বাংলার শব্দভাণ্ডারে নানা শব্দ, বাক্য আর প্রবাদ আছে, যা বর্তমানের সঙ্গে দারুণভাবে মিলে যায়। যদিও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব কথার তাৎপর্য এবং তীব্রতা কিছুটা পাল্টেছে কিন্তু যে প্রবণতার কথা বলতে এসব প্রবাদ তা প্রায় একই রকম আছে। অনেক কায়দা-কানুন করে গুড়ের ব্যবসায়ী লাভ করার পর অবহেলা আর অমনোযোগিতার ফলে পিঁপড়া গুড় খেয়ে ফেললে যে হাহাকার তৈরি হয় সেখান থেকে ‘লাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়’ এই প্রবাদের প্রচলন হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণের কথা ভাবলে প্রবাদবাক্যটি যে নতুন রূপে, নতুন শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা বোঝা যায়। তবে এ ক্ষেত্রে একটা বড় পার্থক্য হয়ে গেছে, পিঁপড়ার মতো ক্ষুদ্র প্রাণীরা এখন আর লাভের গুড় খেতে পারে না, খায় বিশাল ক্ষমতার অধিকারীরা।
ব্যাংকের ব্যবসা কী? ব্যাংক লাভ করে কীভাবে? মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন, আবার ব্যাংক মানুষকে ঋণ দেয়। ব্যাংক অর্থ সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে যে হারে সুদ দেয়, ঋণ দিলে গ্রাহকদের কাছ থেকে স্বাভাবিকভাবেই তার থেকে বেশি হারে সুদ নিয়ে থাকে। এই দুই সুদের হারের পার্থক্যের ওপরই ব্যাংকিং ব্যবসা টিকে থাকে।
কিন্তু ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গ্রহীতা যদি ঋণ ফেরত না দেয় এবং বছরের পর বছর খেলাপি হতে থাকে, তাহলে আমানত হারিয়ে ব্যাংকিং ব্যবসায় লালবাতি জ্বলতে বাধ্য। ব্যবসা করতে গেলে টাকা আটকে থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু কতদূর পর্যন্ত তার সহনীয় মাত্রা? ধরা হয় এটা ৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এটা ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। যেকোনো বিবেচনাতেই এটা অস্বাভাবিক। কিন্তু যারা ঋণখেলাপি তাদের অজুহাতের অভাব নেই। এখন খেলাপি ঋণের জন্য ‘দুষ্ট ঋণগ্রহীতারা’ করোনা মহামারী ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করলেও এর আগের হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ কেন খেলাপি হয়েছিল তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
হিসেবে দেখা যাচ্ছে, জ্যামিতিক হারে খেলাপি ঋণ বেড়ে চলেছে। ১৯৯০ সালে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা, তিরিশ বছর পর নানা উন্নয়নের পথপরিক্রমার পর ২০২২ সালে তার পরিমাণ এসে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। সময়ের বিবেচনায় সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ হয়েছে গত ১৪ বছরে অর্থাৎ এ সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সময়কালে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই যে টাকা আটকে থাকছে, তা উদ্ধারের ক্ষেত্রে সরকারের নীতিপরিকল্পনায় কি কোনো গলদ আছে? সরকারের ভূমিকা বা পদক্ষেপগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে শুধু গলদ নয়, প্রশ্রয় আছে। তারা খেলাপি ঋণ উদ্ধারে সচেষ্ট না হয়ে বারবার ঋণখেলাপিদের আবদার রক্ষা করেছে। এই কাজ করতে গিয়ে কখনো খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা পরিবর্তন করে, কখনোবা মেয়াদ বাড়িয়ে দিয়ে খেলাপিদের সুবিধা দিয়েছে। আর বড় ঋণগ্রহীতাদের পরিচয় দেখলে দেখা যায় তারা ঋণ নিয়েছেন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে, আবার খেলাপি ঋণের সংজ্ঞাও বদল করে দিয়েছেন সরকারকে নান ারকম চাপ প্রয়োগ করে।
