পাইকারি বৃদ্ধির ফাঁদে গ্রাহকরাও

চলমান অর্থনৈতিক সংকটে স্বল্প আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে। অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। এর মধ্যেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

পাইকারি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর গ্রাহকপর্যায়ে দাম বাড়ানোর আবেদন করবে বিতরণ কোম্পানিগুলো। বিদ্যুতের দাম বাড়লে জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে। পাল্লা দেবে মূল্যস্ফীতিও।

গ্রাহকপর্যায়ে এখনই বিদ্যুতের দাম বাড়ছে না বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সারা পৃথিবীতেই বিদ্যুৎ-জ্বালানির দামে সমন্বয় করতে হচ্ছে। তবে গ্রাহকপর্যায়ে এখনই দাম বাড়ছে না। দাম বাড়বে কি না, সেটা নির্ভর করছে মাঠপর্যায়ের তথ্যের ওপর। যাচাই করে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিইআরসি তাদের মতো করে বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে তারা ঘোষণা দিয়েও দাম বাড়ায়নি। সব যাচাই করেই করেছে।’

ভর্তুকি কমাতে পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দাম আগামী ১ ডিসেম্বর কার্যকর হবে। গতকাল সোমবার দুপুরে অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন দাম বাড়ানোর এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, পাইকারি পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ২২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ দাম ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হবে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত এ দাম বহাল থাকবে।

এর আগে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ৬৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছিল বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পিডিবির আবেদনে তথ্যের অস্পষ্টতা, বিতরণ কোম্পানি ও ভোক্তাপর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব-বিশ্লেষণ না থাকা প্রভৃতি কারণে দাম বাড়ানোর আবেদন খারিজ হয়ে যায়। গত ১৪ নভেম্বর পিডিবি ওই সিদ্ধান্ত আবার বিবেচনার আবেদন করে। এ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত জানাল বিইআরসি।

বিইআরসি চেয়ারম্যান মো. আবদুল জলিল ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানান, ১৭ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির কথা বিবেচনা করে বিদ্যুতের বাল্ক-মূল্য হার পুনর্নির্ধারণের এ সিদ্ধান্ত তারা দিচ্ছেন। ডিসেম্বর মাসের বিলে এ নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে। কমিশন হিসাব করে দেখেছে, নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার ফলে পিডিবির আয় বছরে ৮ হাজার কোটি টাকা বাড়বে। ইউনিটপ্রতি দাম ৮ টাকা ২৮ পয়সা করলে পিডিবি পুরো ১৭ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি থেকে মুক্ত হতে পারত।

নতুন পাইকারি দাম অনুযায়ী শহরাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত ডেসকোর ৩৩ কেভি লাইনে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে সর্বোচ্চ ৭ টাকা ৭৪ পয়সা। আর ডিপিডিসির ৩৩ কেভি লাইনের বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা ৭ টাকা ৭২ পয়সা।

বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সমিতিগুলোর ৩৩ কেভি লাইনের জন্য প্রতি কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে ৫ টাকা ৩৯ পয়সা, যা পাইকারি বিদ্যুতের সর্বনিম্ন দর। এ ছাড়া, ছয় কোম্পানির ২৩০ কেভি, ১৩২ কেভি ও ৩৩ কেভি লাইনের জন্য আলাদা ট্যারিফ ঠিক করা হয়েছে।

পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়লে গ্রাহকপর্যায়েও এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেছেন, গ্রাহকপর্যায়ে দাম বাড়ানোর জন্য একটি প্রস্তাব তৈরি করেছে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। এ সপ্তাহের মধ্যে তারা আবেদন করবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী বছর মার্চে খুচরাপর্যায়ে দাম বাড়তে পারে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে বলে মনে করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স। তিনি বলেন, ‘বিইআরসির গণশুনানিতে প্রমাণিত হয়েছে যদি সরকার তার অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা দূর করে তাহলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রয়োজন হবে না। কিন্তু সেটাকে উপেক্ষা করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। দ্রব্যাদির চড়া দামের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন নাকাল। বিদ্যুতের দাম বাড়লে মানুষ আরও সংকটে পড়বে। কোনো দায়িত্বশীল সরকার এ ধরনের আচরণ করতে পারে না। আশা করি, সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।’

বিদ্যুতের দাম বাড়ায় আতঙ্কিত ও বিস্মিত ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি এম শামসুল আলম বলেন, ‘দাম বাড়াতে হলে গণশুনানির মাধ্যমে বাড়াতে হবে। বিইআরসি এ কাজ করল কার স্বার্থে? এভাবে মানুষের ঘাড়ে চড়ে ভর্তুকির টাকা আদায় কতটুকু যৌক্তিক!’