প্রায়ই এক শ্রেণির মানুষকে দেয়ালে গাছের আড়ালে, কোণে বা ফুটপাতে একটু জায়গা পেলেই দাঁড়িয়ে যেতে দেখি। সামনে দিয়ে কে যাচ্ছে নারী না পুরুষ সেদিকে কারও ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা ভাবলেশহীন। কখনো কখনো এ অবস্থায় ধূমপান করে, কখনো বা মোবাইলে কথা বলে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষিত-অশিক্ষিত ভেদাভেদ নেই। নাক-চোখ চেপে কোনো রকমে জায়গাটি পেরিয়ে যেতে পারলেই যেন পথচারীরা হাফ ছেড়ে বাঁচেন। এভাবেই অনেক রাস্তাঘাট, ফুটপাতকে আমরা গণশৌচাগার বানিয়ে ফেলেছি।
এ দেশের মানুষের চরিত্র বেশ অদ্ভুত। যেখানে লেখা থাকে ‘এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ, করিলে ৫০ টাকা জরিমানা’ঠিক সেই সতর্কবাণীর নিচে দাঁড়িয়ে তারা এ কর্মটি করেন। এটা বন্ধ করার জন্য দু-একবার মোবাইল কোর্ট সচল হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। দু-একজনকে সামান্য শাস্তি পেতে হয়েছে। এখানে-সেখানে যখন-তখন প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়াও যে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ এটা অনেক শিক্ষিত মানুষও জানেন না।
আমাদের দেশে চায়ের টেবিলে টয়লেটবিষয়ক আলোচনার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা অন্য সময়েও এ বিষয়ে আলোচনা করতে বিব্রতবোধ করি। অথচ টয়লেটবিষয়ক আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিকভাবে টয়লেট ব্যবহার না করায় কলেরা, ডায়রিয়া এবং হেপাটাইসিসের মতো মারাত্মক রোগব্যাধির বিস্তার ঘটে। ওয়ার্ল্ড টয়লেট অর্গানাইজেশনের (ডব্লিউটিও) তথ্য মতে, বিশ্বের ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন মানুষ এখনো সঠিক ও স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। টয়লেট ব্যবস্থাপনায় সার্কভুক্ত দেশগুলোর অবস্থান ভালো নয়। যদিও প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের স্যানিটেশন বা টয়লেটের সাফল্য অনেক বেশি। তবে আমাদের দেশে এখনো মানসম্মত টয়লেট ব্যবস্থাপনার বাইরে রয়েছে বহু মানুষ। দেশের ৬১ শতাংশ নাগরিক এখনো নিরাপদ টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে অতি জরুরি এই সেবা থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।
আমাদের দেশে বড় একটি সমস্যা হচ্ছে পাবলিক টয়লেট। স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন আইনে বলা হয়েছে, করপোরেশন তার নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় পুরুষ এবং নারীদের জন্য পর্যাপ্ত পৃথক পায়খানা ও প্রস্রাবখানা নির্মাণ এবং তা যথাযথভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যবস্থা করবে। তবে অনেক এলাকায় জায়গা না পাওয়ায় পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। সিটি করপোরেশন বলছে, তারা নাগরিকদের জন্য পাবলিক টয়লেট নিশ্চিত করতে কাজ করছে। এরই মধ্যে শতাধিক আধুনিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মাণাধীন আরও শতাধিক। ঢাকা শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পাবলিক টয়লেটগুলোতে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা চেম্বার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ খাবার পানি, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সুবিধা, আয়না, সিসি ক্যামেরাসহ পেশাদার পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও নারী কেয়ারটেকারের ব্যবস্থাও আছে। পরিচ্ছন্নতার স্বার্থে জুতা খুলে ভেতরে রাখা স্যান্ডেল ব্যবহার করতে হয় এসব শৌচাগারে। এ ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। নাগরিকদের সুবিধার্থে এরই মধ্যে ডিএনসিসি এবং বিভিন্ন এনজিওর উদ্যোগে নির্মিত ১৬৩টি গণশৌচাগার সম্পর্কিত তথ্যাদি ‘সবার ঢাকা’ মোবাইল অ্যাপসে সংযুক্ত করেছে। তবে টয়লেটের সংখ্যা বাড়লেও সেবার মান বাড়ছে না। অপরিচ্ছন্ন নোংরা