সৌদি আরব ও ইরান মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দুই প্রতিবেশী দেশ যারা আঞ্চলিক আধিপত্য বজায় রাখতে যুগ যুগ ধরেই প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। দুই রাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক বিভেদ জাতিগত পরিচয়েরইরান পারসিক আর সৌদি আরব জাতিসত্তার তীর্থ। এ ছাড়া তাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতার অন্যতম ভিত্তি দুদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্মীয় পার্থক্য। এ দুটো দেশ ইসলাম ধর্মের মূল দুটো শাখার শুধু অনুসারীই নয়, দুই শাখার প্রধান নেতাও বটে। ইরান শিয়া মুসলিমদের নেতা এবং সৌদি আরব সুন্নি মুসলিমদের নেতা। ধর্মীয় এই বিভাজন মধ্যপ্রাচ্যের বাকি মানচিত্রেও দেখা যায়। বাকি দেশগুলোর কোনোটিতে হয়তো শিয়া আবার কোনোটিতে সুন্নি অনুসারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাদের কেউ ইরানের সঙ্গে, আবার কেউ সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরব-যেখানে ইসলামের জন্ম হয়েছে, তারা নিজেদের মুসলিম বিশ্বের নেতা বলে দাবি করে। কিন্তু এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ইরান। সাম্প্রতিককালে ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এই চ্যালেঞ্জ নতুন মাত্রা লাভ করে। এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ওই অঞ্চলে নতুন এক ধরনের রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। এক ধরনের বিপ্লবী মোল্লাতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং তাদের একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে ইরানের বাইরেও এমন রাষ্ট্রের মডেল ছড়িয়ে দেওয়া। অন্যদিকে সৌদি আরব তার মতাদর্শকে বাকি মুসলিম বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানবিরোধী অন্যতম বৃহৎ শক্তি ছিলেন ইরাকি প্রেসিডেন্ট ও সুন্নি আরব নেতা সাদ্দাম হোসেন। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানে তাকে ক্ষমতা থেকে হটানো হয়। কিন্তু এর ফলেই ইরানের সামনে থেকে বড় একটি সামরিক বাধা দূর হয়, খুলে যায় বাগদাদে শিয়া-প্রধান সরকার গঠনের পথ। শুধু তা-ই নয়, এরপর থেকে দেশটিতে ইরানের প্রভাব বেড়েই চলেছে। ২০১১ সাল থেকে আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। সরকারবিরোধী এসব আন্দোলন, যা ‘আরব বসন্ত’ নামে পরিচিত, পুরো অঞ্চলজুড়েই বিভিন্ন দেশকে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করে তোলে। এই টালমাটাল পরিস্থিতিকে সৌদি আরব ও ইরান নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে তাদের প্রভাব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে, বিশেষ করে সিরিয়া, বাহরাইন এবং ইয়েমেনে। এর ফলে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস ও শত্রুতা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইরানের প্রভাব বাড়তে থাকায় মরিয়া হয়ে উঠেছে সৌদি আরব।
ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে শত্রুতা দিনে দিনে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে, কারণ আঞ্চলিক নানা লড়াইয়ে বিভিন্নভাবে ইরান জয়ী হচ্ছে। তার ওপর পেছনে বাইরের শক্তির খেলাও আছে। সৌদি আরবকে সাহস জোগাচ্ছে আমেরিকা। আর তেহরানকে নিয়ন্ত্রণে সৌদি আরবকে সমর্থন দিচ্ছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের একটি ভয় হচ্ছে, সিরিয়ায় ইরানপন্থি যোদ্ধারা জয়ী হতে থাকলে একসময় তারা তাদের সীমান্তের কাছে চলে আসতে পারে। ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে যে পরমাণু চুক্তি সই হয়েছিল ইসরায়েল ও সৌদি আরব তার তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। তাদের কথা ছিল, এ রকম একটি চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক বোমা বানানোর আকাক্সক্ষা থেকে ইরানকে বিরত রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। মোটা দাগে বলতে গেলে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র শিয়া-সুন্নি বিভাজনে বিভক্ত। সৌদি শিবিরে আছে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য সুন্নিপ্রধান দেশগুলো হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মিসর এবং জর্ডান। অন্যদিকে ইরানের শিয়া শিবিরে আছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ, লেবাননের হিজবুল্লাহ গ্রুপ। ইরাকের শিয়া নিয়ন্ত্রিত সরকারও ইরানের মিত্র, আবার একই সঙ্গে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে যুদ্ধে তারাও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে এই দুটো দেশের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নানা কারণেই যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের শীতল যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ইরান ও সৌদি আরব একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করছে না ঠিকই, কিন্তু বলা যায় যে তারা নানা ধরনের ছায়া-যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে তারা একেক গ্রুপকে সমর্থন ও সহযোগিতা দিচ্ছে যেগুলোর একটি আরেকটির বিরোধী। এই সমীকরণের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে সিরিয়া। উপসাগরীয় সমুদ্রপথেও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে ইরানের বিরুদ্ধে। এই চ্যানেল দিয়ে সৌদি আরবের তেল পাঠানো হয় বিভিন্ন দেশে। সম্প্রতি এ রকম বেশ কটি তেলের ট্যাংকারে হামলার জন্য ওয়াশিংটন ইরানকে দায়ী করেছে। এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে তেহরান। এখনো পর্যন্ত ইরান ও সৌদি আরব পরোক্ষভাবে বিভিন্ন যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে কিন্তু কখনো তারা নিজেদের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার প্রস্তুতি নেয়নি। তবে সৌদি আরবের অবকাঠামোতে হুতিদের সাম্প্রতিক বড় ধরনের হামলা তেহরান ও রিয়াদের শত্রুতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার সঙ্গে আছে উপসাগরীয় চ্যানেলে তেলবাহী জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরির বিষয়টিও। অনেকেই মনে করছেন, এসবের ফলে এই দুটো দেশের উত্তেজনা হয়তো এখন আরও ব্যাপক সংঘাতেও রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলো বহু দিন ধরেই ইরানকে দেখে আসছে এমন একটি দেশ হিসেবেযারা মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। সৌদি নেতৃত্ব ইরানকে দেখছে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে। আর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তো ইরানের প্রভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় যেকোনো ব্যবস্থা নিতেই প্রস্তুত। অবশ্য, পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে যদি শেষ পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধ লেগে যায়, তাহলে সেটা হবে দুর্ঘটনাবশত, তাদের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কমই। এদিকে ইরানের সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাইডেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের প্রতি সহিংস আচরণের কারণে ইরানকে মূল্য চোকানোর ব্যবস্থা করবে যুক্তরাষ্ট্র এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতার জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের মূল্য দিতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে সহিংস আচরণের জন্য তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সেখানে সম-অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার দাবিতে নারী ও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। ইরানের যেসব নারী ও নাগরিক সাহসের সঙ্গে বিক্ষোভ করছেন, তাদের সবার পাশে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে। ইরানের কঠোর পর্দাবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ২২ বছরের মাহসা আমিনিকে আটক করে নীতি পুলিশ। তাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান মাহসা। তবে ইরানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন, সে ব্যাপারে কোনো ইঙ্গিত দেননি বাইডেন।
বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে ইরান। তেহরান বলেছে, এই পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সন্দেহ, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে। এদিকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খোমেনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। এমনিতেই গত কয়েক দশকের মধ্যে সময়ের সবচেয়ে বৈরী সম্পর্ক পার করছে মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র ইরান ও সৌদি আরব। ১৯৭০-এর দশকের শেষ থেকে শুরু হওয়া এ বৈরিতা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে তিক্ত হয়েছে অনেক। শিয়া রাষ্ট্র ইরানকে কোণঠাসা করে নিজেদের মুসলিম বিশ্বের নেতা রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রয়াস হিসেবে রিয়াদ হাত মেলাতে দ্বিধা করেনি মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোঁড়া ইসরায়েলের সঙ্গেও। সঙ্গে মিত্র যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে আটঘাট বেঁধেছেন হালের সৌদি ক্রেজ যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনিকে হিটলার আখ্যা দিয়ে বক্তব্য পর্যন্ত প্রদান করেছেন যুবরাজ সালমান। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন জনগণের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সৌদি রাজপরিবারের দ্বন্দ্ব ধামাচাপা দেওয়ার জন্য ইরানকে সর্বোচ্চ হুমকি হিসেবে দাঁড় করাতে চাচ্ছে রিয়াদ।
সম্প্রতি সৌদি উদ্বেগের পালে হাওয়া লাগিয়েছে সিরিয়া ও ইয়েমেনে ইরানের সামরিক উপস্থিতি। এ অঞ্চলে ইরানের আধিপত্য ক্ষুণœ করতে তাই রিয়াদ সর্বোচ্চ চেষ্টাই চালিয়ে যাবে এটা নিশ্চিত। ইরান আদতে সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধে না জড়ালেও তারা এর আগে হুমকি প্রদান করেছে যে পবিত্র নগরী মক্কা ও মদিনা ছাড়া সৌদি আরবের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। আঞ্চলিক প্রভাব কায়েমের প্রতিযোগিতার দরুন সৌদি আরব তার মিত্রদের নিয়ে গঠন করেছে সামরিক সৌদি জোট, ইয়েমেনে যাদের বিরুদ্ধে আছে শিশু হত্যার অভিযোগ।
অন্যদিকে, ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব আর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার সুযোগে এরই মধ্যে তেলের রেকর্ড দরপতন প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ব। যদি ইরান-সৌদি দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে তবে তেলের বাজার আরও হ্রাস পাবে বলে প্রতীয়মান হয়। এতে করে কার্যত লাভবান হবে অপরাপর রাষ্ট্রগুলো, ক্ষতিগ্রস্ত হবে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক অর্থনীতি। সৌদি আরবের সঙ্গে সুর মিলিয়ে এরই মধ্যে বাহরাইন, আরব আমিরাত, জর্ডান ও মিসর ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক ও কাতার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে ইরানের। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বিভক্তি খুব স্পষ্ট হয়ে গেছে। সিরিয়ায় ইরানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে রাশিয়ার একাট্টা হওয়ার কারণে সৌদি আরব বিপাকে পড়েছে, বিষয়টি রিয়াদকে বেশ চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। এজন্য যুক্তরাষ্ট্রের চোখে ইরানকে হুমকি হিসেবে দাঁড় করানোয় ইহুদিবাদী ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে তারা বেশ সফলও হয়েছে। এরই মধ্যে ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্প বেরিয়ে যাওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক ধরনের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে, যা মূলত পৃথিবীর বৃহৎ শক্তির বিভক্তিকেই নির্দেশ করে।
লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট
raihan567@yahoo.com