তাদের এই দ্বিমুখী চাপের কারণে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে ভয়াবহ রকমভাবে। ক্ষমতাবান ঋণখেলাপিদের কারণে ছোট ও সৎ ঋণগ্রহীতা, যারা নিয়মিত ঋণ শোধ করেন, তাদের ঋণ পেতে যেমন অসুবিধা হচ্ছে, তেমনি তারা ঋণ পরিশোধেও নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ব্যাংকের কোনো বড় ঋণগ্রহীতা যদি ঋণ শোধ না করে পার পেয়ে যান, তাহলে অন্যরা কেন ঋণ শোধ করবেন? এই মানসিকতার ফলে ঋণখেলাপি বেড়েই যাচ্ছে।
দুর্নীতি নিয়ে কথা বলা কঠিন হয়ে পড়লেও দুর্নীতিকে চেপে রাখতে পারছে না সরকার। দুর্নীতি দেশের উন্নয়নকে ম্লান করে দিচ্ছে, সম্প্রতি এ রকম মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। এত দিন দুর্নীতি, অভাব, দ্রব্যমূল্য নিয়ে কথা বললে তিনি তার প্রতিবাদ করতেন। কিন্তু এখন তিনিও বলেছেন, দেশে পর্যাপ্ত আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে। অভাব হচ্ছে আইনের বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ।
সংসদ সদস্যদের দায়িত্বপালন প্রসঙ্গেও তিনি বলেছেন, দেশে আইন আছে, কিন্তু বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ ঘাটতি থেকে কীভাবে উন্নতি ঘটবে? এ বিষয়ে সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হচ্ছে সংসদে বিষয়গুলো তুলে ধরা। তিনি আরও বলেছেন, ‘আমার সামনে একজন দুর্নীতি করে বেশি সুযোগ-সুবিধা নেবে, রাস্তার অর্ধেক কাজ করে টাকা নিয়ে যাবে, দুর্নীতির কারণে আমি আমার প্রাপ্য পাচ্ছি না এ বিষয়গুলো কেন সংসদে সোচ্চার কণ্ঠে শুনতে পাই না, তা বুঝতে পারি না।’ তার এই খেদোক্তি শুনে তার সারল্যের প্রশংসা করা যেতে পারে কিন্তু তার পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন না তুলে পারা যায় কি? সংসদ কীভাবে গঠিত হয়েছে, সংসদ সদস্যদের বেশির ভাগ কারা, সংসদ কীভাবে পরিচালিত হয় তা কি তিনি জানেন না?
দুর্নীতি নিয়ে টিআইবির নানা প্রতিবেদনকে অস্বীকার করা বা উড়িয়ে দেওয়া ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ প্রবণতা। এর সঙ্গে আছে আমরাই কি শুধু দুর্নীতি করেছি, ওরা করেনি? এই প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়ার পুরনো অভ্যাস। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) পরিচালিত ‘দুর্নীতির ধারণা সূচক ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৭তম। এই প্রতিবেদনকে তো মানতেই চান না ক্ষমতাসীনরা। বরং টিআই কাদের টাকায় চলে এবং কি উদ্দেশ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সে প্রশ্ন তুলেছেন বারবার।
কিন্তু এখন প্রতিমন্ত্রী প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমি মন্ত্রী। তবু সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে সংসদে শুনতে চাই কীভাবে দুর্নীতি কমানো যায়। উন্নয়ন খুবই উপাদেয়, যদি সেটাকে দুর্নীতিমুক্ত করা যায়। জনগণকে বাস্তবে দেখাতে হবে আমরা দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছি না, তখন উন্নয়ন কথাটা ভালো শোনাবে।’ তিনি বলেন, ‘আর না হয় আপনারা পারসেন্টেজ (ভাগ) নেবেন, আপনার জন্য ১০ শতাংশ রাখতে হবে, সংসদে অনেকেই সম্মানিত এবং ভালো ব্যক্তি রয়েছেন সন্দেহ নেই। আবার অনেকেই আছেন নির্বাচিত হয়েও অনেক ধরনের ভাগবাটোয়ারার সঙ্গে জড়িত, এটা অস্বীকার করা যাবে না। সুন্দর ও মানসম্মত জীবনের জন্য দুর্নীতিমুক্ত দেশ প্রয়োজন।’ দুর্নীতির ব্যাপকতা কী পরিমাণ ঘটলে এবং দুর্নীতিবাজদের কাছে কতখানি অসহায় হলে একজন মন্ত্রীকে এমন কথা বলতে হয় সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না কারও।
