ক্রিকেটের দেশে গেল টি-টোয়েন্টির মুকুট

মেলবোর্নে রবিবারের ফাইনালটা জিতেছেন বাবর আজম এবং ২০৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, এমন একটা ‘মিম’ ভেসে বেড়াচ্ছিল অন্তর্জালের জগতে। ১৯৯২ সালে এই মেলবোর্নেই বিশ্বকাপ জিতেছিলেন ইমরান খান, ২০১৮ সালে হয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আরও একটা ফাইনাল তাই উসকে দিচ্ছিল সেই রোমাঞ্চই।

৯২’তে ইমরানের হাতে ওয়াসিম আকরাম ছিলেন। জাভেদ মিয়াঁদাদ ছিলেন। ইমরান নিজে করেছিলেন পাকিস্তান ইনিংসের সর্বোচ্চ ৭২ রান, বড়ে মিয়ার অবদান ছিল ৫৮ রান। আকরাম ১৮ বলে ৩৩ করার পাশাপাশি জাদুকরী দুটো ডেলিভারিতে বোল্ড করেছিলেন অ্যালান ল্যাম্ব ও ক্রিস লুইসকে। বাবর সেই ছাঁচে কিছুই করতে পারলেন না। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে ডেভন কনওয়ের বদান্যতায় হাফসেঞ্চুরির বাইরে তো ব্যাটিংয়ে তেমন কিছুই করতে পারেননি। কাল আদিল রশিদের গুগলিতে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে আউট হয়েছেন ২৮ বলে ৩২ রান করে, বাউন্ডারি মাত্র ২টি।

স্যাম কারান আর আদিল রশিদই চেপে ধরেছিলেন পাকিস্তানকে। বৃষ্টির আশঙ্কা থাকার পরও হয়নি, তবে উইকেটটা ছিল আর্দ্র এবং তাতে ব্যাট করাও ছিল বেশ কঠিন। কারান গোটা আসরেই দারুণ ছন্দে, ফাইনালের আগেই নিয়েছিলেন ১০ উইকেট আর রবিবারে নিয়েছেন আরও ৩টি। মোহাম্মদ রিজওয়ানকে বোল্ড করে শুরু, এরপর শান মাসুদ আর মোহাম্মদ নাওয়াজের উইকেটও তুলে নিয়েছেন কারান। ৪ ওভারে রান দিয়েছেন মাত্র ১২।

আদিল রশিদ বাবরকে আউট করার ওভারটায় পেয়েছেন উইকেট, মেইডেন, ৪ ওভারে ২২ রানে তার জোড়া শিকার। পাকিস্তানের বাবর, শান মাসুদ আর শাদাব খান ছাড়া কোনো ক্রিকেটারই দুই অঙ্কের রানে পৌঁছাতে পারেননি।

জস বাটলার এমসিজির বড় মাঠের সুবিধা নিতে ফিল্ডারদের একটু এগিয়ে রেখেছেন সীমানা দড়ি থেকে, আর বোলারদের বলেছেন বলের গতি কমিয়ে দিতে। তাতেই হয়েছে কাজের কাজ! লিয়াম লিভিংস্টোনের হাতে মিডউইকেটে আর ডিপে গেছে তিনটা ক্যাচ। মোহাম্মদ হারিসও স্টোকসের হাতে ধরা পড়েছেন একই কায়দায়।

২০ ওভারে পাকিস্তানের সংগ্রহ ১৩৭-৮, এত কম পুঁজি নিয়ে ইংল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে ফাইনাল জেতার আশাও করা যায় না। তবুও অসম্ভবকে প্রায় সম্ভব করে ফেলেছিল পাকিস্তান।

শাহিন শাহ আফ্রিদি শুরুর ওভারেই ভেঙে দিয়েছিলেন অ্যালেক্স হেলসের স্টাম্প। ওয়ানডাউনে নামা ফিল সল্টকেও ফিরিয়ে দেন হারিস রউফ। পেস বোলিং দিয়ে ভালোই চেপে ধরেছেন তখন পাকিস্তানের বোলাররা। কিন্তু ঐ যে, বেন স্টোকস নামের একজন অতিমানব ছিলেন! স্টোকস থাকা মানেই চাপের মুখে ম্যাচ জেতানোর নিশ্চয়তা। ২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে করে দেখিয়েছেন, একই বছর লিডসে অ্যাশেজের টেস্টে করে দেখিয়েছেন, এই বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ম্যাচেও ছিল সেই ঝলক। আর মঞ্চটা যখন বিশ্বকাপ ফাইনাল, স্টোকস ছাড়া আর কে আছে ইংল্যান্ডের?

লক্ষ্যটা বড় ছিল না, বলে বলে রান নিলেই হয়। এমন অবস্থায় শুরুতে উইকেট হারিয়ে কাঁপাকাঁপির পর হাল ধরলেন স্টোকস। হ্যারি ব্রুকের সঙ্গে ৩৯ রানের একটা জুটি হলো, এরপর মঈন আলিকে নিয়ে ৩৩ বলে ৪৭ রানের জুটি গড়লেন। শেষবেলায় মঈন আউট হয়ে গেলেও স্টোকস মাঠ ছেড়েছেন দলকে জিতিয়েই। ৪৯ বলে ৫২ রানের অপরাজিত ইনিংস, ৫ বাউন্ডারি আর ১ ছক্কায় সাজানো। যদিও বিশ্বকাপ জেতানো শটটা ছিল স্রেফ একটা সিঙ্গেল, মোহাম্মদ ওয়াসিমের বলে মিডউইকেটে বল ঠেলে দিয়ে নেওয়া এক রানেই স্টোকস মেটালেন ২০১৬’র আক্ষেপ।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে, স্টোকসের বলে টানা চার ছক্কা মেরে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ছয় বছর পর, স্টোকসের ব্যাটেই বিশ্বকাপ জিতল ইংল্যান্ড। ৩ বছরের ভেতর দুটো বিশ্বকাপের ফাইনালের নায়ক স্টোকস, এভাবেই প্রকৃতি বোধহয় যা কেড়ে নেয় ফিরিয়ে দেয় তার বহুগুণ।