেরা হাতে নিয়ে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার ট্যাবু ভাঙার চেষ্টা করেন। গোটা বিশ শতকের বাঙালি মুসলমানের সমাজচিত্র ধরা আছে তার ক্যামেরায়। পশ্চাৎপদ সমাজ আর উপনিবেশ রাজনীতির বিপরীতে তার ছবিগুলো বাঙালি মুসলমান সমাজের আধুনিক হয়ে ওঠার এক অবিনাশী দলিল। ড্যাডির ছবি দেখলে বোঝা যায়, কেমন ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশের পথ। শতাব্দীকাল আগে এনসাইন বক্স ক্যামেরায় ছবি তোলা শুরু করেন ড্যাডি। তার আগে আর কোনো বাঙালি মুসলমান ছবি তুলতেন কি না সে তথ্য অজানা। তুলে থাকলেও তাদের কাজের শৈলী তৈরি হয়নি।
সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের লেখা থেকে জানা যায়, গোলাম কাসেম ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ছোটগল্প লেখক। মাসিক সওগাতে তার নিয়মিত গল্প ছাপা হতো। এ ছাড়া বার্ষিক সওগাত, সাপ্তাহিক সওগাত, শিশু সওগাত, দেশের কথা, বঙ্গনূর ও বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়ও তার লেখা ছাপা হয়েছে। তাকে সওগাত যুগে মুসলমান সাহিত্যের ‘শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ হিসেবে অভিহিত করা হতো। এসব কাহিনী এ-কালের পাঠক কিংবা সাহিত্যকর্মীদের কাছে কী কারণে অজানা, তা ভেবে বিস্মিত হই। আমাদের বড় দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমরা অনেক সময় আপন মুখের দিকে তাকাতে পারি না। যদি পারতাম, তাহলে তিনি এত দিন অনালোকিত থাকতেন না। এ কথা ঠিক যে, ড্যাডি ছিলেন আত্মকুণ্ঠ, প্রচারবিমুখ ও নির্জনতম মানুষ। তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতেই স্বচ্ছন্দবোধ করতেন।
কলকাতা বিশ^বিদ্যালয়ের ইনফেন্ট্রি কোরের হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন গোলাম কাসেম ড্যাডি। সে সময় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে বসে লিখতে শুরু করেন তিনি। তখন মুসলমান সমাজে পর্দানশিন নারীদের গল্প-উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় করা নিষিদ্ধ ছিল। সে রকম একটা অন্ধকার সময়ে প্রথাগত নিয়মের বিরুদ্ধে কলম ধরেন তিনি। ঘরবন্দি নারীদের সাবলীলভাবে উপস্থাপন করেন তার লেখনীতে। গল্প-সাহিত্যে নারীরা স্থান পান কেন্দ্রীয় কিংবা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে। এসব করেই তিনি থেমে থাকেননি। গ্লাস প্লেট নেগেটিভে ধরেছেন তাদের জীবনচিত্র। আর এসব কারণেই তিনি তৎকালীন শিল্প ও সাহিত্য মহলে উজ্জ্বল এক জ্যোতি হয়ে উঠেছিলেন।
তিনি লেখনীর মাধ্যমে সমাজের ভেতরগত রূপটা দেখার চেষ্টা করেছেন। তার দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি বা ফটোগ্রাফিকে শিল্প আকারে তিনি যেভাবে দেখতে চেয়েছেন, তার গল্পের বর্ণনায় সে ব্যাপারগুলো নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে। তার গল্প পড়লে মনে হয়, তিনি যেন একেকটা ছবির বর্ণনা দিচ্ছেন, চরিত্রের বয়ান দিচ্ছেন। ফলে তার গল্পগুলো সহজে পাঠ করা যায়, আবার ছবির মতো দেখাও যায়। ১০৪ বছরের দীর্ঘ জীবন তিনি উৎসর্গ করেছেন আলোকচিত্র ও সাহিত্যসাধনা কর্মে। খুব সাধারণ যাপনের মধ্যেও যে বর্ণাঢ্য জীবন বয়ে নেওয়া যায় তা সাহিত্য আর আলোকচিত্রের বোদ্ধাদের দেখিয়েছিলেন তিনি। ড্যাডির প্রকাশভঙ্গি আজীবন ছিল তার রুচি আর ভারসাম্য বোধের বিশ্বস্ত বাহক। এসব কারণে পূর্ববাংলার আলোকচিত্রীদের অভিভাবকত্বের দায়িত্বও আপনা থেকেই যেন গিয়ে বর্তেছিল তার ওপর। তিনি তো শুধু কিংবদন্তি আলোকচিত্রশিল্পী আর সফল গল্পকারই ছিলেন না, ছিলেন আলোকচিত্র সাধক, শিক্ষক, প্রাবন্ধিক আর সফল সংগঠক। দীর্ঘ আলোকচিত্র জীবনে তার যে ত্যাগের মহিমা সে কারণেই বোধহয় তিনি আলোকচিত্রীদের পথিকৃৎ হয়ে উঠেছিলেন। হয়ে উঠেছিলেন সবার ‘ড্যাডি’ বা পিতা।
সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় ফটোগ্রাফি শিখেছিলেন ড্যাডি। অন্যকে যেন তার মতো কষ্ট করে শিখতে না হয় এর জন্য ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি মাসিক সওগাতে ফটোগ্রাফি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। ১৯৪৯ সালে রাজশাহীর ডিস্ট্রিক্ট রেজিস্ট্রার হিসেবে অবসর গ্রহণের পর ঢাকায় আসেন ড্যাডি। ১৯৫১ সালের শুরুতে তিনি ঢাকার ১৩ মণিপুরীপাড়ায় তার শ^শুরবাড়ি গোলাপ ভবনে প্রতিষ্ঠা করেন ট্রপিক্যাল ইনস্টিটিউট অব ফটোগ্রাফি। কয়েক মাস পরে ইনস্টিটিউটটি ৭৩ ইন্দিরা রোডের তার নিজের বাড়িতে স্থানান্তর করেন। ইতিহাস বলে, ড্যাডির প্রতিষ্ঠিত শিক্ষায়াতনটি এ দেশের প্রথম ফটোগ্রাফিক ইনস্টিটিউট। ১৯৬২ সালের ১২ আগস্ট ইন্দিরা রোডের এই বাড়িতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাব। এই ক্লাব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশের অনেক তরুণের মনে ফটোগ্রাফির বীজ বুনতে শুরু করেন। তখন বাংলায় লেখা বইয়ের খুব অভাব ছিল। এই অভাববোধ থেকে তিনি ফটোগ্রাফিবিষয়ক বই লেখায় মনোনিবেশ করেন। ক্যামেরা [১৯৬৪], একনজরে ফটোগ্রাফি [১৯৮৬] ও সহজ আলোকচিত্রণ [২০০২] নামে তার তিনটি বই প্রকাশিত হয়। বইগুলো এখন ফটোগ্রাফি শিক্ষার আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
ড্যাডি সারা জীবন ফটোগ্রাফি, লেখালেখি, অভিনয়, গান-বাজনা, ছবি আঁকা, পাঠাগার বানানো, বাগান করা এসবের সঙ্গেই ছিলেন। বরেণ্য আলোকচিত্রী ও চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন ড্যাডিকে ‘জিলেটিন মহামানব’ আখ্যায়িত করেছেন। আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুন তার ‘পূর্ববাংলার ফটোগ্রাফি : রাজসাক্ষী গোলাম কাসেম ড্যাডি’ গ্রন্থে ড্যাডিকে সৃষ্টিশীল ফটোগ্রাফির জনক ও পূর্ববাংলার প্রথম বাঙালি মুসলমান সার্থক আলোকচিত্রশিল্পী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ক্যামেরা রিক্রিয়েশন ক্লাবের ট্রাস্টি শেখ আবদুর রাজ্জাক ২০২১ সালের ৯ জানুয়ারি ড্যাডির ২৩তম প্রয়াণ দিবসের এক লাইভ অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘আরমানিটোলা ফটোগ্রাফি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ড্যাডিকে “ফাদার অব ফটোগ্রাফি” উপাধি প্রদান করে।’ আন্তর্জাতিক শিল্পবিষয়ক লেখক রাহেলা আইমা ২০২০ সালের ৩০ মার্চ বিশ্ববিখ্যাত অনলাইন পোর্টাল আর্টনিউজে ড্যাডির শিল্পকর্ম নিয়ে একটি রিভিউ লেখেন; যার শিরোনাম করা হয় ‘দ্য ফাদার অব বাংলাদেশি ফটোগ্রাফি’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক মাসিক ম্যাগাজিন ‘আর্টফোরাম’-এর মে-জুন ২০২০ সংখ্যায় শিল্পবিষয়ক লেখক স্কাই অরুন্ধতী থমাস লিখেছেন, ‘গোলাম কাসেম ড্যাডি, যাকে ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের ফটোগ্রাফির জনক বলা হয়।’
১৯৮৮ সালে ‘ক্রিয়েটিভ ফটোগ্রাফার্স বাংলাদেশ’-এর আন্তর্জাতিক স্যালোনে গোলাম কাসেম ড্যাডির নামে পদক প্রবর্তন করা হয়। সংগঠনটি ড্যাডিকে ফেলো হিসেবে বিশেষভাবে সম্মানিত করে। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি [বিপিএস] এবং ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফিক কাউন্সিলের সম্মানিত ফেলো। ১৯৮৬ সালে সিনেসিক অডিও ভিজ্যুয়াল ও চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটি তাকে বিশেষ সম্মাননা দেয়। ২০০৪ সালে তৃতীয় আন্তর্জাতিক ছবি মেলায় তাকে আজীবন সম্মাননা [মরণোত্তর] দেওয়া হয়। আলোকচিত্রবিষয়ক গ্রন্থাগার দৃক তাদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছর ‘গোলাম কাসেম ড্যাডি স্মারক বক্তৃতা’ শিরোনামে এক সভার আয়োজন করে। ফটোগ্রাফি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কাউন্টার ফটো গোলাম কাসেম ড্যাডির নামে একটি ক্লাসরুমের নামকরণ করেছে।
ড্যাডির জন্ম ১৮৯৪ সালের ৫ নভেম্বর, ভারতের জলপাইগুড়িতে। ফটোগ্রাফিতে অভিষেক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঠিক দুই বছর আগে ১৯১২ সালে। যুদ্ধের সময় পড়তেন কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনফেন্ট্রি কোর বা পদাতিক বাহিনী বলে একটি বিশেষ দল গঠিত হলো। বাঙালিরা লড়াকু জাতি নয়, ব্রিটিশদের এমন তকমা মিথ্যা প্রমাণ করতে একুশ বছরের টগবগে ড্যাডি নাম লেখালেন সেই বাহিনীতে। ক্যামেরাটা কিন্তু তার সঙ্গেই ছিল। ক্যামেরার একটা বাড়তি সুবিধা থাকে। অন্যরা যেখানে যেতে পারতেন না, ছবি তোলার সুবাদে ড্যাডি সেখানে যাওয়ার অনুমতি পেতেন। ফলে ড্যাডির ক্যামেরায় বন্দি হতে থাকে বিশ্বযুদ্ধের নানা মুহূর্ত। ড্যাডি যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণের পাশাপাশি আলোকচিত্রী হিসেবেও কাজ করেছেন সে বিষয়টিও এত দিন কোথাও বা কোনো মহলে যথাযথভাবে উচ্চারিত হয়নি। এই প্রবন্ধকারের সম্পাদনায় চার খ-ের ‘ড্যাডিসমগ্র’ প্রকাশের পর ড্যাডির তোলা প্রথম বিশ^যুদ্ধের তিনটি আলোকচিত্র আলোচনায় আসে। এই তিনটি আলোকচিত্রের জন্য তিনি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তবে ড্যাডির বর্ণনা অনুযায়ী প্রথম মহাযুদ্ধের তার আরও ছবি থাকার কথা। এগুলো উদ্ধার হলে ছবি পঠনের মধ্য দিয়ে তাকে বিস্তারিতভাবে জানা-বোঝা সম্ভব হবে।
দীর্ঘ ৮৬ বছর ফটোগ্রাফি জীবনে শতাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন ড্যাডি। প্লেট ক্যামেরার পর কোডাক ব্রাউনি, আগফা, ভায়গল্যান্ডার, জাইস আইকন ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন তিনি। লাইকা আর রোবট ক্যামেরা ব্যবহার করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ই। শেষের দিকে ইয়াসিকা, অলিম্পাস, মিনোলটা, ক্যানন, মিনক্স, আগফা রেকর্ড টু, রোলি ৩৫ রেঞ্জফাইন্ডার প্রভৃতি ব্যবহার করেছেন। তিনি ভারী ক্যামেরার চেয়ে হালকা ম্যানুয়েল ক্যামেরা ব্যবহারে স্বচ্ছন্দবোধ করতেন। তার সর্বশেষ ক্যামেরা হলো পেনটেক্স কে-১০০০। এ ক্যামেরা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ‘যখন মন বলে হ্যাঁ’ শিরোনামের প্রবন্ধে লিখেছেন, ফটোগ্রাফি ছিল তার প্যাশন। একবার বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির [বিপিএস] এক সভায় একটা নতুন ক্যামেরা উপহার পেয়েছিলেন তিনি। ড্যাডি বলেছিলেন, ক্যামেরাটি তার কাছে একটা যন্ত্রের চেয়ে ঢের বেশি কিছু। তিনি বলেছিলেন, ঘুমোতে যাওয়ার সময় কীভাবে তিনি তার ক্যামেরাটি বালিশের পাশে রাখতেন। যখন তার মন খারাপ হতো, কেমন করে তিনি ক্যামেরাটির সঙ্গে কথা বলতেন এবং সেটাও পাল্টা কথা বলে আস্থা ফিরিয়ে দিত তাকে।’লেখক
দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক
shahadatparvezpix@gmail.com