বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতির প্রতিশ্রুতিকে স্বাগত ফিকির

আপডেট : ১২ জুন ২০২৬, ০৯:২৫ এএম

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের পাশাপাশি অর্থবিল ২০২৬ পর্যালোচনা করেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শীর্ষ সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন এবং বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের কৌশলগত ‘৩আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন বা পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠন) ফ্রেমওয়ার্ককে স্বাগত জানিয়েছে সংগঠনটি।

ফিকি’র মতে, অর্থবিল ২০২৬ একটি প্রগতিশীল ও ব্যবসায়ীবান্ধব উদ্যোগ, যা কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, সরলীকরণ, পূর্বাভাসযোগ্যতা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতির প্রতিশ্রুতি দেয়। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ এবং প্রযুক্তিচালিত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে, যা বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

ফিকি’র মতে, অর্থবিলে রাজস্ব ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, করদাতার হয়রানি কমানো এবং করপোরেট তারল্য রক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো উৎসে করকে ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করা। ফিকি মনে করে, এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং এটি প্রতিষ্ঠানের কার্যনির্বাহী মূলধনের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে লাঘব করবে।

পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় এবং ‘ফেসলেস’ রিফান্ড সিস্টেম ব্যবসায়িক নগদ প্রবাহ ঠিক রাখতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া উৎসে কর কর্তন না করার কারণে বৈধ ব্যবসায়িক খরচকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে গণ্য করার বিধান বাতিল, পারকুইজিট ও প্রমোশনাল খরচের সীমা বৃদ্ধি, অ্যাক্রুয়াল ভিত্তিতে সুদ ব্যয়ের স্বীকৃতি এবং আপিল পর্যায়ে বিতর্কিত করের হার কমানোকে করদাতাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে ফিকি।

ভ্যাট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মাসিক ভ্যাট রিটার্নের পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ কোম্পানিগুলোর পরিপালন খরচ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমাবে। শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে কাঁচামাল আমদানি, বৈদেশিক ঋণের সুদ এবং যন্ত্রপাতি ভাড়ার ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্ম চালু এবং মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ফিকি।

ফিকি’র মতে, ইতিবাচক পদক্ষেপের পাশাপাশি অর্থবিলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় রয়েছে, যা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। করপোরেট করের হার অপরিবর্তিত থাকলেও এটি কমানোর কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ না থাকায় সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া বড় ও বহুজাতিক করদাতাদের জন্য কোনো ট্রানজিশন পিরিয়ড বা মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই ই-ভ্যাট বাধ্যতামূলক করা বাস্তবসম্মত জটিলতা তৈরি করতে পারে।

এ ছাড়া ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করায় দক্ষ বিদেশি পেশাদারদের নিয়োগের খরচ বেড়ে যাবে। বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির এই সময়ে খরচ কমানোর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় পরিপালন ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। ফিকি খুচরা পর্যায়ে প্রস্তাবিত শূণ্য দশমিক ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর সংগ্রহের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহারের জোরালো সুপারিশ করেছে, কারণ এটি পরিচালনা করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। পাশাপাশি ক্যাশলেস লেনদেনের প্রণোদনা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি পর্যন্ত বিস্তৃত করা এবং অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় উৎসাহিত করতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের কর রেয়াত সুবিধা পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।  ফিকি জোর দিয়ে বলেছে যে, সমস্ত রাজস্ব ব্যবস্থা যেন ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর করা হয়; কারণ পেছনের তারিখ থেকে আইন প্রয়োগ করলে বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়।

ফিকি’র মতে, প্রস্তাবিত ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে গত অর্থবছরের তুলনায় ২৩ থেকে ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী ও চ্যালেঞ্জিং।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত