জলবায়ু সম্মেলনে ঐতিহাসিক চুক্তি সাক্ষর

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত অনুন্নত দেশগুলোকে অর্থসহায়তা দেওয়ার বিষয়ে এক ঐতিহাসিক ঐকমত্যে পৌঁছেছে এবারের জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন বা কপ-২৭ সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলো। ধনী দেশগুলোর দীর্ঘদিনের গড়িমসির মধে অবশেষে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল গঠনের চুক্তি হয়েছে।

মিশরে স্থানীয় সময় শনিবার (১৯ নভেম্বর) মধ্যরাতে পূর্ণ একটি সেশন শেষে এই তহবিল গঠনে ঐতিহাসিক ঐকমত্যে পৌঁছান বিশ্বনেতারা। এজন্য এমনকি ৯ নভেম্বর শুরু হওয়া জলবায়ু সম্মেলন ১৮ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। ১৯ নভেম্বর বাড়তি দিনে ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয় সম্মেলনে অংশ নেয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা।

তবে নানা দেন-দরবারের পর বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশ এতে সম্মত হলেও কিছু বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত না হওয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নে আরও সময় লাগতে পারে।

চুক্তি অনুসারে, প্রাথমিকভাবে সব উন্নত দেশ, তাদের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিলটিতে অর্থদান করবে। তবে চীনের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশকে প্রাথমিকভাবে এ তহবিলে অর্থ দিতে হবে না, এমনকি চীনের বিষয়ে আগামী সম্মেলনে আলোচনা হবে বলেও জানানো হয়েছে।

অবশ্য, চীনের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের মতে চীনসহ যেসব উন্নয়নশীল দেশ বৃহৎ আকারে পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী, তাদেরও এ তহবিল গঠনে অবদান রাখতে হবে।

‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল বছরের পর বছর ধরেই বিতর্কিত বিষয় হয়ে ছিল। গরিব দেশগুলো ৩০ বছর ধরে বিশ্ব ঊষ্ণায়নের কারণে তাদের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ধনী দেশগুলোকে সহায়তা দেওয়ার জন্য তাগাদা দিয়ে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশগুলোর এতে গড়িমসি করার কারণ, তাদের আশঙ্কা- ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিল দিতে রাজি হলে তারা আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে যাবে এবং এতে করে ভবিষ্যতে মামলায় জড়িয়ে পড়ার পট প্রস্তুত হতে পারে।

কিন্তু গত এক বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে, পাকিস্তানে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতিসহ চীন, আফ্রিকা ও অন্যান্য স্থানে খরায় যে ক্ষতি হয়েছে তা ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ তহবিলের আশু প্রয়োজনীয়তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের এমন ভয়াবহ পরিণতির মধ্যে এবারের কপ-২৭ সম্মেলনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ‘লস এন্ড ড্যামেজ’ তহবিলের দাবিও অনেক জোরদার হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই চুক্তিটি এক বিরাট সাফল্য। তবে এটি নানা বিতর্কের সমঝোতা প্রক্রিয়া। সম্মেলনের প্রতিনিধিরা চুক্তির বিতর্কিত অংশগুলো সমাধানে এখনও কাজ করছেন। শক্তি উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার ছাড়াও সকল জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার বন্ধের মতো বিষয়ও রয়েছে সেখানে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো সন্তুষ্ট, কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাদের যে ক্ষতি হচ্ছে তার স্বীকৃতি পাচ্ছে এই তহবিলের মাধ্যমে। তবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধের যে কথা বলা হচ্ছে সেটি নিয়ে অনেক ধনী দেশ হতাশ।

অন্যদিকে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ চুক্তি আসলে কী, চুক্তির আওতায় ধনী দেশগুলোর কে কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে কারা কী পরিমাণ পাবে এবং কীভাবে পাবে সেই সিদ্ধান্ত আসেনি এখনও। এসব বিতর্ক শেষে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অর্থ পেতে লেগে যেতে পারে আরও কয়েক বছর।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ বলতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চরম আবহাওয়ায় সমুদ্রেপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঘটনাগুলোতে ইতোমধ্যে যে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সেটি বোঝায়।

জলবায়ু তহবিল এখন পর্যন্ত বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধের প্রয়াসে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন কমানোর উপর বেশি জোর দিয়েছে। আর এসব তহবিলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভবিষ্যত ক্ষতি মোকাবিলার প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হয়েছে।

লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল ভিন্ন কিছু হতে পারে, বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো যেসব ক্ষয়ক্ষতি এড়িয়ে যেতে পারবে না বা পুষিয়ে নিতে পারবে না সেগুলোর জন্য খরচ চালানোর জন্য তহবিল দেওয়া হতে পারে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হওয়া কোন ক্ষতিগুলো ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ ধরা হবে সেটি নির্ধারিত হয়নি এখনও।

গত জুনে জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত ৫৫টি দেশের যৌথ হিসাব বলছে, গত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনে তাদের মোট ৫২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে, যা দেশগুলোর সামষ্টিক জিডিপির ২০ শতাংশ। কিছু গবেষণা বলছে, এই ক্ষতি ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছরে ৫৮ হাজার কোটি ডলার হতে পারে।

দেশ রূপান্তরের বিশ্বকাপ চমক: কুইজে অংশ নিয়ে রূপায়নের ফ্ল্যাট জিতুন