বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের শঙ্কা ব্যবসায়ীদের

২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ করে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে দাঁড়াবে। কিন্তু এটি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। জিএসপি প্লাস সুবিধা পাওয়ার শঙ্কার পাশাপাশি অভ্যন্তরে কমন বন্ডেড ওয়্যার হাউজ ও লিড টাইম কমানোর জন্য ব্যবসায়ীদের এখনো লড়তে হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে বাংলাদেশের উত্তরণ নিয়ে রাজধানীর হোটেল প্যান-প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে এক সেমিনারে এসব শঙ্কার কথা জানান ব্যবসায়ী নেতারা।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ২০২৬ এর মধ্যে আমরা এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অর্জন করব। কিন্তু এখনই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের দাম বাড়ায় পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। এজন্য লজিস্টিক ম্যানেজমেন্ট আরও শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল শক্তিশালী করার পাশাপাশি সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

জসিম উদ্দিন বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে দেশের ভাবমূর্তি অর্জনে সহায়তা করবে। পাশাপাশি দেশীয় বিনিয়োগকারীদেরও আস্থা বাড়বে। তবে এটিও মনে রাখা দরকার যে করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দাভাবের পাশাপাশি বৈশ্বিক চাপ এরই মধ্যে খাদ্যপণ্য ও মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ সব পর্যায়ে যানবাহন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে। এ ছাড়া বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা বিরাজ করায় ব্যবসায়ীদের খরচ বেড়ে গেছে। আবার বিশ্ববাজারে রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও কমে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার এসব কথা বলেছেন চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অস্বাভাবিক এলসি খোলা হয়েছিল। এ সময়ে ৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আমরা ছয় মাসের হিসাব করে দেখেছি, এগুলো অস্বাভাবিক। সেজন্য ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করেছি, যাতে এ ধরনের এলসি খোলা না হয়।

তিনি বলেন, পুরো অর্থবছরে আমাদের ৮৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানি হয়, রপ্তানি হয় ৫২ বিলিয়ন ডলারের। কিন্তু এর মধ্যেও ওভার ইনভয়েসিং ছিল ২০ থেকে ২০০ শতাংশ পর্যন্ত। আমাদের পদক্ষেপের কারণে তা অক্টোবর ও নভেম্বরে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, দেশে ওভার ইনভয়েসিংয়ের পাশাপাশি আন্ডার ইনভয়েসিংও শক্তিশালী। এর মাধ্যমে হুন্ডি হয় বেশি।

গভর্নর বলেন, আগামী জানুয়ারি মাস থেকে বাংলাদেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আর থাকবে না। এখনো কোনো সংকট নেই, তবে দেশে আন্ডার ইনভয়েসিং (কম মূল্য দেখানো) ঠেকাতে আমরা সতর্ক অবস্থান নিয়েছি। হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ওভার ইনভয়েসিং (বেশি মূল্য দেখানো) এবং আন্ডার ইনভয়েসিং শূন্যতে নামিয়ে রাখা গেছে।

সেমিনারে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান বলেন, ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর আমাদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আসবে। বিশেষ করে বৈদেশিক বাজারে আমরা শুল্কমুক্তভাবে পণ্য রপ্তানি করতে পারব না। তখন ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে আমাদের ১৩ থেকে ১৭ শতাংশ শুল্ক দিয়ে পণ্য রপ্তানি করতে হবে। আমাদের খরচও বেড়ে যাবে। এজন্য এখন থেকে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। আমাদের ব্যবসার পরিবেশের মানোন্নয়ন করতে হবে। যাতে করে বিদেশি বিনিয়োগ বেশি আসতে পারে। পণ্য উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থায় উন্নত কারিগরি (লজিস্টিক) সহায়তা বাড়াতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে।  তিনি আরও বলেন, আমাদের একটি বিশাল সম্ভাবনাময় খাত হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাত। তবে এই খাতে বিনিয়োগের অভাবে তেমন সফলতা আসছে না।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আমাদের অগ্রযাত্রার নায়ক কৃষকদের সবার অভিবাদন জানানো উচিত। এ সময়ে সব আলোচনার কেন্দ্রে কৃষক ও শ্রমিকদের আনতে হবে। যেখানে ঘাটতি আছে সেটি নিরূপণ করতে হবে। এ মুহূর্তে একটু সংকটের মধ্যে আছি, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল হাসান পাপন বলেন, আমরা যে সময় এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে আলোচনা করছি, একই সময়ে পৃথিবীর বহু দেশ খাদ্য সংকট নিয়ে আলোচনা করছে। নেপাল, মালদ্বীপের মতো রাষ্ট্রগুলো এলডিসির জন্য প্রস্তুত না, প্রশ্ন হলো আমরাও কি প্রস্তুত?

তিনি বলেন, দুটো পয়েন্টে আমাদের নজর দেওয়া দরকার। একটি হলো প্যাটেন্ট আইন তৈরি করা। আরেকটি হলো, জনস্বাস্থ্যে নজর দেওয়া। জনস্বাস্থ্য নিয়ে একটি আলোচনাও নেই কোনো পর্যায়ে। এটিতে নজর দেওয়া খুব জরুরি। আমরা ওষুধের সহজলভ্যতার কোনো আলোচনা করি না। মানুষকে বাঁচানোর জন্য আমরা কী করেছি। এটা নিয়ে কি কেউ কথা বলবে না?

এ সময় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে আমাদের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ আছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে এগুতে হবে। ভারতের বাজার ধরতে পারলে আমাদের রপ্তানি অর্জন আরও সহজ হবে। পর্যটন খাতে নজর দিতে হবে। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে পর্যটক আকর্ষণের অনেক সুযোগ আছে এখনো।

ইউএনডিপির কান্ট্রি ইকোনমিস্ট ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নে নন-আরএমজি পণ্যের সরবরাহ বাড়ছে। আমাদের সেদিকে নজর দিতে হবে। আমাদের কাক্সিক্ষত খাত আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি। এছাড়া আমাদের নন-কটন ফাইবার বা ম্যান মেইড ফাইবারের পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। তাতেও নজর দিতে হবে। এসএমই খাতকে আরও কাজে লাগাতে হবে, সহযোগিতা দিতে হবে। এখানে বিনিয়োগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সেমিনারে সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস।