বর্তমান দুনিয়ায় আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নেতা নির্বাচন করা যতটা না প্রয়োজনীয় প্রাসঙ্গিক কারণে তার থেকে বেশি প্রয়োজন একজন দক্ষ ব্যবস্থাপক। কারণ এখন অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বৃহৎ করপোরেটের পার্থক্য খুঁজে পাওয়া একটু কঠিন। ব্রিটেনের মতো রাষ্ট্রগুলোও, যারা প্রচলিত ধারণা মতে উন্নয়নের চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে তারা হয়তো সবক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা বাজায় রাখতে চায়। যারা সহানুভূতি প্রকাশ ছাড়া কোনোভাবেই অন্যকে নিজেদের সুখের ভাগীদার করতে চায় না তাদের জন্য এটাই সর্বোত্তম ব্যবস্থা। আর এটাই হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোর রক্ষণশীল রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য।
ঋষি সুনাক এমনি এমনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেননি, তার মতো অভিবাসীকে ধীরে ধীরে কয়েক প্রজন্ম ধরে ব্রিটিশ হয়ে উঠতে হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমাদের গ্রামবাংলায় এখনো ‘ব্রিটিশ’ শব্দটি দিয়ে মূলত চাতুর্যকে বোঝানো হয়ে থাকে। সে যাই হোক, এই ৪২ বছর বয়সে তাকে দক্ষ ‘ব্রিটিশ’ হওয়ার জন্য কী না করতে হয়েছে? ব্রিটেনের একের পর এক নামকরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে উইনচেস্টার কলেজ, অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজ, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠান। ব্যবসা সামলিয়েছেন এবং ব্রিটেনের রক্ষণশীল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, ব্রিটিশ হওয়ার প্রচেষ্টা থাকার পরও তিনি তার পূর্বপুরুষের ধর্মীয় চর্চা ও সংস্কৃতি যেমন পুরোপুরি ত্যাগ করেননি তেমনি সহধর্মিণী হিসেবে খুঁজে নিয়েছেন এমন একজনকে যার সঙ্গে বর্তমান ভারতের যোগাযোগ সরাসরি। যদিও ভারতীয়দের জন্য এই চর্চাটা খুব একটা ব্যতিক্রম নয়, তা তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই অভিবাসন করুন না কেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঔপনিবেশিক শক্তি সারা পৃথিবী থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিতে বাধ্য হলেও তথাকথিত নেটিভদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। অনেকের কাছে তো তারাই সভ্যতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড এবং সেই ব্যবস্থার অংশ হতে পারা তো সফলতারই মাপকাঠি। সুযোগ থাকলে কে না সেই সাফল্য অর্জন করতে চায়? ঔপনিবেশিক শাসকরা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যতই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করুক না কেন, তাদের অবহেলার দৃষ্টিতে দেখুক না কেন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকেই ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। আর এদের মধ্যে ভারতীয়রা অগ্রগণ্য বটে।
কে নেই এই তালিকায়? টুইটারের সদ্য বরখাস্তকৃত সিইও পরাগ আগরওয়াল, গুগল-এর সিইও থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস পর্যন্ত। উল্লেখ্য, মুঘলদের হাত থেকে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে তখন ভারতীয় হিন্দুরা শাসক শ্রেণির অংশ হওয়ার জন্য ইংরেজি শিক্ষায় আগ্রহী হয়ে ওঠে আর সেটাই তাদের আজকের এই পর্যায়ে আনতে ভূমিকা রেখেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শুধু শাসক শ্রেণির অংশ নয়, এরাই আপাতদৃষ্টিতে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছেন। এর মধ্যে সম্প্রতি যার নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে তিনি ঋষি শুনাক। তবে ঋষি শুনাকের জন্য পথ কোনোভাবেই মসৃণ ছিল না। মসৃণ হওয়ার কথাও না, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী তো চারটিখানি কথা না।