কৃষিপ্রতিবেশবিজ্ঞান কেন জরুরি

সুইডিশ বিজ্ঞানী এসভান্তে পাবো শারীরবিদ্যা/মেডিসিনে ২০২২ সালে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি নিয়ানডার্থাল মানুষের জিনলিপি তৈরি করেছেন। একজন স্যাপিয়েন্স মানুষ হয়ে নিয়ানডার্থাল জিনলিপি তৈরি বহু জটিল ও দুরূহ একটি কাজ। হয়তো একদিন ডেনোসোভান, ইরেক্টাস, ফ্লোরিয়েনসিস মানুষের জিনলিপিরও পাঠোদ্ধার হবে। চলতি আলাপখানি নিয়ানডার্থাল বা ইরেক্টাস মানুষদের কোনো কাজ নিয়ে নয়। আলাপখানি স্যাপিয়েন্স মানুষদের নিয়ে। ফলমূল আহরণকারী যাযাবর সমাজ থেকে কৃষিজীবী গ্রামীণ সমাজ গড়ে তুলেছিল এই স্যাপিয়েন্সরা। কৃষিকাজের সূচনা করে বদলে দিয়েছিল গোটা দুনিয়া। বুনো প্রাণপ্রজাতিকে জোর করে গৃহপালিত করে তুলেছিল। আবার অন্যভাবে কিছু বুনোপ্রজাতিও মানুষকে গৃহপালিত হতে প্রভাবিত করেছিল। অন্নবস্ত্রের জন্য আজ দুনিয়া নির্ভর করে আছে কৃষির ওপর।

প্রায় ১০ হাজার বছর আগে গড়ে ওঠা এই কৃষিকাজ হত্যা করেছিল অগণিত বুনো প্রাণপ্রজাতি। নির্দয় গণহত্যা আর গণবিলুপ্তি ঘটিয়েই দুনিয়ার ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কৃষিকাজ। কৃষিজীবী কৃষি সমাজ। তারপর দিনেদিনে দুনিয়া যত বেশি কৃষিতে অভ্যস্ত হয়েছে তারচেয়ে অধিক প্রাণপ্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়েছে। বাস্তুতন্ত্র ও প্রতিবেশ হয়েছে ল-ভ-। কারণ একটা গা ছমছম বন বা বিস্তৃত জলাভূমি কিংবা উথালপাথাল পাহাড় কেটে ছেনে চুরমার করেই বানাতে হয়েছে ‘কৃষিকাজের জমি’। প্রকৃতির সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। কিন্তু তার বাদেও দুনিয়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ কিছুটা নিজের মতো করেই বিকশিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু গত প্রায় পঞ্চাশ বছরে কৃষিকাজের জন্য আমূল পাল্টে ফেলা হয়েছে পৃথিবীর ভিত। মূলত ষাটের দশকে শুরু হওয়া তথাকথিত ‘সবুজ বিপ্লবের’ মাধ্যমে ঘটেছে পৃথিবীব্যাপী এক পরিবেশগত অন্যায়। অগণিত উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির গণবিলুপ্তি ঘটেছে। মানুষ কেবল একতরফাভাবে নিজের খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে দুনিয়ার তাবৎ প্রাণপ্রজাতির খাদ্যভা- ছিনতাই করেছে। কারণ সবুজবিপ্লবই কৃষিতে বিদ্যমান স্থানীয় প্রযুক্তি, স্থানীয় জাত ও রূপান্তরিত কৃষিচিন্তাকে হটিয়ে বিদায় করেছে। আর অত্যন্ত সফলভাবে ঘটানো এই পরিবেশগত অন্যায় প্রতিষ্ঠিত করেছে সিনথেটিক সার, রাসায়নিক বিষ, যন্ত্রচালিত সেচ, হাইব্রিড বীজের বাণিজ্যকে।

ইতিহাসের এক নিদারুণ প্রাণপ্রজাতির বিলুপ্তি ও সর্বব্যাপী স্বাস্থ্যহানির কারণে কিন্তু মানুষের বিচার হয়নি, বরং জুটেছে মহাপুরস্কার। বৈচিত্র্যময় স্থানীয় জাতকে সরিয়ে একতরফাভাবে নিজের জায়গা করে নেওয়া ‘উচ্চফলনশীল জাত (উফশী)’ উদ্ভাবনের কারণে ১৯৭০ সালে মার্কিন কৃষিবিজ্ঞানী নরম্যান বোরলগ নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তথাকথিত সবুজবিপ্লব এজেন্ডার মাধ্যমে শান্তিপ্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষুধার বিরুদ্ধে যুদ্ধের বাহাদুরি আজ কাহিল। ষাট বছর ধরে কী দেখছি আমরা? এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জৈব কৃষিনীতি (২০১৬) উল্লেখ করেছে, ...‘‘ ‘সবুজ বিপ্লবের’ সূচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ খাদ্যঘাটতি থেকে বর্তমানে স্বয়ম্ভরতা অর্জন করেছে। এই স্বয়ম্ভরতা অর্জনে কৃষি-রাসায়নিক অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। ফলে মাটি ও জনস্বাস্থ্যে সৃষ্টি হয়েছে বিরূপ প্রভাব। এ প্রভাব হ্রাসকরণের অন্যতম উপায় জৈবকৃষি। কেননা এটি মাটি, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির সমন্বয়ে গঠিত বিধায় ক্রমান্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই কৃষি সৃষ্টি করতে পারে যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একান্ত কাম্য।’’ সবুজবিপ্লব প্রকল্প নিদারুণভাবে ধানসহ শস্যফসলের জাতবৈচিত্র্যকে গুম করেছে।

কৃষিপ্রতিবেশের বিকাশমান সম্ভাবনাকে কিছু জাতসংখ্যার নম্বরে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। ১৯৭১ সালে দেশে চালের উৎপাদন ছিল ১ কোটি মেট্রিক টন। বর্তমানে চালের উৎপাদন বছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। চালের এই যুগান্তকারী উৎপাদনের সঙ্গে কিন্তু কৃষিতে ব্যবহৃত বিষ, সিনথেটিক সার ও কৃষিযন্ত্রপাতির মুনাফা বাণিজ্যকেও হিসাবে আনতে হবে। এই উৎপাদন করতে গিয়ে আমরা কত জেনেটিক সম্পদ হারালাম, কতগুলো কেঁচো-মাকড়সা-মাছ-মৌমাছি আর ব্যাঙের মৃত্যু হলো সেই হিসাবও দাঁড় করানো জরুরি। বাংলাদেশে ১৯৫৬ সাল থেকে কীটনাশকের ব্যবহার শুরু হয়। তখন প্রতি বছর ৩ টন কীটনাশক এবং ৫০০ স্প্রে ব্যবহার করা হতো। উফশী কী হাইব্রিড সংহারী বীজ চাষে দিনে দিনে বিষের ব্যবহার বাড়ছেই।

দেশ স্বাধীনের পর থেকে আমাদের মুখস্থ হয়ে আছে বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। অথচ এই কৃষির ধরন ও মনস্তত্ত্ব নিয়ে আমাদের কোনো পাবলিক তর্ক নেই। দিনকে দিন সবার সামনে পিষে থেঁতলে বদলে যাচ্ছে কৃষির সামগ্রিক চেহারা। বাংলাদেশের কৃষি কেমন হবে, কৃষিজীবন কেমন হতে পারে এ নিয়েও আমাদের কোনো আলাপ নেই। দিন দিন বদলে ফেলা হচ্ছে গ্রামের পর গ্রাম, যেখানে জন্ম নিয়ে কোনোরকমে টিকে আছে সহস্র বছরের কৃষি। বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতিতে কৃষি তো এক পারিবারিক নির্মাণ, কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। কৃষি বাংলাদেশের এক ঐতিহাসিক অনুভূতির নাম। এদেশের মানুষ হাজার বছর ধরে কৃষির এক বিরল দর্শন ও সংস্কৃতি জারি রেখেছে। এদেশের কৃষিধারা মূলত গ্রাম-জনপদের পরিবারনির্ভর। এক একটি গ্রামে, এক একটি জনপদে এখানে ভিন্ন ভিন্ন কৃষিধারা আছে। কৃষিজমির ধরন ও স্থানীয় বাস্তুসংস্থান, গ্রামীণ জীবন, শস্যফসলের বৈচিত্র্য, জনসংস্কৃতি সবকিছু মিলেই আমাদের নানাঅঞ্চলের নানাধারার কৃষি। আর বৈচিত্র্যময় কৃষিজীবনের সম্ভার নিয়েই দেশের কৃষিজগৎ। কিন্তু আমাদের কৃষিজগৎ আজ চুরমার, আমাদের জমি-জলা আজ বিষের ভাগাড়, আমাদের বীজভা- আজ শূন্য। কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে আমরা এত বেশি বিষ ও প্লাস্টিক ব্যবহার করছি যে, আজ আমাদের খাদ্যশৃঙ্খল বিষাক্ত, মায়ের দুধেও মিলছে প্লাস্টিক। আমরা মানুষ বা কোনো প্রাণপ্রজাতির খাবারকেই নিরাপদ রাখিনি। আমরা কেবল চেয়েছি উৎপাদন আর উৎপাদন, কারণ আমরা সবকিছুই বাজারে বিক্রি করতে চেয়েছি। মুনাফার ইমারত বানাতে দিশেহারা হয়েছি।

