কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এস আই এম আকতার কামাল আজাদ। তিনি একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার তালিকাভুক্ত ইয়াবা কারবারি। তার বিরুদ্ধে রয়েছে অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করার অভিযোগ। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ, সরকারি খাসজমি দখল করে বিক্রি, সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলন, সুদের কারবার ও বিচারের নামে জনগণকে হয়রানি করা, স্কুলের অর্থ আত্মসাৎ, উন্নয়নকাজের কথা বলে এলাকাবাসীর কাছ থেকে চাঁদা আদায়সহ নানা অভিযোগ রয়েছে। জেলা বিএনপির সদস্য কাউন্সিলর আকতার কামালের কাছে দুর্নীতিই যেন নীতি।
জেলা প্রশাসন ও পুলিশ, আদালত এবং এলাকাবাসীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে টানা দ্বিতীয়বারের মতো কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করছেন আকতার কামাল। আর সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি হয়ে উঠেছেন ওই ওয়ার্ডের অপরাধীদের গডফাদার। মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাসিক মাসোহারা আদায়, ছেলে, ভাই-ভাবি ও ভাইপোকে দিয়ে ইয়াবা কারবার করান কাউন্সিলর আকতার কামাল এমন তথ্য পেয়ে তাকে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা ইয়াবা কারবারি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
স্থানীয়দের দাবি, নাজিরার টেক-সমিতিপাড়া ও কুতুবদিয়ার একাধিক মাদক ব্যবসায়ীই আকতার কামালের আশীর্বাদপুষ্ট। গত বছর ইয়াবাসহ কামালের ভাই নুর আলম ও তার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশ। পরে তারা জামিনে বেরিয়ে আবার মাদক কারবার শুরু করেন। সম্প্রতি নুর আলম মাদকের আরেকটি চালান পাচার করতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে জেলে রয়েছেন।
কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শ গ্রাম সমাজ কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন বলেন, ‘গত বছর আকতারের ছেলে মানিক ও তার বন্ধুকে ৭-৮ লিটার মদসহ এলাকাবাসী আটক করে। পরে কামালের অনুরোধে আমরা তাদের ছেড়ে দিই।’
ইয়াবা কারবারের পাশাপাশি টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের ভোটার করছেন আকতার কামাল এমন অভিযোগ এখন মানুষের মুখে মুখে। এমনকি জেলা নির্বাচন অফিসও অভিযোগ পেয়ে যাচাই-বাছাই করে ওই ওয়ার্ডের শতাধিক রোহিঙ্গাকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য চূড়ান্ত করে রেখেছে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলার শীর্ষ ইয়াবা ও মানব পাচারকারী রোহিঙ্গা রশিদ মাঝি সম্পর্কে কাউন্সিলর আকতার কামালের বেয়াই। তিনি কিছুদিন আগে ১০ হাজার ইয়াবাসহ সমিতিপাড়া থেকে র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন। সেই চিহ্নিত রোহিঙ্গা রশিদ মাঝি এখন কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার। অভিযোগ আছে, রোহিঙ্গা রশিদ মাঝিই মূলত তার ইয়াবা সিন্ডিকেটের প্রধান হিসেবে রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু রশিদ মাঝিই নন, কুতুবদিয়াপাড়ায় আক্তার কামালের সহায়তায় ১ নম্বর ওয়ার্ড থেকে এনআইডি নিয়েছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত রোহিঙ্গা জিয়াউর রহমান, রোহিঙ্গা শফি আলম, মো. আলম, নুর আলম, ইসমাঈল, খুরশিদা, নুর বেগম, লায়লা বেগম, শমজিদা, মো. রফিক, ইউনুছ, মো. আব্দুর রহমান, মো. রুবায়েত গণী, জাহাঙ্গীর, আবু তাহের, মো. শফিক, মো. ইউসুফ, সিরাজুল মোস্তাফা, দিল মোহম্মদ, নুরুল আলম, মীর কাশেম, সানজিদা, নূর কায়দা বেগম, আনোয়ারা বেগম, নুর বাহার, তৈয়াবা বেগম, সাজেদা বেগম। তাদের প্রত্যেকেরই বাবা-মা রোহিঙ্গা ক্যাম্প অথবা মিয়ানমারে রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা শাহাদাত হোসাইন বলেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহযোগিতা ছাড়া কোনো রোহিঙ্গা ভোটার হতে পারে না। ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১০০-এর ওপর রোহিঙ্গা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিযোগ তদন্ত করে আমরা তাদের বাতিলের চূড়ান্ত তালিকায় রেখেছি।
এলাকাবাসীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, কাউন্সিলর আকতার কামাল ও তার ভাইপো ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি সমুদ্র তীরবর্তী নাজিরটেক এলাকার বালুরচরকে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে গড়ে তুলেছে মোস্তাকপাড়া। এ ছাড়া নাজিররার টেক সমুদ্রের মোহনা ও পশ্চিম কুতুবদিয়াপাড়া খালে মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করছেন তিনি এবং তার আরেক ভাইপো মানব পাচার মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আনিসুর রহমান।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা (এসি ল্যান্ড) জিল্লুর রহমান বলেন, ওই এলাকায় সমুদ্র থেকে বালু উত্তোলনের খবর পেয়ে আমি দুদফা সেখানে অভিযান চালিয়েছি। অভিযান শুরুর কিছুক্ষণ পরেই কাউন্সিলর আকতার কামাল এলাকার বিপুলসংখ্যক মানুষজন নিয়ে এসে অভিযানকাজে ব্যাঘাত ঘটায়।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউএনডিপিসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার অর্থায়নে এবং পৌরসভার তত্ত্বাবধানে ১ নম্বর ওয়ার্ডে রাস্তা নির্মাণ, সংস্কার ও ব্রিজ এবং ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলছে। কিন্তু সেই সব কাজের জন্যও এলাকাবাসীর কাছ থেকে নানা অজুহাতে চাঁদা নিচ্ছেন ওই কাউন্সিলর।
এ বিষয়ে নাজিরটেক শুঁটকি গুঁড়া সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজি রহমত উল্লাহ বলেন, ‘রাস্তা নির্মাণ, মাটি ভরাট, ব্রিজ কিংবা ফুটপাত নির্মাণ যা-ই বলুন না কেন, এলাকাবাসীর কাছ থেকে নানা অজুহাতে চাঁদা নেন কাউন্সিলর আকতার কামাল। আমি নিজেও কয়েকবার দুই-তিন হাজার করে চাঁদা দিয়েছি।’
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণের কারণে ১ নম্বর ওয়ার্ডটি অধিগ্রহণ করেছে সরকার। সেই কারণে ওই ওয়ার্ডে বসবাসকারীদের খুরুশকুলের আশ্রয়ণ প্রকল্পে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দের ফ্ল্যাট আগে বুঝিয়ে দিয়ে এবং নানা অজুহাতে ৩০০ জনের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে নিয়েছেন কাউন্সিলর ও তার স্বজনরা। এ ছাড়া এলাকায় কোনো দিন না থেকেও কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইলে বসবাস করে কাউন্সিলের বোন মিনা আকতার একটি ফ্ল্যাট পেয়েছেন সেখানে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিক্ষক নুরুল হাসেম বলেন, ‘যতটুকু জমি এ পর্যন্ত সিভিল এভিয়েশন দখলে নিয়েছে আমাদের বসতবাড়ি তার থেকে অনেক দূরে। প্রথম বরাদ্দে আমার বাবা আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ফ্ল্যাট পেয়েছেন। কিন্তু সেই ফ্ল্যাটে আমাদের ৫ পরিবারের জায়গা সংকুলান হবে না বিধায় আমরা সবাই যাইনি। পরে কাউন্সিলর পক্ষ থেকে আমাদের ১ গন্ডা জমির জন্য ১০ হাজার টাকা দিতে বলা হয়, না হয় বাড়ি খালি করতে বলা হয়। তখন আমরা কাউন্সিলরের ফুফাতো বোনের স্বামী জিল্লুর রহমানকে ১ গন্ডা জমির জন্য ১০ হাজার টাকা দিই।’
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে রাখা জামানতের ও রায়ের টাকা দেন না কাউন্সিলর আকতার। এ ছাড়া খালি স্ট্যাম্প ও ফাঁকা চেক নিয়ে সুদের কারবারও করেনি তিনি। লাখে ১০ হাজার টাকা সুদ নেন তিনি। তার কাছে এমন প্রায় তিন শতাধিক খালি স্ট্যাম্প ও চেক রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, কাউন্সিলর আকতার কামাল প্রায় এক যুগ ধরে কুতুবদিয়াপাড়া নিম্নমাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি। তিনি স্কুলের নামে নানা জায়গা থেকে বরাদ্দ আনলেও স্কুলের কোনো উন্নয়ন করেন না। এমনকি পরিচালনা কমিটির কোনো বৈঠকও করেন না ওই নেতা।
এ বিষয়ে পরিচালনা কমিটির কোষাধ্যক্ষ ও স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বাদশা মাঝি বলেন, ‘আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব আমার কাছে নাই। আমি নামেই কোষাধ্যক্ষ। পরিচালনা কমিটির কোনো বৈঠক হয় না। কোথা থেকে অনুদান নিচ্ছেন, কত নিচ্ছেন, তার কিছুই জানি না।’
এদিকে কাউন্সিলর আকতার কামালের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আদালত থেকে মাছ ধরার একটি ট্রলার জিম্মায় নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশেক ইলাহী শাহজাহন নূরী বলেন, ট্রলারের সব ধরনের কাগজপত্র জালিয়াতি করে আদালত থেকে একটি ট্রলার থেকে জিম্মা নিয়েছিলেন আকতার কামাল। তার জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণ হলে তাকে ট্রলারটি ফেরত কিংবা যে শর্তে জিম্মা নিয়েছিলেন সেই টাকা আদালতে জমা দিতে বলা হয়। তবে নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি উচ্চ আদালতে একটি আবেদন করেছেন।
তবে অভিযুক্ত কাউন্সিলর আকতার কামাল আজাদ বলেন, ‘কী কারণে আমাকে ইয়াবার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, আমি জানি না।’ রোহিঙ্গা ভোটার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে আমি কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করছি। সেই থেকে স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণকে ভোটার করতে কাজ করছি। যারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে পেরেছে, তাদের বেলায় আমি সুপারিশ করেছি। অন্যত্র করিনি। তবে তারা বেয়াই রশিদ মাঝি ও ব্যক্তিগত সহকারী জিয়াউর রহমানের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।’
অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করে কাউন্সিল আকতার কামাল বলেন, রাজনৈতিক শত্রুতা ও আমার জনপ্রিয়তায় ইর্ষান্বিত হয়ে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। যারা এসব তথ্য দিচ্ছে, তাদের সাহস থাকলে আমার সামনে এসে কথা বলুক।’