লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা দ্বিতীয়বার ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটালেন। প্রথমবারেও একই রকম ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তিনি। লাতিন আমেরিকায় বিপ্লবের লাল তরঙ্গের বা লাল ঢেউয়ের (রেড টাইড অর ওয়েভ) পর দ্বিতীয় দফায় গোলাপি তরঙ্গ বা গোলাপি ঢেউয়ের (পিংক টাইড অর ওয়েভ) দ্বিতীয় সূচনাকারী তিনি। গোলাপি ঢেউ শুরু করেছিলেন ভেনেসুয়েলার (ভেনেজুয়েলা) হুগো চাভেস। ব্রাজিল নানা কারণেই ব্যতিক্রম। একমাত্র পর্তুগিজ কলোনি। প্রায় গোটা লাতিন আমেরিকা ছিল স্প্যানিশ উপনিবেশ; কিন্তু ব্রাজিল ছিল পর্তুগিজ উপনিবেশ। জাদু বাস্তবতার যত কাহিনী, কি গল্পে কি কবিতায় (আসলে প্রতিকবিতায়) কি উপন্যাসে প্রায় সবই লেখা হয়েছে স্প্যানিশ ভাষায়, আর প্রায় সব অনূদিত হয়েছে ইংরেজি ভাষায়। স্প্যানিশ থেকে আমরা জেনেছি বাংলা ভাষায়; যদিও কিছু কবিতা এবং উপাখ্যান মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে সরাসরি অনূদিত হয়েছে বাংলা ভাষায়। পেরুর মারিও ভার্গাস য়োসা (কেউ তাকে হাইপার-রিয়েলিস্টও বলে), কিউবার আলেহো কার্পেন্তিয়ার, কলম্বিয়ার গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস, আর্হেন্তিনার হোর্হে লুইস বোর্হেস ও হুলিও কর্তাজার, চিলির ইসাবেল আয়েন্দে, ব্রাজিলের শ্জর্জে আমাদো-র সাহিত্য যেমন ব্যতিক্রম, তেমনই ব্যতিক্রম এই জাতের সাহিত্যের নামটিওজাদু বাস্তবতা। সাহিত্যে, যদিও পুরনো নজির আছে, লাতিন জাদু বাস্তবতা নতুন এক জাতই (জেনর) বটে। প্রতিকবিতাও আরেক জাত বটে, তাতেও ম্যাজিক আছে। চিলির কবি নিকানোর পাররার প্রতিকবিতা দ্রষ্টব্য, সামরিক শাসনের আদিভৌতিক বাস্তবতায় তার ‘বারণ’ শীর্ষক কবিতার কথা সবারই, যারা আট-এর দশকে কৈশোরে বা যৌবনে ছিলেন তাদের মনে থাকার কথা। এটিরও বাংলা ভাষ্য পাওয়া যায় মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরজমায়।
ব্রাজিল (সত্যজিৎ রায়ের ভাষ্যে ব্রেজিল) আরও একদিক দিয়ে ব্যতিক্রম সামরিক পদপদবিতে (মিলিটারি র্যাঙ্ক অ্যান্ড ইনসিগনিয়া)। ব্রাজিলের বিমানবাহিনীর প্রধানের পদ লেফটেন্যান্ট ব্রিগেডিয়ার (চার তারকা জেনারেল যদিও)। দুনিয়ায় কোথাও সামরিক পদাবলি এক রকমের নয়। ব্রাজিলেও নয় ব্রাজিলের মতো আর কোথাও এমন র্যাঙ্কিং সিস্টেম নেই। না থাকুক, তাতে কার কী সমস্যা? এসব আসলেই কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের। কারণ তারা মনে করে, সারা দুনিয়ায় তাদের র্যাঙ্কিং সিস্টেমই সবার সেরা। তাদের জেনারেলরাই খাঁটি জেনারেল, আর সব জেনারেল ‘পাতি জেনারেল’। সেই ব্যতিক্রমের ব্রাজিলেই দ্বিতীয় দফায় আরেক দফা ব্যতিক্রম ঘটালেন লুলা দা সিলভা। জিতে গেলেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে। তবে যেমনটা নির্বাচন-পূর্ব জরিপে বলা হচ্ছিল তেমন ভূমিধস জয় তিনি পাননি। সাম্প্রতিক লাতিন নির্বাচনে এটাও এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। জরিপে বলা হচ্ছিল তিনি প্রথম দফাতেই নির্বাচিত হবেন। কিন্তু পারলেন না, ৫০ শতাংশ ভোট না পেয়ে পেলেন ৪৮ শতাংশের কিছু বেশি। দ্বিতীয় দফার ভোটের জরিপেও বলা হয়েছিল তিনি ৫৩ থেকে ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফাইনাল রাউন্ড উতরাবেন। পেলেন না। তবে উতরালেন ৫০ দশমিক ০৯ শতাংশ ভোট পেয়ে। এসবই ব্যতিক্রমী ঘটনা বটে। টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিজ হাইপার-ম্যাজিক রিয়েলিজম ‘বলস অব পলোমলো বলেরো আর হ্যাংগিং অন দ্য ট্রি’। এককালে এ-রকম ঘটনা কেবল ঘটত ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্যে।