অনেকের নিশ্চয়ই মনে আছে, ২০২০ সালের নভেম্বরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন দুর্নীতি ও টাকা পাচার নিয়ে কথা বলেছিলেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, রাজনীতিবিদরা নন, বিদেশে বেশি অর্থপাচার করেন সরকারি চাকুরেরা। সে সময় তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমার ধারণা ছিল রাজনীতিবিদের সংখ্যা বেশি হবে, কিন্তু আমার কাছে যে তথ্য এসেছে, যদিও এটি সামগ্রিক তথ্য নয়, সেটিতে আমি অবাক হয়েছি। সংখ্যার দিক থেকে আমাদের অনেক সরকারি কর্মচারীর বাড়িঘর সেখানে বেশি আছে এবং তাদের ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকে।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য দমকা হাওয়ার মতো চিন্তাকে দুলিয়ে দিয়েছিল কিন্তু ক্রিয়াকে অগ্রসর করতে পারেনি। তাই দুই বছর হয়ে গেলেও কারও ব্যাপারে কোনো তথ্য জোগাড়, টাকা উদ্ধার এবং শাস্তি প্রদান সম্ভব হয়নি। জনগণ জানতে পারল না এসব সরকারি কর্মকর্তা কারা, তারা কত বেতন পায় আর কেমন করে তারা টাকা পাঠাল বিদেশে।
আবার ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচার হয়, তখনকার বাজারদরের (৮৫ টাকায় প্রতি ডলার) পরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। সরকারি মহল থেকে এই প্রতিবেদনকে কি আমলে নেওয়া হয়েছিল? উত্তর হলো, না। বরং সভা-সমাবেশ, টকশোতে সরকার সমর্থকরা জোর গলায় বলেছিলেন, এই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই।
অন্যদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গত জানুয়ারিতে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২১’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হচ্ছে প্রায় ৭১ শতাংশ খানা (পরিবার)। বিভিন্ন সেবা পেতে প্রতিটি পরিবারকে গড়ে ৬ হাজার ৬৩৬ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। ভুক্তভোগীরা অবশ্য মনে করবেন, এই তথ্য যথার্থ নয়। ঘুষ দিতে হয় আরও বেশি। আর সরকারদলীয় নেতারা বলেছেন, সরকারের উন্নয়ন ও ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই এসব প্রতিবেদন।
এভাবেই দুর্নীতিকে অস্বীকার ও আড়াল করতে করতে দেশের অর্থনীতি এক সংকটময় পরিস্থিতিতে পড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমছে দ্রুত গতিতে, ডলার সংকটে এলসি খুলতে সমস্যা হচ্ছে, অসম ও অনৈতিক শর্তে আইএমএফের কাছে ঋণ নেওয়ার জন্য হাত পাততে হচ্ছে, চাল, গম, চিনি, তেলসহ সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ক্রমাগত বাড়ছে, কাগজের দাম বেড়েছে, ওষুধ ও চিকিৎসা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ছে, কৃষকের কৃষিকাজ করা আর শ্রমিকের জীবিকা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে দিন দিন। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, দরিদ্রদের নাভিশ্বাস তোলা এ সময়েও নাকি মাথাপিছু আয় ২৩৩ ডলার বেড়ে গেছে আর জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭.২৫ শতাংশ। গড়ে প্রতিজন মানুষের আয় বেড়েছে প্রায় ২৫০০ টাকা। নিশ্চয়ই কারও না কারও আয় বেড়েছে না হলে সরকার বলবে কেন? কিন্তু সমস্যা হলো আয় বেড়েছে কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝতে পারছেন না। মানুষ যেটা বুঝতে পারছেন তা হলো জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে আর আয় এবং ব্যয়ের ফারাক বেড়েছে অনেক। ঋণখেলাপি হয়ে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করা আর দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে জনগণের পকেটের টাকা বের করে নেওয়া, বিষয় দুটো দেখতে আলাদা হলেও পদ্ধতি কিন্তু একই। এসব বন্ধ না করলে বহুল প্রচারিত উন্নয়নের বাতাস বাস্তবে অসন্তোষের ঝড়ের জন্ম দেবে।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
rratan.spb@gmail.com