ব্যবহারের অনুপযোগী অনেক টয়লেট। কিছু টয়লেটের অবস্থা ভালো হলেও সেখানে বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। আবার টাকা দেওয়ার ভয়ে অনেকেই যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করছেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই নিম্ন আয়ের ও কর্মজীবী মানুষ। বেসরকারি সংগঠন ভূমিজের এক জরিপ বলছে, নগরে শৌচাগারের সুবিধা একেবারেই কম। তাই ৯০ শতাংশ নারী ঘর থেকে বের হওয়ার সময় পানি পান করেন না। এ ছাড়া বেশির ভাগ পাবলিক টয়লেটই নারী, প্রতিবন্ধীদের ব্যবহারের উপযোগী নয়। পরিকল্পনা থাকলেও অর্থের অভাবে টয়লেটগুলোকে পিরিয়ডবান্ধব করা সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া শহরে আছে কয়েক লাখ ভাসমান জনগণ, যারা রাস্তার ধারে ও পার্কে মলমূত্র ত্যাগ করে। তাদের ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন এলাকায় ৩৬টি ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার বসিয়েছিল অ্যাসোসিয়েশন ফর রিয়ালাইজেশন অব বেসিক নিডস (আরবান)। গণশৌচাগারের তীব্র সংকট থাকায় এগুলো হতে পারত ভালো বিকল্প। কিন্তু সামাজিক, সাংস্কৃতিক উদ্যোগের অভাবে ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার ব্যবহারে সব শ্রেণির মানুষ আগ্রহী হচ্ছে না।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২৬টি গণশৌচাগার বা পাবলিক টয়লেট নিয়ে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে মামলা চলছে। যারা এসব শৌচাগার নিয়ন্ত্রণ করছেন, তারা মামলা ঠুকে দিয়ে সিটি করপোরেশনকে রাজস্ব দিচ্ছেন না। করপোরেশনও মামলার কারণে শৌচাগারগুলো নতুন করে ইজারা দিতে পারছে না। কিছু শৌচাগার দখলে রাখার অভিযোগ যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে। কিছু শৌচাগার দখলে রাখতে মামলা করেছে সংশ্লিষ্ট বিপণিবিতানের দোকান মালিক সমিতি। কিছু শৌচাগার ভেঙে সেখানে দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে মানুষ শৌচাগার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
রাজধানী ঢাকায় প্রায় আড়াই কোটি লোকের জন্য দুই সিটি করপোরেশন কি শতভাগ টয়লেট সুবিধা নিশ্চিত করতে পেরেছে? বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘যে পরিমাণ মানুষের বসতি রয়েছে সে পরিমাণ পাবলিক টয়লেট নেই। প্রতি আধা কিলোমিটার অন্তর একটি টয়লেট থাকা আবশ্যক। সব মিলিয়ে নগরীতে ১ হাজার পাবলিক টয়লেটের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু সেখানে রয়েছে মাত্র শতাধিক। বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনকে আরও কাজ করতে হবে। পাশাপাশি ইজারাপ্রথা থেকে বের হয়ে পাবলিক টয়লেটগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিচালনা করা দরকার।’
উন্নত থেকে অনুন্নত, অনেক দেশেই পাবলিক টয়লেট নোংরা থাকার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ও বিদেশি পর্যটকদের অভিযোগের মুখে মালয়েশিয়া সরকার টয়লেট ঝকঝকে তকতকে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে অনেক আগেই। চীন নিজেদের ভাবমূর্তি বিদেশিদের কাছে উজ্জ্বল করতে ঝকঝকে-তকতকের পাশাপাশি একটু ভিন্ন ধাঁচের পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করছে।
পাবলিক টয়লেট থাকার পরও কি আমরা প্রকৃতির ডাকে প্রকৃতিতেই সাড়া দেব? না কি টয়লেটমুখো হব? অন্যদিকে, নতুন পাবলিক টয়লেট স্থাপনের পর কত দিনইবা সুন্দর ব্যবস্থাপনা বজায় থাকবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এই খাতে বাজেট অপ্রতুল। বরাদ্দ বাড়বে কী? আমরা সুনাগরিক হয়ে উঠব কবে? প্রতি বছর ১৯ নভেম্বর বিশ্ব টয়লেট দিবস পালিত হয়। আমাদের দেশেও পালিত হচ্ছে। টয়লেট দিবস পালনের তেমন কোনো সুফল আমরা পাচ্ছি কি? প্রায় দুই যুগ ধরে দিবসটি পালন করা হলেও দেশে এখনো শতভাগ মানুষের স্যানিটেশন নিশ্চিত করা যায়নি।
লেখক : সাংবাদিক
hindol_khan@yahoo.com