ব্রাজিলের লেফটেন্যান্ট ব্রিগেডিয়াররা অর্থাৎ ব্রাজিলের জেনারেলরা তথা তিন বাহিনীর প্রধানরা (একজন জেনারেল, একজন আমিরাল তথা এডমিরাল এবং একজন লেফটেন্যান্ট ব্রিগেডিয়ার) তারা তিনজনই র্যাঙ্কে সমান ও সমমর্যাদার। তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও তা করার এখতিয়ার তাদের নেই। তারা এই ব্যাপারে একটা যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন। ব্রাজিলের নাগরিকসমাজ মিলিটারি কমান্ডারদের এমন বিবৃতির কড়া সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে‘It is not the role of military commanders to comment on the political process, much less on the performance of republican institutions. ’ লুলার বিজয়কে অবজ্ঞা করার স্পষ্ট লক্ষণ এই বিবৃতিতে দেখা যায়। বিভিন্ন উগ্র ডানপন্থি গ্রুপ ব্রাজিলে বিক্ষোভ করছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার দুই দিন পর্যন্ত কোনো কথা বলেননি বলসোনারো। ব্রাজিলের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জায়ার বলসোনারো। তিনি বাকরহিত ছিলেন, কথা বললেন দুই দিন পরে এবং লুলার বিজয় নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। তারপর ডানপন্থিদের তৎপরতা (বলা ভালো অপতৎপরতা) শুরু হয়। জেনারেলদের বিবৃতি ডানপন্থিদের তৎপরতারই সমর্থন। ‘‘Their joint statement qualifies as democratic acts the protests that far-right groups have been carrying out to ignore the victory of Lula da Silva. ’’ ডানপন্থি বিক্ষোভকারীদের একাংশ সামরিক ব্যারাকের বাইরে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ করেছে। সে্লাগান দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তারা সামরিক আগ্রাসন চালনার, অভ্যুত্থান ঘটানোর আহ্বান জানায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি। কাজেই ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লিখেনি’ একথা বলা যায় না। বরং বলা উচিত, কর্নেলদের প্রতি সশব্দ চিঠি গাওয়া হয়েছে, ব্যারাকের সামনে দাঁড়িয়ে। বিক্ষোভকারীরা বলছে, এটাই নাকি, সামরিক অভ্যুত্থানই নাকি বর্তমান পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক আচরণ হবে। বলিহারি গণতন্ত্র। জাদু বাস্তবতার সামরিক পশ্চাৎপট বিক্ষোভকারীরা উন্মোচিত করল। বিক্ষোভকারীদের মাঝখানে হয়তো কোনো ‘সরলা এরেন্দিরা’কে খুঁজে পাওয়া যাবে। ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতা’র অবসান তারা হয়তো ঘটাবে। ব্যারাকের সামনে যখন একবার দাঁড়াতে পেরেছে, তখন আর ভয় কী! নৈঃশব্দ্যের অবসান তারা ঘটাবেই বলে মনে হচ্ছে।