আজ প্রমাণিত হয়েছে, বিশ্বব্যাপী রোগশোক, অসুস্থতা আর মহামারীর কারণ হচ্ছে প্রতিবেশগত বিশৃঙ্খলা ও অনিরাপদ খাদ্যব্যবস্থা। আজ দুনিয়াজুড়ে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে সত্য কিন্তু এই খাদ্যব্যবস্থায় অভ্যস্ত মানুষসহ গৃহপালিত প্রাণীর শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা খরচ ও ভোগান্তি বেড়েছে সহস্রগুণ বেশি। আগে ক্যানসার, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, হাড়ক্ষয়সহ রোগ ও উপসর্গের কথা খুব একটা শোনা যেত না। আজ এসব অসুস্থতা সব পরিবারের নিত্যসঙ্গী। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, করোনার মতো অণুজীবঘটিত মহামারী সংকট এত দ্রুত বাড়ছে ও বদলাচ্ছে যে আজ স্যাপিয়েন্স মানুষের টিকে থাকাই যেন এক প্রশ্নের সম্মুখীন। পাশাপাশি আমাদের লাগাতার ভোগবিলাসিতা, জীবাশ্ম জ্বালানির নির্মম ব্যবহার ও বেহিসাবি কার্বন ব্যবহারে দুনিয়ার জলবায়ুপঞ্জিকা উল্টেপাল্টে গেছে। মাত্র দুইশ বছরে মানুষ জলবায়ুকে নিদারুণভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। আজ আমাদের রাসায়নিক কৃষি এই জলবায়ু সংকট সামাল দিয়ে দাঁড়াতে পারছে না। প্রমাণিত হচ্ছে এখনো গ্রামদুনিয়ায় কোনোমতে টিকে থাকা দু’চারটে দেশি শস্যফসলের জাত আর গ্রামীণ কৃষিকারিগরিই জলবায়ু সংকট সামাল দিতে সক্ষম। কিন্তু এমনসব নির্দয় সংকট সামনে রেখে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো কিছুই মানছে না।

সবুজবিপ্লবের ক্ষত তাদের থামাতে পারেনি, তারা এখন প্রাণসম্পদের প্রাকৃতিক জিনসম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও দখল করতে মরিয়া। শুরু করতে চাইছে আরেক ধ্বংসের কাহিনী, ‘জিনবিপ্লব’। স্মরণে রাখা জরুরি, বেগুনের আদি জন্মভূমি হয়েও বাংলাদেশ ‘জিন পরিবর্তিত’ বিটিবেগুন দেশে ছাড় দিয়েছিল। কিন্তু গ্রামেগঞ্জে খবর নিয়ে দেখা গেল এই জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড বেগুন জনপ্রিয় হয়নি, কৃষক ও ভোক্তা সমাজ দেশি ও সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ‘উফশী’ বেগুন জাতের ওপরই নির্ভর করছে।  

