শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের নতুন বিড়ম্বনা

২০২২ শিক্ষাবর্ষ প্রায় শেষ। আর কিছুদিন পরেই শুরু হবে স্কুলগুলোর বার্ষিক পরীক্ষা। অথচ গত ৩১ অক্টোবর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি পাঠিয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এখন শেষ মুহূর্তে এ পদ্ধতির বাস্তবায়ন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। তবে এ বছরও মাধ্যমিকের মূল্যায়ন থাকছে আগের বছরগুলোর মতোই।

করোনার প্রাদুর্ভাবে গত দুই বছর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) এবং জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) পরীক্ষা হয়নি। তবে এ বছর থেকেই স্কুলগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে এ দুই পরীক্ষা নেওয়া হবে না। পঞ্চম শ্রেণিতে এ বছর নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হচ্ছে। আর অষ্টম শ্রেণিতে মাধ্যমিকের অন্যান্য শ্রেণির মতোই বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, প্রত্যেকটি বিষয়ে পাঁচটি শ্রেণি পরীক্ষা থেকে মোট নম্বরের ৪০ শতাংশ এবং বাকি ৬০ নম্বরের ওপর তৃতীয় প্রান্তিক অর্থাৎ বার্ষিক পরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেকটি শ্রেণি পরীক্ষা ২০ নম্বরের ওপর অনুষ্ঠিত হবে। এরপর পাঁচটি শ্রেণি পরীক্ষা থেকে ৪০ শতাংশ নম্বর চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য বিবেচিত হবে। এ শ্রেণি পরীক্ষা ও তৃতীয় প্রান্তিকের পরীক্ষার নম্বর যোগ করে ২০২২ সালের অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।

শ্রেণি মূল্যায়নের ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বলছে, বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে শোনা, বলা, পড়া ও লেখার ব্যাপারে শিক্ষার্থীর দক্ষতা পরিমাপ করতে হবে। গণিত বিষয়ে গাণিতিক ধারণা, প্রক্রিয়াগত ধারণা এবং সমস্যা সমাধানের ওপর লিখিত শ্রেণি পরীক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ^ পরিচয় এবং অন্যান্য বিষয়ে বিষয়গত জ্ঞান, বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার জ্ঞান, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ এবং অনুশাসন প্রভৃতি পরিমাপ করতে হবে। বিদ্যালয় খোলার তারিখ থেকে যতগুলো শ্রেণি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়েছে, তার মধ্যে যে কয়টিতে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে এমন পরীক্ষার পাঁচটির নম্বর গণনা করতে হবে।

বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার সাজাপুর ফুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জুলফিকার আলী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কিছুদিন আগে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি পেয়েছি। কিন্তু প্রতি বিষয়ে ২০ নম্বরের পাঁচটি শ্রেণি পরীক্ষা নিতে হলে পুরো বছরই প্রয়োজন। অনেক স্কুল শ্রেণি পরীক্ষা ঠিকমতো নেয়নি, আবার অনেক স্কুল নম্বর সংরক্ষণ করেনি। যদি বছরের শুরুতে আমরা এ মূল্যায়ন পদ্ধতি পেতাম তাহলে এর পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হতো। এখন যতদূর করা যায় সেটাই আমরা করব।’

জানা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরেও দেশে হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। যেগুলো মূলত মাধ্যমিকের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়া দেশে ৪০ থেকে ৫০ হাজার কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। তারাও প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠদান করালেও তাদের নতুন এ মূল্যায়ন পদ্ধতির কিছুই জানানো হয়নি। অথচ প্রাথমিকের সব শিক্ষার্থী একই বই পড়ে। নতুন যে শিক্ষাক্রম চালু হচ্ছে সেটাও সব শ্রেণির জন্য। ফলে এসব বিদ্যালয়ে কীভাবে মূল্যায়ন হবে তা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষকরা।

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ মো. রহমত উল্লাহ্্ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। কিন্তু মূল্যায়নের ব্যাপারে আমাদের নতুন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া প্রত্যন্ত এলাকার সরকারি প্রাথমিকে তো শ্রেণি পরীক্ষাই নেওয়া হয়নি। কিন্ডারগার্টেনগুলোও চলে তাদের ইচ্ছেমতো। তাহলে তারা কীভাবে মূল্যায়িত হবে। আর আমাদের সংযুক্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কীভাবে মূল্যায়ন করব? আসলে এক ধরনের বিদ্যালয় দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকায় নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।’

মাধ্যমিকের মূল্যায়নের ব্যাপারে মো. রহমত উল্লাহ্্ বলেন, ‘জেএসসি পরীক্ষা হবে না, সেটা আমরা জেনেছি। তাদের মূল্যায়নের ব্যাপারে নতুন কোনো নির্দেশনাও পাঠানো হয়নি। ফলে আগের বছরগুলোতে অন্যান্য শ্রেণিতে যেভাবে বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে থাকি, এবার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও একইভাবে বার্ষিক পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি।’

নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বলা হয়েছে, জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১-এ প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অনুমোদিত মূল্যায়ন নীতিমালায় প্রাথমিক স্তর থেকে এসএসসি পরীক্ষার আগে কোনো ধরনের পাবলিক পরীক্ষা অর্থাৎ পিইসি, জেএসসি বা জেডিসি পরীক্ষা না গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম শ্রেণি এবং ২০২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে নতুন বই প্রবর্তন সাপেক্ষে শতভাগ ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হবে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ধারাবাহিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নের সংমিশ্রণে মূল্যায়ন ব্যবস্থা থাকবে।

জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় যখন চেয়েছে তখনই আমরা মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি করে দিয়েছি। আমরা খুবই কম সময় নিয়েছি। যেহেতু আগামী বছর থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হচ্ছে, তাই সে আলোকেই মূল্যায়ন পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। তবে এটা ঠিক, যদি স্কুলগুলোতে এ মূল্যায়ন পদ্ধতি আরও আগে পাঠানো যেত, তাহলে বাস্তবায়নে সুবিধা হতো।’