প্রশ্নটা ব্রাজিলের নাগরিকসমাজের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছে। বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকরাও প্রশ্ন তুলেছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, ‘ব্যারাকের সামনে দাঁড়িয়ে যারা সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানাচ্ছে তাদের আহ্বান কি গণতান্ত্রিক? তারা ভোটের বাক্সে তাদের আহ্বানের প্রতিধ্বনি করে আমাজন-খেকো বলসোনারোর পাল্লা ভারী করল না কেন? তাহলে তো তাদের রাস্তায় দাঁড়িয়ে চেঁচাতে হতো না। ভোটের ফল ঘোষণার পর দুই দিন তাদের অপেক্ষাও করতে হতো না। ব্রাজিলের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য এবং সিনেটর ওমর আজিজ এই পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন, মিলিটারি কনস্পিরেটরের (ষড়যন্ত্রকারীর) ভূমিকা পালন করছে। যে বুদ্ধিসম্পন্ন এবং শিক্ষিত লোকেরা বিবৃতিতে বলছে যে, এসব বিক্ষোভ (ব্যারাকের সামনে দাঁড়িয়ে হেরে গলায় চেঁচানো) নাকি গণতান্ত্রিক আচরণ। এসব তো আসলে দাঙ্গা, রায়ট। যারা এসবকে আলিঙ্গন করছে তারা দুর্বৃত্তদের সঙ্গেই আঁতাত করছে দৃশ্যত। আজিজের অভিমত, কমান্ডারদের বিবৃতির মধ্যে জোরালো কোনো নৈতিক বিষয় পাওয়া যায় না। বিবৃতি খুব দুর্বল ভাষ্য তৈরি করেছে। এই কথাও অনুমিত হচ্ছে যে, কমান্ডারদের বিবৃতি বলসোনারোর অনুরোধে লেখা হয়েছে বিক্ষোভের বৈধতা নিষ্পন্নের জন্য। ইতিহাসবেত্তা ক্রিস্টোফার লিঞ্চ বলেছেন, বিবৃতি এ কারণেও দেওয়া হয়ে থাকতে পারে একটা ইলেক্টোরাল ফ্রড সংঘটিত হয়েছে এমন ফেইক নিউজকে (বানোয়াট কল্পকথা) সমর্থন দেওয়ার জন্য। লেফটেন্যান্ট ব্রিগেডিয়াররা বিবৃতি দিয়ে সে কাজটিই করেছেন।
সামরিক নেতৃত্ব একটা সূক্ষ্ম রেখা টানার প্রয়াস করেছে বা কোশেশ করেছে। তারা লিগেলিজমের কথা বলেছে কিন্তু তারা ‘বলসোনারিস্ত’দের কোনো সমালোচনা করেনি। বিক্ষোভকারীরা ব্যারাকের সামনে দাঁড়িয়ে ক্যু-এর আহ্বান জানাচ্ছে, তার সমালোচনা বিবৃতিতে নেই। অথচ বিবৃতিতে বিচার বিভাগের প্রতি ঠিকই একটা বার্তা চালান করার চেষ্টা রয়েছে। ব্রাজিলের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান গ্লিজি হফম্যান যৌথ বিবৃতিকে নাকচ করে দিয়েছেন। লুলা দা সিলভা এই পার্টিরই প্রার্থী। তিনি বলেছেন যারা এটিতে স্বাক্ষর করেছেন তারা সাংবিধানিক এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন। মিলিটারি কমান্ডারদের কাজ নয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিয়ে কথা বলা। রিপাবলিকান ইনস্টিটিউশনের কাজ নিয়ে কথা বলা তো দূরের কথা। মিসেস হফম্যান বলেছেন, চরম ডানপন্থিদের কর্মকান্ড শান্তিপূর্ণও নয়, সুশৃঙ্খলও নয়। অথচ যৌথ বিবৃতিতে এমনটাই বলার চেষ্টা করা হয়েছে। কর্নেলদের কারা চিঠি লিখেছে?
ব্রাজিলের সশস্ত্রবাহিনী তাদের ‘সোনালি’ অতীত ভুলতে পারছে না। জাদু বাস্তবতার গল্প তৈরির প্রেক্ষাপট রচনার লোভ তারা ছাড়তে পারছে না। আমাজনে ‘অগ্নিকুন্ডের সন্ধানে’ তারা বেরিয়ে পড়তে চাইছে। দিউমা হোসেফকে তারা ‘কার ওয়াশ’ কেলেঙ্কারিতে ডুবিয়েছিল। সঙ্গে বিভীষণরা বরাবরই থাকে। কার ওয়াশ-এই লুলাকে জেলে পুরেছিল। নেপথ্যে ছিল মার্কিন বহুজাতিক এক কোম্পানি। তাদের হয়ে বরকন্দাজের ভূমিকা পালন করেছে লেফটেন্যান্ট ব্রিগেডিয়াররা। তারা কি ‘শত বছরের নিঃসঙ্গতা’র নতুন পর্ব চালু করতে চায়। কর্নেলকে কে চিঠি লিখবে!
লেখক: সাংবাদিক
tarik69@gmail.com