তো, এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় কী? আগে চিন্তা করা জরুরি আমরা মনে করছি কি না এই সংকট আমাদের তৈরি। এটিও ঠিক করা জরুরি আমরা এই সংকট থেকে সবাইকে নিয়ে উত্তরণ চাই কি না। কৃষির এক পরস্পরনির্ভরশীল রূপান্তরে সবাইকে দেখতে চাই কি না? কারণ সব শ্রেণি, পেশা, বর্গের মানুষের এটা বোঝা জরুরি যে, কৃষি বা খাদ্যব্যবস্থা শুধু কৃষকের ব্যাপার নয়, শুধু কৃষকের বা উৎপাদকের প্রশ্ন নয়, এটি একইসঙ্গে ভোক্তা, ক্রেতা, পরিবেশনকারী সবার বিষয়। সব ধরনের পেশাজীবী মানুষ যদি একসঙ্গে এখানে কাজ না করে তাহলে আমরা আমাদের প্রাণপ্রকৃতির সবার জন্য কাক্সিক্ষত খাবারের জায়গায় পৌঁছাতে পারব না। এই জায়গায় পৌঁছানোর জন্য একটি স্বপ্ন, একটি ব্যবস্থা, একটি বিজ্ঞান, কিংবা এক জনআন্দোলন আজ ‘কৃষি প্রতিবেশবিজ্ঞান বা অ্যাগ্রোইকোলজি’ প্রত্যয় হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছে।

এই কৃষিপ্রতিবেশবিজ্ঞান আমাদের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ রসায়ন। এই রসায়নে বিষ চলে না, খবরদারি চলে না, দখল বা ছিনতাই চলে না, মুনাফা ও পণ্যমানসিকতা চলে না। এই কৃষিপরিসরে প্রাণপ্রজাতির সবার প্রতি সবার এক শ্রদ্ধাশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মানুষ একটি মৌমাছি বা ব্যাঙের কথা মনে রাখে। মানুষ মনে রাখে মৌমাছি পরাগায়ণের মাধ্যমে ক্ষেতের ফসলের উৎপাদন বাড়িয়েছিল, ব্যাঙ পতঙ্গ খেয়ে ফসলহানি কমিয়েছিল। মানুষ তাই জমিতে বিষ দিয়ে ব্যাঙাচি মারে না, ব্যাঙের বসত জলাভূমি দখল করে কারখানা বানায় না। উৎপাদন থেকে পরিবহন, মজুদকরণ, পরিবেশন, বিক্রি বা বিনিময় কোথাও খাদ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ বা ভোগান্তি থাকে না কারও মনে। মানুষ বিশ্বাস করতে শিখে, মানুষ আশ্বস্ত ও বিশ্বস্ত হওয়ার দীক্ষা নেয়। বৃহৎ কৃষিপ্রতিবেশের ময়দানে আজ অর্গানিক কৃষি, নিরাপদ কৃষি, জৈবকৃষি, প্রাকৃতিক কৃষি, লোকায়ত কৃষি, পারমা কালচার, জিরো বাজেট ফার্মিং, প্রাণবৈচিত্র্য নির্ভর কৃষিসহ নানা নামে কৃষিকাজ ও কৃষিআন্দোলন দানা বাঁধছে।

কেবল পরিবেশগত, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, প্রতিবেশগতভাবেই নয়; কৃষিপ্রতিবেশবিদ্যা সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করে। কারণ এখানে কৃষিজীবী সমাজ নেতৃত্ব দেয় এবং কৃষির রূপান্তরে নিজে ভূমিকা পালন করে। চলমান করোনা মহামারী আবারও প্রমাণ করেছে প্রাণপ্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতাই সব সংকটের কারণ। আর জারি রাখা বহুজাতিক কোম্পানি নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থাই বরাবরই এই বিচ্ছিন্নতাকে আরও বেশি প্রকট করে তুলে। এই নিয়ন্ত্রণ ও বাহাদুরি ছিন্ন করে কৃষিকাজকে নিরাপদ ও স্বনির্ভর করে বিকশিত হওয়ার জায়গা করে দেওয়া জরুরি।

কৃষিপ্রতিবেশবিজ্ঞান হতে পারে স্যাপিয়েন্স মানুষের দীর্ঘযাত্রায় এক ছোট্ট কৃষিপদক্ষেপ। 

লেখক: প্রাণবৈচিত্র্য গবেষক ও লেখক

animistbangla@gmail.com