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধরের চাকরি যদি হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হওয়া, তাহলে গ্রেট বিট্রেনের প্রধানমন্ত্রী তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহযোগী। অফিশিয়াল ভাষায় তারা একে ‘অ্যালাই’ বলে থাকেন। একের পর এক কাণ্ডের পর বরিস জনসন যখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রিত্বের মসনদ ছাড়তে বাধ্য হলেন তখন অনেকেই ধরে নিয়েছিল সদ্য পদত্যাগী অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাকই হতে যাচ্ছেন ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। প্রথমদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী লিজ ট্রাসের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও ঋষি সুনাকের বাদামি গাত্রবর্ণ রক্ষণশীল টোরিদের আশ^স্ত করতে পারেনি। যদিও কারোনাকালে অর্থমন্ত্রী হিসেবে ব্রিটেনের অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় তিনি সুনাম কুড়িয়েছিলেন।
যেহেতু টোরিরা তাকে নির্বাচিত করল না তখন হয়তো একবারের জন্য হলেও তার মনে চিন্তা এসেছে আর কত রক্ষণশীল হলে টোরিরা একজন অভিবাসী বংশোদ্ভূতকে তাদের সত্যিকার অংশ হিসেবে মনে করবে। যাই হোক লিজ ট্রাসের ব্যর্থতায় সুনাকের ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েছে। তারপরও অনেক প্রভাবশালী, এমনকি বরিস জনসনও চাচ্ছিলেন না সুনাক কোনোভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদ লাভ করুক। যেখানে কিনা রক্ষণশীলরা অনেক সংগ্রাম করে ব্রেক্সিট অর্জন করেছে সেখানে একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী! তাই ঋষি সুনাক নির্বাচিত হওয়ার পর এমন প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে যেখানে রক্ষণশীল পার্টির অনেকেই এই নির্বাচনকে মেনে নিতে পারছেন না। তারা মনে করছেন ৮৫ শতাংশ শে^তাঙ্গের দেশে একজন অশে^তাঙ্গ প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় কোথায় যেন খটকা লাগে!
প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঋষি সুনাককে ব্রিটেনের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে। পাশাপাশি রাশিয়া ইউক্রেন সংকট এবং যুক্তরাজ্য ও চীন সম্পর্ক নিয়ে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে ঋষি সুনাক টোরিদের রক্ষণশীল নীতি পরিহার করে অপেক্ষাকৃত উদার ও অভিবাসীবান্ধব বা বঞ্চিত পৃথিবীর পক্ষে দাঁড়াতে পারবেন। তিনি যেহেতু একজন অভিবাসী বংশোদ্ভূত প্রধানমন্ত্রী স্বাভাবিকভাবেই টোরিরা তাকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এতে ঋষি সুনাক নিজেকে আরও বেশি রক্ষণশীল হিসেবে প্রমাণ করতে চাইবেন। তাই তার পক্ষে তার সহজাত উদ্যমে কাজ করা যেমন কঠিন হবে তেমনি চ্যালেঞ্জিং হবে একজন ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মদক্ষতা কাজে লাগানো। যার প্রাথমিক প্রমাণ ইতিমধ্যে তিনি মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে দিয়েছেন, ইমেইল কোড অব কন্ডাক্ট ভঙ্গের জন্য মাত্র এক সপ্তাহ আগে পদত্যাগে বাধ্য হওয়া কট্টর রক্ষণশীল হোম সেক্রেটারি ভারতীয় বংশোদ্ভূত সুয়েলা ব্রেভারমানকে আবার স্ব-পদে আসীন করছেন।
শোনা যায় তার অভিবাসন সংক্রান্ত নীতি ও ভীতির কারণেই নাকি ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি আটকে আছে। সুয়েলা ব্রেভারমান শুধু অভিবাসন বিরোধীই নন, তিনি অভিবাসীদের সঙ্গে অনিষ্টকারীদের সম্পর্ক খুঁজে পান এবং তাদের দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এতো গেল একজন অভিবাসীর উত্তরাধিকারীর পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ঔপনিবেশিক কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা। এই গল্পের মধ্যে যতই প্রশ্ন ও সংশয় থাকুক না কেন, তারপরও এর মধ্যেই ইতিবাচকতা খুঁজে পাওয়ার সুযোগ আছে। এখনো দেশে দেশে জাত-পাত ও ধর্মকেন্দ্রিক বিভাজন ও চরমপন্থার যে প্রকাশ দেখা যায় সেই বিবেচনায় এ নিছক কম পাওয়া নয়।
লেখক : উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট
psmiraz@yahoo.com